ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

কোনদিন নিজের জীবনী লিখব এমন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ তো নই, তবে বৃদ্ধ বয়সে নাতি-নাতনির কাছে নিজের অতীতের গল্প করা যেতেই পারে। সেখানে কি নিজের এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার গল্প থাকবে না? আমাদের সময়ের মানুষের কাছে এই পরীক্ষা দেয়া সত্যি এক অম্লমধুর অভিজ্ঞতা, যা স্মৃতির পাতায় ভাস্বর থাকবে পুরো জীবন!

কি দারুণ উত্তেজনা, স্ট্রেস! রাত জেগে প্রস্তুতি নেয়া। মাঝে মাঝে বাবা বিছানা থেকে উঠে এসে পাশে দাঁড়ান। পারলে কষ্টটা নিজেই করে দিতেন, কিন্তু তা তো সম্ভব না। মা মাঝ রাতে এটা-ওটা খাবার নিয়ে হাজির। কষ্টটা আর কষ্ট থাকে না। কেমন সুখ সুখ লাগে। গুরুদেব বলেছিলেন, “বাজল বুকে সুখের মত ব্যাথা।” মেট্রিক পরীক্ষার ঠিক আগের দিনগুলোতে মনে হয় এমন মনে হয়েছিল ওঁর। (উনি আবার কবে মেট্রিক দিলেন!)

প্রথম পরীক্ষার দিনটা বাসায় এক বিশেষ দিন। শীতকালে হলে ভাতের সাথে লাউশাক আর গরম কালে কুমড়াশাক ভর্তা খেয়ে পরীক্ষা দিতে যেতে হতো। ডিম খাওয়া চলবে না। এসবের যুক্তিপূর্ণ কারণ (!) ছিল। ইংরেজ আমলে যারা পরীক্ষাতে তুখোড় ফলাফল করতেন তারাও লাউ শাক, ভরতা খেয়ে পরীক্ষা দিতে যেতেন। আর ডিম খেলে পরীক্ষাতে ডিমের আকারের শুন্য পাওয়ার সম্ভাবনা আছে! সিরাজগঞ্জে গণিত সম্রাট যাদব বাবুর পুকুরে গোছল না করে অংক পরীক্ষা দিতে যাওয়ার সাহস ওখানকার কম ছেলেরি হত। বাবা টেনশনে সেদিন আফিসেই যেতে পারেন না। মা’র পুরো তিন ঘণ্টা জায়নামজেই কাটবে। তাই রান্নাবান্নার জন্য নিকট আত্মীয়া কেউ সেদিন চলে আসেন। ছোট ভাইবোনগুলো এসব উত্তেজনায় কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে পরে। তাদের নির্দিষ্ট কোন ভূমিকা থাকে না। তবে বড় ভাইবোন কেউ থাকলে তাঁদের আজ মওকা। উপদেশের ঝাঁপি নিয়ে (পূর্ব-আভিজ্ঞতার জোরে) পাশে বসবে। চুপ করে শুনতে হবে, কিছু বলা যাবে না।

ফলাফলের দিন আরেক দৃশ্য। টেনশনে মা’র অবস্থা কাহিল। নানি এসেছেন নিজের মেয়ের খেয়াল রাখতে। ফল প্রকাশের পর বাবা আনন্দ করার সময়টুকুও পান না। মিষ্টির দোকানে তাড়াতাড়ি পৌঁছাতে না পারলে সব মিষ্টি যে শেষ হয়ে যাবে! তাই দ্রুত বের হন বাসা থেকে।

“১৯৭২ এর মেট্রিক এবং ইন্টার মেডিয়েট পাশ” বলে একটা কথা আছে। যারা ঐ বছর পাশ করেছেন একটু যেন লজ্জাবোধ কাজ করে তাঁদের মধ্যে। বলতে চান না। কারণটা বোঝা কঠিন নয়। সেবার নাকি ওই দুই পাবলিক পরীক্ষাতে ঢালাও নকল এবং ঢালাও পাশ ছিল। দেশ তখন সদ্য স্বাধীন হয়েছে। প্রশাসনিক ব্যবস্থাই ঠিকমত গড়ে উঠেনি। তাই ওইভাবে পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়া খুব অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। তবুও ঐ বাক্তিরা ৭২ এর লজ্জা সারা জীবন বয়ে চলেছেন।

সময় কিভাবে বদলায়!

এখন পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন হাতে চলে আসে। নকলের দরকারই পরে না। পরীক্ষাতেও নেই সেই আগের উত্তেজনা। সব কেমন পানসে হয়ে গেছে। বাবাকে টেনশন করতে হয় না। মা’র জায়নামাজে পড়ে থাকার দরকার পড়ে না। শুধু পরীক্ষার আগের দিন প্রশ্নটা জোগাড় করে দিলেই হয়। আমাদের কি একটুও লজ্জা করে না!

আমি অন্তত একজন পরীক্ষার্থীকে চিনি যাকে আমি সেই অহম (self-esteem) দেখাতে দেখেছি। তাঁর গৃহ শিক্ষক পরীক্ষার আগেরদিন প্রশ্নপত্রের কাগজ তাঁর হাতে গুজে দেয়। সে তা না দেখেই কি জিনিস জানতে চায়। স্যার যখন বলেন ওটা কি, তাঁর চেহারায় এমন অভিব্যক্তি ফুটে উঠে যা ঐ শিক্ষক জীবনে ভুলবেন না। ছি স্যার! ছি! বলে সে কাগজটা ছুঁড়ে ফেলে দেয়। স্যার নিচু হয়ে সেটা তুলে নিয়ে মাথা নিচু করে চলে যান। জীবনের চরম শিক্ষাটি তিনি নিজের ছাত্রের কাছ থেকে পেলেন।

কিন্তু মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীকে শেখাবে কে! উনি তো এতদিন স্বীকারই করতেন না যে প্রশ্নপত্র আগেই ফাঁস হয়। পাবলিক পরীক্ষার বিশাল ওজনদার ফল নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে হাজির হতে পারাই যে সফলতার শেষ কথা নয় তা কি উনি এতদিনে বুঝতে পারলেন?