ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

কাঠমান্ডুতে ইউএস-বাংলার প্লেন ক্রাশ করল। আমি সে জন্য তাদের দোষ দিচ্ছি না। তবে কিছু কথা থেকেই যায়। যে এয়ারপোর্টে দুর্ঘটনাটি ঘটলো সেটা পৃথিবীর অন্যতম ঝুঁকিপূর্ন এয়ারপোর্ট হিসাবে কুখ্যাত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক উচ্চতার কারণে সেখানে বায়ুচাপ কম, বাতাসের গতিপ্রবাহ সুস্হিত নয়। চারদিকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বড় অনেকগুলো পর্বত (দ্য মাইটি হিমালয়) থাকাতে এয়ারপোর্টের সাথে রাডার যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটে প্রায়শ। অনেকসময় একেবারে কাছাকাছি এসে তবেই যোগাযোগ স্হাপন করা যায়। এখানে বিমান অবতরন করানো সত্যিই চ্যালেন্জিং। যে সে পাইলটের কর্ম নয়। পাইলটের অনেক বছরের দক্ষতা থাকলেই কেবল এখানে বিমানের নিরাপদ উড্ডয়ন-অবতরণ নিশ্চিত করতে পারেন।

সমস্যা হল নেপাল -বাংলাদেশ দুটো দেশই প্রযুক্তির দিক দিয়ে পিছিয়ে। সেই সুযোগে এবং দক্ষ জনবলের অভাবে অনেক ক্ষেত্রেই এসব প্রতিষ্ঠান অনেক ছাড় পেয়ে যায়। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল কি না কে জানে! যে পাইলট বিমানটি চালাচ্ছিলেন তিনি কি ঐ এয়ারপোর্টে ফ্লাইট অপারেশনের মত দক্ষ ছিলেন? বিমানটি কি ত্রুটিহীন ছিল? শোনা যায় এই এয়ারবাসটি নাকি ২০১৫ সনেও একবার সৈয়দপুরে অবতরনের সময় দুর্ঘটনায় পড়েছিল। সড়ক বা নৌপথে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে আমরা দেখি হয় চালক নয়তো তার যানটি দায়ি থাকে বেশিরভাগ সময়। যারা এসব ঠিকঠাক আছে কি না দেখবেন তাদেরই হয় এগুলো দেখার মত প্রযুক্তিগত জ্ঞান নেই অথবা পারমিট দেন অসৎ উপায় অবলম্বন করে টাকার বিনিময়ে। কে জানে বিমান চালনা অনুমোদনের ক্ষেত্রেও হয়ত তাই ঘটে। গত বছর প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানের মেইনটেনেন্সে অমার্জনীয় গাফিলতি ধরা পড়ল না!

বিমান দুর্ঘটনায় পড়লে ভেতরের মানুষগুলোর বাঁচার সম্ভাবনা প্রায় থাকেই না। যে কারণে গোটা ব্যবস্হাটাকে কঠিন আর নিবিড় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নিরাপদ রাখা হয়। এ-বি-সি-ডি নামে চার ধরনের চেক একটি বিমানের জন্য বাধ্যতামূলেক। যা কীভাবে এবং কখন কখন করাতে হবে তার সুষ্পষ্ট নির্দেশনা আন্তর্জাতিক বিমান পরিচালনা সংস্হার ম্যানুয়ালে আছে এবং কেউ এর ব্যত্যয় ঘটালে উন্নতদেশগুলোতে সে বিমান পরিচালনার অনুমতিই পাবে না। পাইলটেরও  প্রয়োজনীয়  দক্ষতার গাইডলাইন থাকে। যে কারনে প্রতিদিন এক কোটি মানুষ বিমানে চলাচল করলেও এটাই পৃথিবীর নিরাপদতম যান।

সমস্যা হয় আমাদের মত অনুন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রে। যানের চেকিংয়ের ক্ষেত্রে গাফিলতি সম্ভাবনা থাকে। পর্যাপ্ত দক্ষতার ফ্লাইট অপারেটর পাওয়াও বিরাট চ্যালেঞ্জ। তাই অনেক কিছু ছাড় দেয়া হয়। যদিও এক্ষেত্রে ছাড়ের কোন সুযোগই থাকা উচিত নয়, মানুষের জীবনের প্রশ্ন। কিন্তু চাহিদার উত্তরোত্তর বৃদ্ধির কারণে বিগত দুই দশকে রাতারাতি এদেশে অনেকগুলো বেসরকারি বিমান কোম্পানি গঠিত হয়ে গেছে। আর এদের জন্য মুনাফা করা খুবই দরকার যেটা সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসাবে বিমান বাংলাদেশের অত বেশি প্রয়োজন নেই।

মানুষের জীবন সবচেয়ে মূল্যবান। তাই তার নিরাপত্তার সাথে কোনো আপোষ নেই। যে শিশুটি আনন্দ ভ্রমণে গেল বাবা-মাকে নিয়ে এক নিমিষের ভুল কেন তার সর্বস্ব কেড়ে নেবে? নেপালের ছেলেমেয়েগুলো বাংলাদেশে এসেছিল ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন বুকে করে। আত্মীয় পরিজন ছেড়ে পাঁচ-পাঁচটি বছর প্রবাসে কঠিন সাধনায় কাটিয়ে কেবল মাত্র ডাক্তার হয়ে ঘরে ফিরছিল। দেশের মাটিতে পা ফেলতেই দগ্ধ লাশ হয়ে গেল। একি মেনে নেয়া যায়? এমনকি যে মানুষগুলো ভাগ্যেক্রমে বেঁচে গেলেন বেঁচে গেলেন তারাও কি এ আতঙ্ক থেকে বের হতে পারবেন কখনও?

মৃত্যু চিরন্তন সত্য কিন্তু এমন মৃত্যু হৃদয়ের গহীন ভিতরে নাড়িয়ে দেয়। গোটা দেশের মানুষ আজ শোকে মূহ্যমান। তবুও আমাদের এই শোক থেকে শিক্ষা নিতে হবে। কোনো ভুলে এমন মর্মান্তিক  দুর্ঘটনা ঘটলো তা খুঁজে বের করতে সঠিক তদন্ত করতে হবে। আমরা যদি এমন ঘটনা আর না ঘটে তা নিশ্চিত করতে পারি সেটাই হবে হতাহত মানুষগুলোর প্রতি সঠিক শ্রদ্ধা জ্ঞাপন।

আর যেন ‘লোকচক্ষুর অন্তরালে অন্ধকার’ না জমে। আর যেন মৃত্যুরা বারবার হানা না দেয়। আমরা যেন ভুলে না যাই, দুর্ঘটনায় একজন মানুষের মৃত্যু মানে সব জীবিত মানুষের পরাজয়।