ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

রেলকে অগ্রাধিকার দিয়ে দেশে একটি সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। রেলের লাভের ক্ষেত্রে শুধু অর্থনীতির পাশাপাশি পরিবেশ, ভূমির পরিমিত ব্যবহার, যোগযোগ নিরাপত্তাও বিবেচনা করতে হবে। রেল মন্ত্রণালয় জনগনের দীর্ঘ আন্দোলন ও প্রত্যাশার ফসল। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ঋণপ্রদানকারী গোষ্ঠীর প্ররোচনা, পরামর্শ ও সড়ক সংশ্লিষ্ট স্বার্থানেষী গোষ্ঠীর অপচেষ্টা এবং সরকারীভাবে অবজ্ঞা, অবহেলার কারণে রেলের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটেনি। পরিকল্পনা ও বাজেটে বঞ্চনার কারণে জনগনের সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান রেলওয়ে’র একদিকে দক্ষ লোকবলের ছাটাই হয়েছে, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় ইঞ্জিন-বগি’র সংকট ও রেল লাইন মেরামতের অভাবে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। জনগনের সেবাদানকারী এই প্রতিষ্ঠানের প্রসারের লক্ষ্যে রেলের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় জনগনের জন্য আশার আলো।

বিদেশী ঋণ প্রদানকারী গোষ্ঠীর অহেতুক ঋণ, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প ও অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অব্যবস্থাপনার কারণে রেলের আয় ব্যয় বর্তমান অবস্থায় দাড়িয়েছে। তবু রেলে লাভকে শুধু আয়-ব্যয় দ্বারা বিবেচনা করলে চলবে না। রেল জনগনের অর্থে সরকার পরিচালিত একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। জনগনের যাতায়াত চাহিদা পূরণ করা এবং সেবা প্রদান করাই এ প্রতিষ্ঠান সৃষ্টির মূল লক্ষ্য। রেলকে লাভজনক করতে গিয়ে যেন জনপ্রিয় এ বাহন যেন দরিদ্রদের নাগালের বাইরে চলে না যায়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। তথাকথিত লাভের নেশায় আমরা অনেক প্রতিষ্ঠান বেসরকারি করেছি, তাতে দেশ ও জনগণের কোন সুফল বয়ে আনেনি। তাই রেলকে লাভজনক করার চাইতে এর কার্যকরিতা, নিয়মিত ও সময়ানুযায়ী রেল চালু রাখা, নতুন নতুন বগি ও ইঞ্জিন অন্তর্ভূক্ত করা, সারাদেশে রেল নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করা দরকার। এতে সামগ্রিকভাবে দূর্ঘটনা কমে আসবে, যাতায়াত ব্যয় কমবে, জনদুর্ভোগ কমবে।

দেশে তথাকথিত উন্নয়নের নামে কৃষিজমি এবং দেশের নদনদী ধ্বংস করে সড়ক ব্যবস্থার প্রসার করতে গিয়ে ধ্বংশ হয়েছে নৌপথ ও রেলপথ এর মতো সাশ্রয়ী পরিবেশবান্ধব যোগাযোগ মাধ্যমকে। হাজার হাজার কোটি টাকার সড়ক পথের কারণে শুধুমাত্র কৃষিজমি, নদ-নদী আর পরিবেশ ধ্বংশ হয়নি, সড়ক নির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৃদ্ধি পেয়েছে দূঘর্টনা মৃত্যু, বাড়ছে যোগাযোগ ব্যয়।

রেল পরিবেশ বান্ধব, ভাড়া কম, জ্বালানী ও অর্থসাশ্রয়ী, রেল যোগাযোগে ভূমির পরিমিত ব্যবহার হয়, একটি রেলে অনেক লোক যাতায়াত করতে পারে, দূঘর্টনার হার তুলনামূলক কম। এছাড়া রেলের উপর নির্ভর করে বেচে আছে অনেক ছোট ছোট ব্যবসা। অনেক মানুষের কর্মসংস্থান করছে আর এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে দেখা যাবে রেল সামাজিক, পরিবেশ ও অর্থনীতির দিক হতে লাভজনক একটি প্রতিষ্ঠান।

রেলের হিসেবে জন্য একটু ভিন্ন চিন্তা প্রয়োজন। রেলে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে একমাত্র মাধ্যমে যা সরকারীভাবে পরিচালিত হয়ে থাকে এবং সরকারের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। বিমান, সড়ক, আর নৌ যোগাযোগের ক্ষেত্রে বেসরকারী গোষ্ঠীর প্রভাব আর অনায্য দাবির নিকট প্রতিনিয়ত জনগন জিম্মি। সড়ক, নৌপথে দীর্ঘদিন ভাড়া বৃদ্ধিসহ নানা বিষয়ে জিম্মি এদেশের জনগণ। প্রতিনিয়ত কতিপয় বেসরকারী পরিবহন মালিকদের অন্যায্য নানা দাবির চাপ মেটাতে ক্লান্ত এ দেশের জনগন। এ অবস্থায় রেলের মতো একটি শক্তিশালী মাধ্যম যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সুসংহত করবে। ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের বন্যায় যাত্রী ও মালামাল পরিবহন এবং দূর্গত এলাকায় ত্রাণ পরিবহনের ক্ষেত্রে রেল জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছে। প্রতিটি উৎসব পার্বনে বাংলাদেশ রেলওয়ে যাত্রী সেবা বিশেষ সেবা প্রদানের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। রেলের কারণেই অনেক ক্ষেত্রে অন্যান্য পরিবহনগুলো মানুষকে জিম্মি করতে পারে না। তাই যোগাযোগ খাতের সিন্ডিকেট ভাঙ্গতে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন।