ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

ল্যাবএইড হাসপাতালের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ, নামটা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না, রোগীকে বিছানায় শুইয়ে অনেকক্ষণ ধরে পা টিপে টিপে পরীক্ষা করছিলেন। রোগী একসময় মজা করে বললেন, ডাক্তার সাহেব পা ধরছেন কেন? ডাক্তার হাসিমুখে বললেন, একটু পড়েই ‘জবাই’ করা শুরু করব তো তাই আগেই পা ধরে মাফ চেয়ে নিচ্ছি।

ডাক্তার সাহেব ‘জবাই’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন কারণ, সাধারণ মানুষ এভাবেই বলে- অমুক ডাক্তারতো কসাই, রোগী পেলেই জবাই করেন। এতে স্বাভাবিকভাবেই ডাক্তারদের মনে কিছুটা খেদ তৈরি হয়ে থাকবে। কোন কোন ডাক্তার অর্থলোভী এটা যেমন ঠিক, আবার ডাক্তারের প্রাপ্য সম্মানীটা দিতেও অনেক মানুষের ভীষণ অনীহা থাকে সেটাও সত্য। তারা ডাক্তারের ভিজিট দিতে গিয়ে এমন আচরণ করেন যেন বিনা কারণে টাকাটা জলে যাচ্ছে!

যারা এমবিবিএস ডিগ্রি নেন তাদের মেডিক্যাল এথিকস পড়ানো হয়। সেখানে বলা হয়, ডাক্তারের স্থান রোগীর পায়ের কাছে। রোগীর প্রতি তুমি এমপ্যাথি বা সমানুভূতি দেখাবে সিমপ্যাথি বা করুণা নয়। এইসব মেধাবী মানুষগুলো যে সেই এথিকস আত্মস্থ করবেন সেটাই স্বাভাবিক। তবুও কিছু লোভী ডাক্তার অবশ্যই আছেন যারা রোগী দেখলেই চোখের সামনে টাকা দেখেন। ঠিক যেভাবে কার্টুন চরিত্র টম মুরগি দেখলেই ঝলসানো রোস্ট দেখতে পায়।

বয়স্ক মানুষেরা একসাথে হলে কিছুক্ষণের মধ্যেই রোগের গল্প শুরু হবে। অতঃপর অবধারিতভাবে আসবে ডাক্তারের গল্প। এটাই নিয়ম। কোন ডাক্তার কেমন চশমখোর (চক্ষুলজ্জাহীন), বাংলাদেশের ডাক্তারদের ভুল ট্রিটমেন্টের বিপরীতে ভারতীয় ডাক্তারদের আসাধারণ ব্যবহার, সাধারণত এসবই থাকে আলোচনার বিষয়। এখানে লক্ষণীয়, ভারতীয় ডাক্তারদের প্রশংসায় সবার আগে ভালো ব্যবহারের কথা আসে। বিদেশে গিয়ে ডাক্তারের ভালো ব্যবহার পেয়ে রোগী ভীষণ খুশি হন। এটা তাদের আশাতীত। তাই ওখানে যারা চিকিৎসা নিতে যান তারা ফিরে এসেই ডাক্তারের খুব প্রশংসা করেন। অবশ্য পরে সেই ঔষধ কিংবা চিকিৎসা বাংলাদেশি ডাক্তারদের দেয়া চিকিৎসার চেয়ে কতটা ভালো কাজ দিলো সে খবর আর কেউ রাখেন না। বেশিরভাগ সময় খুব বেশি তফাৎ হয়ও না। ভাল ব্যবহার খারাপ ব্যবহার নিয়ে বাংলাদেশের ডাক্তারদের কিছু যুক্তি আছে। ওনারা বলেন, বাংলাদেশে একজন ডাক্তারকে অনেক বেশি রোগী দেখতে হয়, তাই একজন ডাক্তারের কাছে প্রথম রোগী যে আচরণ পান চল্লিশতম রোগী তা আশা করতে পারেন না। হয়তো তাদের কথা খুব একটা ভুল না।

যাইহোক, তেমনি একদল বয়স্ক মানুষদের বৈঠকে একজন ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জন উপস্থিত ছিলেন। যাদের ধারণা আছে তারা জানেন যে, এদের একেকটা অপারেশন দীর্ঘ সময় ধরে চলে। যেহেতু আসরে একজন ডাক্তার উপস্থিত আছেন তাই সবাই দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে ডাক্তারের সমালোচনা শুরু করলেন। একজন এক ‘বিখ্যাত’ সার্জনের কথা তুললেন যার অর্থলিপ্সা আগের দিনের জমিদারদের মত (সিনেমায় যেমন দেখা যায়)। রোগী ভিজিটের টাকা কম দিতে চাইলে উনি হাত থেকে ব্যবস্থাপত্র কেড়ে নিয়ে ছিঁড়ে ফেলেন। আরেকজনকে পাওয়া গেল যিনি বিষয়টা জানেন। তিনি প্রথমজনকে সমর্থন দিলেন। সাথে যোগ করলেন ভদ্রলোকের অপারেশনে হাত অতি দক্ষ। উনি চা খেতে খেতে অপারেশন করেন। এবারে আসরে উপস্থিত ডাক্তার ভদ্রলোক মুখ খুললেন। বললেন, দেখুন অপারেশন করতে করতে মাঝখানে থেমে চা আমরাও খাই। এটা আসলে ডাক্তারের দক্ষতার কোন বিষয় নয়। যখন চার-পাঁচ ঘন্টা ধরে একজন রোগীর অপারেশন চলে তখন রোগীকে অপারেশনের টেবিলে রেখে, মুখের মাস্ক আর হাতের গ্লাভস খুলে রেখে আমরাও চা-বিস্কুট খাই। এটা করি স্ট্রেস কমানোর জন্য। এতে রোগীর ভালোই হয়। কারণ, মানসিক স্থিরতা না থাকলে ভালো অপারেশন সম্ভব নয়। তবে চা খেতে খেতে অপারেশন কোন ডাক্তারই করবেন না। এটা বাড়াবাড়ি গল্প। উনি আরও যোগ করলেন, আমাদের অনেকে কসাই বলে সেটা ঠিকই আছে, তবে সাথে মুচিও বলা উচিত। একজন দক্ষ সার্জন কসাইয়ের দক্ষতা দিয়ে মানব শরীর কাটেন আবার মুচির দক্ষতা দিয়ে সেটা আবার জুড়ে দেন।

আমার ভাগ্নি কেবল ডাক্তারি পড়া শেষ করেছে। সে দেখলাম ফেসবুকে দুঃখ করে লিখেছে, নিজের আত্মীয়রাই যেভাবে ইন্ডিয়ান ডাক্তারদের প্রশংসা করছে তাতে করে বাইরের লোকজন কিভাবে আমার কাছে চিকিৎসা নিতে ভরসা পাবে? আমি তাকে লিখলাম, দেখ, মানুষ ভীষণ বিপদে পরলে খড়কুটো আঁকড়ে ধরে। ঠিক একইভাবে মানুষ ইন্ডিয়া ছুটে যায় চিকিৎসা নিতে। এটা তোমাদের ব্যর্থতা নয় বা ঐসব মানুষের দোষও নয়। ইন্ডিয়ান ডাক্তারেরা হল আমাদের দেশের মানুষের কাছে খড়কুটো যা ডুবে যাওয়া মানুষ প্রাণপণ আঁকড়ে ধরে। এসব নিয়ে তুমি ভেবো না। বরং এটা ভাবো যে ঐ মানুষগুলোকে সারা জীবন ধরে ভালো থাকতে তোমরাই সাহায্য করেছ।