ক্যাটেগরিঃ জনজীবন

 

চার্লি চ্যাপলিন একবার বলেছিলেন, আমি শুধু ক্লাউনই হতে চেয়েছিলাম। অবাক হবার মত বিষয়। আমাদের দেশে শিশুরা ডাক্তার- ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়, কিংবা আইসক্রিমওয়ালা বা ফেরিওয়ালা। কিন্তু কেউ ক্লাউন হতে চায় না। এর অবশ্য কারণও আছে। এদেশে ক্লাউনের কাজ মানে ভাঁড়ামিকে ভালো চোখে দেখা হয় না। ভাঁড়ের কাজ হল কাতুকুতু দিয়ে লোক হাসানো, এমনি ভাবা হয়। যদিও গোপাল ভাঁড়ের ভাঁড়ামিতে বুদ্ধির ঝিলিক চোখে পরে, কিন্তু সে ব্যতিক্রম। আর ব্যতিক্রম কখনো উদাহরণ হয় না। কিন্তু চোখ খোলা রাখলে প্রতিনিয়ত ভাঁড়ামি আপনার নজরে আসবে।

সরকারি দপ্তরে মেহেদি মাখা বিশাল দাঁড়ির আফিসার ঘুষ খান। এখানে ঘুষটা কিন্তু ভাঁড়ামি নয়, ওটা স্পীড মানি। সরকারের মন্ত্রীরা  প্রায়শই ঘুষকে এনডোর্স করেন। ভাঁড়ামিটা হল মেহেদি মাখা দাঁড়ি। চূড়ান্ত আসৎ, কিন্তু ধর্মের আবরণে নিজেকে সৎ হিসাবে জাহির করার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

বাসার সামনের রাস্তাটা তিন বছর ধরে চলাচলের অযোগ্য। সিটি করপোরেশনে অনেক দেন দরবার করে রাস্তাটা ঠিক করালেন। তিন মাস যেতে না যেতেই দেখবেন কে যেন সেই রাস্তার মাঝখানে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করেছে। ঠিকাদারকে জিজ্ঞাসা করলে ওয়াসা বা বিটিসিএল বা অন্য কোন সরকারি দপ্তরের নাম বলবে। আপনি অবাক হয়ে ভাবছেন, তিন বছর ধরে রাস্তাটা খারাপ ছিল তখন এদের এই খোঁড়াখুঁড়ির কথা মনে পড়ল না, যেই রাস্তাটা ঠিক হলো, অমনি শুরু হয়ে গেল! সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে কি কোন সমন্বয় নেই?  কে বলেছে নেই? আপনি নিজে কোন কাজ নিয়ে যান দেখবেন সমন্বয় কাকে বলে..। গেছেন একটা কাজ নিয়ে আপনাকে দশটা দপ্তরের অনুমোদন নিতে হবে। ভোগান্তির পরও আপনি মুগ্ধ হবেন সরকারি দপ্তরের শৃঙ্খলা আর সমন্বয় দেখে। আপনার একটু কষ্ট হচ্ছে তাতে কি, শৃঙ্খলাহীন জাতির উন্নতি নাই। যদিও আপনি জানেনই না, একই কাজে আপনার পরে যে ব্যক্তি এসেছিলেন ওনারটা অনেক আগেই হয়ে গেছে! অন্য কোন দপ্তরে তার ফাইল পাঠাতে হয়নি। উনি স্পীড মানি দিয়ে স্পীড আপ করেছেন শুধু।

সরকারি হাসপাতালে গেলে দেখবেন ডাক্তার-নার্স থেকে শুরু করে আয়া-ক্লিনার পর্যন্ত একেকটা ভাঁড়ের চূড়ান্ত। তাদের চাকরিটা হলো আপনাকে সেবা দেয়া, কিন্তু আচরণে মনে হবে আপনি তার অতি জরুরি কাজের মধ্যে বিরক্ত করতে এসেছেন। কিছু টাকা খরচ করুন, সবার চেহারায় তেলতেলে ভাব ফুটে উঠবে। যেন আপনি কোন জমিদার, সে সামান্য প্রজা! নিজ সন্তানের দুধের টাকা ঘুষের টাকা থেকে দেয়া যাবে না, তাই এর জন্য বেতনের টাকা আলাদা করে রাখেন এমন মানুষ আমি নিজে দেখেছি। ভাঁড়ামি আর কাকে বলে!

দিল্লির এক শিশু হাসপাতালে একদল তরুণ-তরুণী ক্লাউন সেজে প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে রোগীদের আনন্দ দিতে আসে। ঐ হাসপাতালের শিশু রোগীরা সেই সময়টার জন্য আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করে। রোগকাতর প্রাণগুলোর কাছে এ বিনোদনটুকু অমূল্য মনে হয়।

প্রায় মাসখানেক ধরে পঙ্গু হাসপাতালের ভবনগুলো আলোকসজ্জার নির্লজ্জ রসিকতা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। কি উৎসব চলছে ওখানে জানার কোন আগ্রহ বোধ করিনি। এ যেন হাড়ভাঙ্গা মানুষগুলোর নিদারুণ কষ্টের সাথে পৈশাচিক রসিকতা!

আমরা কেন জানি ভাঁড়ই রয়ে গেলাম, ক্লাউন হতে পারলাম না।