ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত

প্রফেসর স্টিফেন হকিং ‘ব্ল্যাক হোল ধ্বংস হয়’ এই তত্ত্ব গাণিতিক প্রমাণসহ দিয়ে পৃথিবী ওলট-পালট করে দিয়েছিলেন। মহাবিশ্বকে তাঁর মত এত বেশি আর কেউ জানত না। একজন পঙ্গু মানুষ হুইল চেয়ারে জীবনের চারভাগের তিনভাগ কাটিয়ে দিলেন, আর সেখানে বসে বসে লক্ষ কোটি আলোকবর্ষ দূরের গ্রহ-নক্ষত্রের গতি-প্রকৃতি নিয়ে যুগান্তকারী সব তত্ত্ব দিতেন! সম্বল শুধু মাথা, দেহের একমাত্র জিনিস যা পুরপুরি সক্রিয় ছিল সারা জীবন।

মনে হয় কোন রহস্যই ওঁর জন্য নয়, সব কিছু তিনি জেনে ফেলেছেন। যদিও তিনি নিজে তা মনে করতেন না। হকিংও এমন কিছু নিয়ে ভেবেছেন অথচ কোন কূলকিনারা করতে পারেননি তা হল নারী। নিউ সায়েন্টিস্ট ম্যাগাজিনকে তিনি সেই কথাই বলেছিলেন। ৭০তম জন্মদিনে তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, প্রাত্যহিক জীবনে তিনি সবচেয়ে কোন বিষয়টি নিয়ে বেশি চিন্তা করেন। তার জবাবে স্টিফেন হকিং বলেছিলেন ‘নারী। তারা সম্পূর্ণ রহস্যময়।’

তাঁর এই কথাকে নিছক মজা করে বলা মনে হতে পারে। কিন্তু দুটি কারণে সেটা পারছি না। প্রথম কারণ হল, কথাটা যিনি বলেছেন তার নাম স্টিফেন হকিং। যার প্রতিটি কথার গভীরতা মহাসমুদ্রের মতো অতলস্পর্শী। দ্বিতীয় কারণ হল, তার মৃত্যুর পর দুই স্ত্রীর বয়ান। এই দুই নারীকে হকিং বিয়ে করেছিলেন। আবার তারা দুইজনই তাকে ছেড়েও গিয়েছিলেন। বাকি জীবনে হকিং অনেকবার তাদের সান্নিধ্য কামনা করেছেন, কিন্তু তারা আর ফেরত আসেননি।

যদিও হকিংয়ের প্রতি এই দুই নারীর ছিল প্রকৃত ভালবাসা, যা হকিং মারা যাওয়ার পর তাদের বার্তায় বোঝা যায়। প্রথম স্ত্রী জেন ওয়াইল্ড বললেন, “আমাদের প্রিয় স্টিফেনের মৃত্যুতে গভীরভাবে আমি শোকাহত। দীর্ঘদিন তার বেদনা আমরা অনুভব করবো।” দ্বিতীয় স্ত্রী ইলেনের মনেও একই ক্ষরণ। ইলেন বলেন, “তিনি এক চমৎকার মানুষ ছিলেন। তিনি ছিলেন অনেক অনেক বেশি স্পেশাল। আমার চিন্তা-চেতনা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। আমি হতাশায় ডুবে আছি। তিনি মারা গেছেন, এটা তার জন্যই স্বস্তির বলে আমি মনে করি। তিনি ছিলেন আমার জীবনের ভালোবাসা। আমি তার কাছেই যেতে চেয়েছিলাম।”

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘অর্ধেক মানবী তুমি অর্ধেক কল্পনা’। অর্থাৎ পুরুষের কল্পনা নারীকে রহস্যময় আর মহিমান্বিত করে তুলে। গুরুদেব কবি, সুন্দরের পূজারি। তিনি ওভাবেই ভাববেন। হকিং নিজেও সুন্দরের পূজারি ছিলেন, কিন্তু তাঁর ভাবনা গণিতের কঠিন যুক্তির শৃঙ্খলে বাঁধা। তাই তিনি রহস্যটা বুঝেছেন, সেটা নিয়ে ভেবেছেন কিন্তু কোন গাণিতিক ব্যখ্যা দাঁড় করাতে পারেননি। শেষে স্বীকার করে নিয়েছেন ‘তারা সম্পূর্ণ রহস্যময়’।

নারী সত্যিই রহস্যময়। একজন পুরুষের পক্ষে নারীকে বোঝার চেষ্টা বৃথা। প্রকৃতি তাকে সেই ক্ষমতা দেননি। একই সাথে নারী বিধাতার পরিপূর্ণ সৃষ্টিও। পুরুষের অপূর্ণতা নারীর নেই। সে নিজে তার মত একজন মানুষের জন্ম দিতে পারে। পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য হল সদ্যজাত সন্তানের মুখের দিকে তার মায়ের তাকিয়ে থাকার দৃশ্য। গৌতম বুদ্ধ কঠিন সাধনার মাধ্যমে নির্বাণ লাভ করেছিলেন। বছরের পর বছর সে সাধনায় ঘুম ব্যাঘাত সৃষ্টি করছিল। তাই তিনি নিজের চোখের পাতাগুলো কেটে ফেলেছিলেন, যাতে ঘুম না আসে। নারী সন্তান লাভে যে কষ্টকর পথ পারি দেন তা শুধু বুদ্ধের নির্বাণ লাভের সাধনার সাথেই তুলনীয়। আর সন্তানই তার নির্বাণ, যা বিধাতার সৃষ্টির ধারাবাহিকতা রক্ষা করে। পুরুষ এমন নির্বাণ লাভ করবে কিভাবে? সব পুরুষই তো গৌতম বুদ্ধ হতে পারবে না। আর না পারবে নারী হতে।