ক্যাটেগরিঃ নগর কথা

বিশ্বকে স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে ফেলা কোভিড-১৯ রোগের প্রতাপে জনজীবনে নেমে এসেছে স্থবিরতা। এই মহামারীতে মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চলছে করুণ বিপর্যয়। দীর্ঘ লকডাউনের কারণে দেশের অর্থনৈতিক অচলায়তন, ভঙ্গুর প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য এক চরম দুঃসময়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমীক্ষা প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশের দৈনিক আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে তিন হাজার ৩০০ কোটি টাকা। কর্মহীন, অর্থহীন সমাজে দেখা দেয় নানা অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা। অসহিষ্ণু মানুষ অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠতে পারেন। এমনই এক আকালের দিনে দেশ বাঁচাতে, দেশের মানুষ বাঁচাতে, দিনরাত লড়ছেন নানা শ্রেণিপেশার মানুষ।


সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রাসেল চৌধুরীর তত্ত্বাবধায়নে ভাতা বিতরণ করা হয়


লকডাউনে দিনে ক্ষতি ৩৩০০ কোটি টাকা: সমীক্ষা

চেষ্টা করব ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দেওয়ার: প্রধানমন্ত্রী


করোনাভাইরাস সঙ্কট মোকাবিলায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩১ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন। ঘোষণা করেছেন ৭২ হাজার ৫ শত কোটি টাকার বিভিন্ন প্যাকেজ প্রনোদনা। এগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে  প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি অব্যাহত রাখাসহ প্রবীণ ও শিশুদের সুরক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা। গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে তিনি বলেছেন, দেশের দারিদ্র্যপ্রবণ ১০০টি উপজেলাকে  শতভাগ ভাতার আওতায় নিয়ে আসবেন।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে সে লক্ষ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছে। অচিরেই এসব উপজেলার সকল প্রবীণ নাগরিক চলে আসবেন সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ছায়া করতলে।

সাধারণ ছুটিতে মানুষ যখন গৃহে আবদ্ধ তখন সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নে সমাজসেবা অধিদপ্তরের সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ কোভিড-১৯ কবলিত বাংলার জনপদে নিরবচ্ছিন্ন সেবা প্রদান অব্যাহত রেখেছেন।

সরকারি সাধারণ ছুটি শুরু হয়েছে ২৬শে মার্চ হতে কিন্ত মাঠ প্রশাসনের যে দপ্তরগুলো মানুষের সেবায় নিবেদিত প্রাণ হয়ে কাজ করে চলেছেন, সমাজসেবা অধিদপ্তর সেগুলোর মধ্যে অন্যতম।

প্রান্তিকের  সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন, অসহায় মানুষের জন্য ত্রাণ সহায়তা কিংবা নিরন্ন পরিবারে খাদ্য পৌঁছে দেওয়া, প্রশাসনের সার্বিক সমন্বয়ে বিভিন্ন দপ্তরের ট্যাগ অফিসারের দায়িত্ব পালন, সদাসর্বদা রাষ্ট্রের সেবায় সচেষ্ট দায়িত্ব পালন করে চলেছেন; দেশ বাঁচানোর লড়াইয়ে বিশ্রামের যে ফুরসৎ নেই একেবারেই।


খাগড়াছড়ির দুর্গম পাহাড়ি জনপদে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর বাড়িতে উপবৃত্তির চেক পৌঁছে দেন শহরসমাজসেবা কর্মকর্তা মুহাম্মদ নাজমুল আহসান মাসুদ

সামাজিক নিরাপত্তার ভাতার অর্থ বিতরণের সর্বশেষ ধাপে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে কাজ করে রাষ্ট্রায়ত্ত তফসিলি ব্যাংক। কিন্তু এই সময় ব্যাংকগুলোও দিনে দিনে হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ। করোনাভাইরাস বিস্তারের মোক্ষম ‘হটস্পট’।

যদিও সরকার  সীমিত আকারে ব্যাংকিং সেবা চালু রেখেছে, তবুও মাত্র কয়েক ঘন্টার লেনদেনে সামাজিক নিরাপত্তার ভাতা বিতরণ কর্মসূচি পরিচালনা বহুমুখী চ্যালেঞ্জিং কাজ।

একদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা মোতাবেক সুরক্ষা নিশ্চিত করে করোনাভাইরাস সংক্রমণ এড়ানো; অন্যদিকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে একটি সংক্ষিপ্ত সময়ে, স্বল্প জনবল নিয়ে বৃহৎ সংখ্যক মানুষের কাছে রাষ্ট্র প্রদত্ত অর্থ হস্তান্তর সম্পন্ন করতে হবে।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করবার কথা। বর্তমানে লকডাউনে স্কুল-কলেজ বন্ধ রয়েছে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে গ্রামের বন্ধ স্কুলগুলোকে ভাতা প্রদানে ব্যাংকের বিকল্প ভেনু হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাগণ ব্যাংকগুলোর সাথে আলোচনা করে উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় প্রতিটি ইউনিয়নের তালিকা অনুযায়ী ভাতার অর্থ হস্তান্তরের উদ্যোগ  নেন। ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধির উপস্থিতিতে, ব্যাংকের প্রতিনিধির মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ভাতাভোগীর বাড়ির আঙিনার স্কুলে গিয়ে সমাজসেবা কর্মকর্তাগণ বিতরণ করে আসছেন বয়স্ক,  বিধবা ও স্বামী নিগৃহিতা মহিলা এবং অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতার জন্য সরকার নির্ধারিত পরিমাণে নগদ অর্থ।

