ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

একবার আমি ইলিয়ট ব্রীজের উপর বন্ধুদের সাথে দাঁড়িয়েছিলাম। অনেক নীচের পানির দিকে তাকিয়ে আমরা কথা বলছি। এমন সময় আমার এক পায়ের সেন্ডেল পা থেকে ফসকে অনেক নীচের পানিতে পড়ে গেল। প্রায় সাথে সাথেই আমি অরেক পা থেকে অন্য সেন্ডেলটা একই জায়গায় ফেলে দিলাম। আমার বন্ধুরা আমার কাণ্ড দেখে হেসে ফেলল।

প্রবাল জানতে চাইল, এটা করলে কেন?

– খোঁজার উৎসাহ পেতে! এখন যেহেতু দুইটা সেন্ডেলই নীচে তাই আমাকে নীচে নামতেই হবে। আসলে আমি যা করেছিলাম সেটাই কিন্তু লজিক্যাল। শুধু একপাটি জুতা মানে জঞ্জাল। ওটা হাতে করে বাসায় নেয়া বোকামি। একই ঘটনা গান্ধিজীর জীবনেও ঘটেছিল। অবশ্য সেটা কোন পুলের উপর নয়, ট্রেনে। গান্ধিজী তার প্রথম চটিটি হারানোর পর দ্বিতীয় চটিটা যখন ফেলে দিলেন ট্রেন থেকে, তখন সবাই জানতে চাইল তিনি কেন এটা করলেন? বাপুজী বললেন, হয়ত দুইটা চটি একজন কেউ পাবে। তার উপকার হবে।

এই গল্পের শানে নযুল হল আপনাকে ঘিরে অনেক কিছু ঘটবে। সেটাকে আপনি কতটা নিজের অনুকুলে নিতে পারেন সেটাই আপনার মেধা। সে মেধা গান্ধিজীর ছিল আর আমার যে তা নাই সেটা এতদিনে সবাই জেনে গেছে।

110143523

ইলিয়ট ব্রীজ, সিরাজগঞ্জ

আজ এতদিন পর ইলিয়ট ব্রীজে দাঁডিয়ে  আছি। এখান থেকে সিরাজগঞ্জ কলেজের দিকে তাকিয়ে আরেকটা ঘটনাটা মনে পড়ে গেল। আমাদের বন্ধু কংকর ডিগ্রী (পাস) পরীক্ষা দিচ্ছিল। তখন সে ইউনিভার্সিটিতে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। শখ করে পরীক্ষা দেয়া। ওর ঠিক পেছনে বসে পরীক্ষা দিচ্ছিল আরেক বন্ধু। ইংরেজী পরীক্ষার দিন তিন ঘন্টাই কংকরের খাতা কপি করেছে সে। পরীক্ষা শেষে কংকর জিজ্ঞাসা করল, কি-রে সব লিখতে পারছিস? ও বলল, হ্যাঁ দোস্ত সব লিখছি। মাঝে মাঝে কিছু কিছু শব্দ বোঝা যাচ্ছিল না। ওই জায়গাগুলো খালি রেখেছিলাম।

-ওসব জায়গায় কি করেছিস? ওভাবেই খালি রেখে এসেছিস? কংকর জানতে চাইল।
-দোস্ত, ফাঁকা জায়গাগুলো তে সবখানে Bangladesh– Bangladesh লিখে ভরাট করেছি- ও উত্তর দিল ।
-আমরা পরে জানতে চেয়েছি এত কিছু থাকতে শুধু বাংলাদেশ লিখলি কেন?
-ওর তড়িৎ  জবাব, বাংলাদেশ বানান আমার ভুল হয় না। স্যার অন্তত বানানের জন্য নম্বর কাটতে পারবেন না। আমি এখন ওঁকে খুঁজছি বিসিবি’কে Bangladesh বানান শেখানোর জন্য!

আমার ছেলেবেলায় দেখা এক পাগলের কাহিনী। সে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতো আর চিৎকার করতো, “আই হাট’, সখিনা বেলাড্, বড়পুলের খাম্বা নাই।” ‘আই হাট’ ( I hurt), আমি আঘাত পেয়েছি। সখিনা বেলাড্( blood), সখিনা রক্তাক্ত (হয়ত সখিনা তার প্রেমিকা এবং সে মরে গেছে বা মেরে ফেলা হয়েছে)। বড়পুলের খাম্বা নাই, এটা সিরাজগজ্ঞের মানুষের নিজ জেলার প্রতি “influential favoritism”।

আমরা বিশ্বাস করি বড়পুলের, মানে ইলিয়ট সেতুর কোন খুঁটি (খাম্বা) নাই। আসলে খাম্বা আছে। এটা খিলান (arch) প্রযুক্তিতে করা, প্রাচীন কিন্তু খুবই কার্যকর প্রযুক্তি। সেতুর সম্পূর্ণ লোড দুই পাড়ের শক্ত ভিত্তিতে স্থানান্তর হয় এবং এই দুই ভিত্তিই দুইটা খুঁটির কাজ করে।

তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। একদিন রাত তখন অনেক হবে। সেদিন হলের রুমে আমি একা আছি। প্রথম “ক্ষুধিত পাষাণ” পড়ছিলাম। যেখানে পাগল মেহের আলি চিৎকার করে উঠে, “তফাৎ যাও, তফাৎ যাও ৷ সব ঝুট হায়, সব ঝুট হায়”, আমার হঠাৎ কেন যেন মনে হলো আমি মেহের আলীকে চিনি। আমার ছেলেবেলায় যে পাগলকে দেখেছি সেই মেহের আলী। বেশ ভয় ভয় করছিল। এখনই বোধ হয় মেহের আলি “তফাৎ যাও, তফাৎ যাও” চিৎকার করতে করতে আমার রুমের পিছনের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবে। কুল কুল করে ঘামতে লাগলাম।

তখনই হলের মসজিদের মাইকে ফজরের আজান শুরু হল….