ক্যাটেগরিঃ শিল্প-সংস্কৃতি

 

সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলা লোক সংস্কৃতিতে অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী এলাকা। এখানকার মাটিতে বহু লোককবি গীতিকার সাধু-সন্ত, সন্যাসী জন্ম গ্রহণ করেছেন এবং তাদের অমর রচনা বাণীতে বাংলার লোক সংস্কৃতিকে পরিপুর্ণ করে গড়ে তোলেছেন। সাধক গণ তাদের নিজ নিজ ধারায় মরমী সংগীতে কৃতিত্বের স্বার রেখেছেন। তাদের নিজস্ব সৃষ্টিতে মরমী সংগীতের যে অমৃত রসের ধারা বইয়ে দিয়েছিলেন তা আজও মানুষের মনে মনি কোঠায় সুর ঝঙ্কারের সৃষ্টি করে। সাধক সৈয়দ শাহ হোছন আলম, মরমী কবি সৈয়দ আসহার আলী চৌধুরী, সৈয়দ শাহপুর, রাধারমন দত্ত, আছিম শাহ, কালু শাহ সহ অসংখ্য আউলবাউল সাধূ সন্যাসীর জন্মভুমি এ জগন্নাথপুর। ।

লোকসংগীতের পুরোধা লোককবি রাধারমন দত্ত জন্ম গ্রহণ করেন ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে ১২৪১বাংলায় সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার আতুয়জান পরগনার কেশবপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তাঁর পিতা রাধামাধব দত্ত মাতা সুর্বণা দেবীও ছিলেন বিদগ্ধ ব্যাক্তি। কিশোর বয়স থেকে রাধরমণ সৃষ্টিত্বত্ত নিয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। সৃষ্টিকর্তার স্বরূপ অনুসন্ধানে মনোনিবেশে করেন।এজন্য তিনি বিভিন্ন সাধুসন্তের আদেশ উপদেশ অরে অরে পালন করতেন। এই ধারাবাহিকতায় তিনি মৌলভীবাজার এর ঢেউপাশা গ্রামের সাধক রঘুনাথ গোস্বামীর সাধন ভজনের কথা জ্ঞাত হয়ে তিনি তার শিষ্যত্ব গ্রহণ গ্রহণ করেন। শাক্ত, বৈষ্ণব, শৈব মতবাদেও উপর ব্যাপক পড়াশুনা করেন। সবশেষে তিনি সহজিয়া মতে সাধন ভজন করেন। এজন্য তিনি বাড়ির পাশে নলুয়ার হাওরের একটি উন্মুক্ত স্থানে পর্ণকুঠির তৈরী করে সেখানে সাধন ভজন করতে থাকেন। তিনি কৃষ্ণভাবে বিভোর হয়ে রাধাকৃষ্ণ প্রেমলীলা নিয়ে লোকগান রচনা করেন। তিনি ভজন সংগীতে বিভোর হয়ে গান রচানা করে নিজেই তা গাইতেন। তাঁর মুখের বাণীতে তাঁর শিষ্যগণ তা কাগজে লিখে রাখতেন। তাঁর নিজ হাতে রচিত গানের কোন পান্ডুলিপি নেই। কারণ তিনি তাৎনিকভাবে ভাবরসে বিভোর হয়ে গীতরচনা করতেন। কবি রাধারমণের পুরো পরিবারের পারিবারিক জীবন ধারায় বৈষ্ণব ও সুফীবাদেও প্রবল প্রভাব ছিল। পারিবারিক ঐতিহ্যেও ধারাবাহিকতায় উপসণার প্রধার অবলম্বন সংগীতের সংগে তাঁর পরিচয় ছিল শৈশব থেকেই।লোকবি জয়দেবের গীতগৌবিন্দ এর বাংলা অনুবাদ করেছিলেন তার পিতা রাধামাধব দত্ত। পিতার সংগীত ও সাহিত্য সাধনা তাকেও প্রভাবিত করেছিল। রাধারমণ তাঁর শৈশব, কৈশর, যৌবন ও পরিণত বয়সে সে ধারাবাহিকতা তার মধ্যে বিদ্যমান ছিল।

রাধারমন এঅঞ্চলের বিখ্যাত লোক কবি হাছন রাজা থেকে বয়সে প্রায় ১৪/১৫ বছরের বড় ছিলেন। তা সত্বেও তাদের মধ্যে খুব হৃদ্যতা ছিল। লোকমুখে কথিত আছে, হাছনরাজা রাধারমনকে তার সুনামগঞ্জের বাড়িতে দাওয়াত করে ছিলেন। লোককবিতার ভাষায় তিনি আহবান করেছিলেন ‘রাধারমন আছো কেমন, হাছন রাজা জানতে চায়।’ পত্র প্রাপ্তির পরে রাধারমন তার বাড়িতে যাওয়ার প্রস্ততি নিয়েও কি একটা অসুবিধায় যেতে না পেরে লিখেছিলেন- ‘গানের সেরা রাজা হাছন, পেলাম না তার চরণ দর্শন, বিফলে দিন গেল গইয়া।’