হাতে হাতে বিতরণ চলছে সামাজিক নিরাপত্তার সরকারি অর্থ; ছবি- রাজীব বাগচি

সার্বিক নিরাপত্তা বিধানে স্থানীয় প্রশাসন, থানা এবং গ্রামপুলিশ রাখছেন গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা। ছোঁয়াচে করোনার সংক্রমণ প্রতিহত করার লক্ষ্যে এ পন্থাবলম্বন করা হলেও দেশের প্রান্তিক অসহায় দরিদ্র মানুষগুলো সহজে পেয়ে যাচ্ছেন কাঙ্ক্ষিত সেবা; হাতে হাতে পৌঁছে যাচ্ছে নগদ অর্থ।

বয়স্ক,বিধবা ও স্বামী নিগৃহিতা দুস্থ মহিলা, অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা এবং প্রতিবন্ধী শিক্ষা উপবৃত্তির জন্য প্রত্যেক আর্থিক বছরে মোট চার ধাপে অর্থ বিতরণ করা হয়ে থাকে; প্রতি তিন মাস অন্তর সমাজসেবা অধিদপ্তর মাঠ পর্যায়ে অর্থ ছাড় করেন। বর্তমানে সাধারণ ছুটির মধ্যে চলছে ২০১৯-২০ অর্থ বছরের ৩য় কিস্তির (জানুয়ারি-মার্চ)অর্থ বিতরণের কাজ। তৃতীয় কিস্তির অর্থ বিতরণ চলমান অবস্থায় সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শেখ রফিকুল ইসলাম এই দুর্যোগ মোকাবিলায় মাঠ পর্যায়ে প্রান্তিক মানুষের নিকট অর্থের প্রবাহ বাড়াতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির চতুর্থ কিস্তির (এপ্রিল-জুন)  অর্থ অগ্রীম ছাড় করে দিয়েছেন।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটের সূত্র অনুযায়ী, অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা কর্মসূচির ২০১৯-২০ অর্থ বছরের ১৫ লাখ ৪৫ হাজার জন ভাতাভোগীর মাসিক ৭৫০ টাকা হারে  মোট বরাদ্দ ১৩৯০.৫০ কোটি টাকার তৃতীয় এবং চতুর্থ কিস্তি, বিধবা ও স্বামী নিগৃহিতা মহিলা ১৭ লাখ জন ভাতাভোগীর জন্য ২০১৯-২০ অর্থ বছরের মোট বরাদ্দ ১০২০ কোটি টাকার তৃতীয় এবং চতুর্থ কিস্তি, ৪৪ লক্ষ জন বয়স্ক প্রবীণ নাগরিকদের ভাতার জন্য ২০১৯-২০ অর্থ বছরের মোট বরাদ্দ ২৬৪০ কোটি টাকার তৃতীয় এবং চতুর্থ কিস্তি ছাড়াও প্রায় ১ লাখ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ২০১৯-২০ অর্থ বছরে প্রতিবন্ধী শিক্ষা উপবৃত্তি ৯৫ দশমিক ছয় চার কোটি টাকার তৃতীয় এবং চতুর্থ কিস্তির নগদ অর্থ বিতরণের ব্যবস্থা চলমান রয়েছে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিবেদিত প্রাণ হয়ে দেশব্যাপী  পরিচালনা করছেন সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিস্তৃত নেটওয়ার্ক। ‘মুজিব বর্ষের চেতনায়, সমাজসেবা দোরগোড়ায়’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বিগত ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাস কালীন সময়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের উন্মুক্ত পদ্ধতিতে ভাতাভোগী বাছাইয়ের কর্মসূচি দেশব্যাপী প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিকট ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল।


মুজিববর্ষের ক্ষণে হাতে হাতে পৌঁছে যাবে ভাতা কার্ড


করোনাভাইরাস সংকট মোকাবিলায় দেশের আপামর প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রায় ৮০ লাখ মানুষের নিকট সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির তৃতীয় ও চতুর্থ কিস্তির সহস্রাধিক কোটি টাকার নগদ প্রবাহ নিশ্চিত করা সরকারের মানবিক উদ্যোগের একটি অনন্য উদাহরণ। করোনায় রুদ্ধ গ্রামীণ অর্থনীতিতে নগদ অর্থের এ প্রবাহ প্রাণের সঞ্চার করবে নিঃসন্দেহে।

মন্তব্য ২ পঠিত