সিলেটের বাউল গানের সুরের দ্বারা যিনি মানুষের মনে ঠাইঁ করে নিয়ে ছিলেন তিনি হলেন রাধারমন। রাধারমনের গানের বেশ কিছু গানের বই বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। অধ্যাপক যতীন্দ্র মোহন ভট্টাচার্য প্রথমে রাধারমণ দত্তের গান সংগ্রহের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এছাড়া গুরু সদয়দত্ত, ডঃ নির্মলেন্দু ভৌমিক,আব্দুল গফফার চৌধুরী, কেতকীরঞ্জন গুন,মুহাম্মদ আব্দুল হাই, অধ্যাপক মুহম্মদ মনসুর উদ্দীন, হুছন আলী, সৈয়দ মুরতাজা আলী, নরেশ চন্দ্র পাল, যামিনী কান্ত র্শমা, মুহম্মদ আসদ্দর আলী, মাহমুদা খাতুন, ডঃ বিজন বিহারী পুরকাস্থ, সৈয়দ মুস্তফা কামাল, মোঃ আজিজুল হক চুন্নু, জাহানারা খাতুন, নরেন্দ্র কুমার দত্ত চৌধুরী, অধ্যাপক সুধীর চন্দ্র পাল, অধ্যাপক দেওয়ান মোঃ আজরফ ,শামসুর করিম কয়েস সহ আরও বিদগ্ধজন রাধারমণ দত্তের গান সংগ্রহ কওে রেখেছেন। মুন্সী আশরাফ হোসেন সাহিত্যরতœ ‘রাধারমন সঙ্গীত‘ নামে ও সুনামগঞ্জের মরহুম আব্দুল হাই ‘ভাইবে রাধারমন বলে’ নামে বই প্রকাশ করেছেন। প্রখ্যাত লোক তত্ত্ববিদ চৌধুরী গোলাম আকবর রাধারমনের প্রায় চল্লিশ বছরের সংগ্রহের গানগুলো নিয়ে সিলেট মদন মোহন কলেজ সাহিত্য পরিষদের মাধ্যমে একটি বই প্রকাশ করেন। এতে তার তিন শতাধিক লোকগান স্থান পায়। রাধারমনের বেশ কিছু গান বাংলা একাডেমীর সংগ্রহেও রয়েছে।

বিভিন্ন সংগ্রাহকদের মতে, রাধারমন গানের সংখ্যা তিন হাজারেরও উপরে। রাধারমন দত্ত একাধারে গীতিকার, সুরকার, শিল্পী, ও একজন ভাল চরিত্র অভিনেতা ছিলেন। রাধা রমন সম্পর্কে অনেক আলৌকিক কথাও লোকমুখে শোনা যায়। কথিত আছে, রাধারমন ভাবে কৃষ্ণভাবে বিভোর হয়ে লোকগান রচনা করতেন। শিষ্যরা শুনে তা লিখে রাখতেন। তিনি তত্ত্ব সঙ্গীত, দেহতত্ত্ব, ভক্তিমূলক, অনুরাগ, প্রেম, ভজন, বিরহ, ধামাইলসহ নানা ধরণের গান রচনা করেছেন। বাংলার গ্রামবাংলার বিয়েশাদীতে রাধারমনের ধামাইল গান খুব জনপ্রিয়। দুই বাংলার বেতার ও টেলিভিশনে রাধারমনের গান প্রায়স প্রচারিত হচ্ছে। ইদানিং বাংলা সিনেমাতে রাধারমনের বেশ কিছু গান সংযোজিত হয়েছে। ভ্রমর কইও গিয়া শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদেও অনলে অঙ্গ যায় জ্বলিয়ারে ভ্রমর কইও গিয়া সহ অসংখ্য জনপ্রিয় গানের জনক ছিলেন তিনি।
ব্যক্তি জীবনে রাধারমন দত্ত ছিলেন তিন পুত্রের জনক। তার দ্বিতীয় ও তৃতীয় পুত্রসহ স্ত্রী একযুগে মারা গেলে তার ভাবান্তর ঘটে এবং তার মনে বৈরাগ্য ভাবের সৃষ্টি হয়। সেই থেকেই তিনি সংসার ত্যাগী যোগীর মতো সাধন ভজনে মগ্ন হয়ে যান। তার প্রথম পুত্র বিপীন বিহারী দত্ত তখন তার মামার বাড়িতে মৌলভীবাজারের ভুজবল গ্রামে যান এবং সেখানে স্থায়ী বসবাস করেন। তার বংশধরেরা বর্তমানে সেখানে বসবাস করছেন। রাধারমন দত্তের সাধনা ছিল সহজিয়া বৈষ্ণবরীতির, সঙ্গীত ছিল তার সাধনার অন্তর্ভূক্ত একটি বিষয়। টানা ৩২ বছর তিনি ঈশ্বরের সাধনা করেছেন। রাধারমন দত্ত ৮২ বছর বয়সে ১৩২২ বাংলার ২৬ কার্তিক ১৯১৫ খ্রীস্টাব্দে শুক্রবার শুকাষষ্ঠি তিথিতে পরলোকে গমন করেন। জগন্নাথপুর উপজেলার কেশবপুর গ্রামে তার মরদেহ সমাহিত করা হয়। তারই শেষ স্মৃতি শ্মশান ঘাটটি বর্তমানে সমাধি ত্রে হিসাবে সংরতি রয়েছে। কেশরবপুর গ্রামের নরসিং মালাকারের স্ত্রী নিদুমনি দাস রাধারমনের সমাধিতে দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে সেবায়িতের কাজ করেছেন। আজ থেকে ৬ বছর আগে নিদু মালাকার মারা যান। বর্তমানে কেশবপুর গ্রামের রম্নু মালাকারের স্ত্রী অনিতা রাণী মালাকার রাধা রমন মন্দিরের দেখ ভালোর কাজ করছেন। কেশবপুর গ্রামের লন্ডন প্রবাসী জৈনক ব্যাক্তি রাধারমন দত্তের সমাধিস্থল পাকা করে দেন। বিশ্বখ্যাত এ মরমী সাধক ও লোককবির সমাধিস্থল সংরণের জন্য আজ পর্যন্ত কোন প্রকার সরকারী উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়নি।