ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয় কেন  সেরা দুই হাজারের মধ্যে নাই, এটা নিয়ে ইদানিং এটা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া, ছাত্র-শিক্ষক, জ্ঞানী-গুণীমহলে বেশ আলোচনা হতে দেখা যায়। কোন কোন র‍্যাঙ্কিং প্রতিষ্ঠান মাঝে মাঝে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে সেরা এক হাজারের মধ্যে রাখলেও, সেটা নিয়ে তেমন প্রচার পায় না।

আমার এই লিখাটার উদ্দেশ্য হল দুটি- ১) কিভাবে বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাঙ্কিং করা হয়, ২) কিভাবে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বর্তমান অবকাঠামোর সামান্য পরিবর্তন করে র‍্যাঙ্কিং-এ এগিয়ে আসতে পারে তা নিয়ে আলোকপাত করা। আমার সুবিধার্থে আমি বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় একটি র‍্যাঙ্কিং প্রতিষ্ঠানের মাপকাঠি এবং এর সাথে আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন পিএইচডি করছি, উক্ত র‍্যাঙ্কিং-এ তার অবস্থান নিয়ে  আলোচনা করব।

কর্মসূত্রে আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। ২০১৩ সালে যুক্তরাজ্যের কমনওয়েলথ স্কলারশিপ নিয়ে আমি ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে (ইউ সি এল) পিএইচডি করতে আসি। ইউ সি এল পছন্দ করার অন্যতম কারণ ছিল এর র‍্যাঙ্কিং। কিউ এস র‍্যাঙ্কিং-এ (http://www.topuniversities.com/) সারা বিশ্বে ইউসিএলের অবস্থান ২০১৬/১৭ সালে হয়েছে সপ্তম, ইউরোপে তৃতীয়। অন্যান্য  লিগ টেইবল, যেমন টাইমস হাইয়ার এজুকেইশনে  (www.timeshighereducation.com/world-university-rankings/) এর অবস্থান এই বছর বিশ্বে ১৫ তম। এই বছর অক্সফোর্ড  বিশ্ববিদ্যালয় সবাইকে পিছে ফেলে এক নম্বরে উঠে এসেছে। ইউসিএলে অধ্যয়নের কারণে, আমার দেখার সুযোগ হয়েছে কিভাবে লিগ টেইবলে এর অবসথান এতো উপরে। আমি সেগুলোই আলোচনা করব।

প্রথমে কিউএস (QS World University Rankings®) কিভাবে র‍্যাঙ্কিং করে তা এক  নজরে দেখে নেই। কিউএস মোট ছয়টা পারফরমেন্স ইনডিকেইটরের মাধ্যমে  র‍্যাঙ্কিং করে থাকে (মোট স্কোর ১০০)। এগুলো হলঃ

১। প্রাতিষ্ঠানিক সুনাম (৪০%)ঃ এটা পরিমাপ করার ভিত্তি হল জরিপ। এর জন্য সারা বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং বিজ্ঞানীদের কাছে জানতে চাওয়া হয়, তার নিজস্ব গবেষণা বিষয়ে সবচেয়ে সেরা কাজটি বর্তমানে  কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকগণ করছেন। প্রাতিষ্ঠানিক সুনামকে ৪০% নম্বর দেয়ার কারণ হল এতে করে সারাবিশ্বের গবেষকদের মতামত প্রলক্ষিত হয়। ২০১৬/১৭ সালে সর্বমোট ৭৪,৬৮১ জন গবেষক এই জরিপে অংশ নিয়েছিলেন।

উন্নতমানের গবেষণা ল্যাব এবং সাথে সাথে গবেষণার জন্য সুযোগসুবিধা না থাকলে এই সুনাম কখনোই অর্জন করা যাবেনা। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা বরাদ্দের কথা আমাদের সবারই কমবেশি জানা আছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়,  আমার পিছনে ইউসিএল বছরে গবেষণা খাতে কমপক্ষে প্রায় ৫-৬ লাখ টাকা খরচ করে। এটা শুধু ক্যামিকেল বা রিয়াজেন্ট বাবদ। অথচ, এই সমপরিমাণ টাকা সারা বছরে আমাদের একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেয়া হয় কিনা জানিনা।  সুতরাং, এই ৪০ ভাগ নম্বরের জন্য  ভালো করতে হলে গবেষণা খাতে প্রচুর বরাদ্দ দরকার।  সরকার চাইলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়ে ধীরেধীরে এ কাজটি করতে পারে।

২। চাকুরীদাতা প্রতিষ্ঠানসমূহের নিকট সুনাম (১০%)ঃ এটিও করা হয় জরীপের মাধ্যমে।  এর জন্য চাকুরীদাতা প্রতিষ্ঠানসমূহের কাছে জানতে চাওয়া হয়, তাদের মতে বর্তমানে  কোন বিশ্ববিদ্যালয় সবচেয়ে ভালো গ্রাজুএইট তৈরী করছে। এই ইনডিকেটরের মাধ্যমে  ছাত্ররা বুঝতে পারে, কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুএইটদের চাহিদা চাকুরী বাজারে বেশী। মজার ব্যাপার হল, কোন প্রতিষ্ঠান যদি  বিদেশী কোন বিশ্ববিদ্যালয়কে ভোট দেয় তাহলে তার পয়েন্ট বেড়ে যায়। এর মাধ্যমে বুঝা যায় কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুএইটদের সুনাম বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। ২০১৬/১৭ সালে প্রায় ৩৭, ০০০ চাকুরীদাতা প্রতিষ্ঠান এই জরীপে অংশ নিয়েছিল।

এখন প্রশ্ন হল আমাদের দেশের চাকুরীদাতা প্রতিষ্ঠানসমূহ এই জরীপে সাড়া দেয় কিনা। সরকার থেকে বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এই ব্যাপারে কোম্পানিগুলোকে নির্দেশনা দেয়া না থাকলে, আমার ধারণা আমাদের দেশের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান এতে অংশ নিবে না। যদিও এটা মাত্র দশ ভাগ, কিনুত এটা করা অনেক সহজ এবং তেমন ব্যয়সাধ্য নয়।  শুধু দরকার সচেতনতা। এটা ঠিকভাবে নিসচিত করা গেলে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‍্যাঙ্কিং একটু হলেও উপরে উঠবে।

৩। ছাত্র-শিক্ষকের অনুপাত (২০%)ঃ ১০০ মার্কসের মধ্যে বিশ মার্কস রাখা হয় এই ইনডিকেটরের জন্য। সুতরাং, এটা র‍্যাঙ্কিং-এ ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এর উদ্দেশ্য হল পরোক্ষভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পড়ানোর মান যাচাই করা। মনে করা হয়, ছোট ক্লাস সাইজ হলে পড়ানোর মান ভালো হয়। ছাত্ররা শিক্ষকদের কাছে ভালো সেবা নিতে পারে বা শিক্ষকরা ভালো সেবা দিতে পারে।

এই ইনডিকেইটরটা উন্নত করা একটু কঠিন। কিন্তু, সঠিক পরিকল্পনা থাকলে অনেক এগিয়ে নেয়া সম্ভব। নতুন নতুন বিভাগ না খুলে, প্রতিষ্ঠিত বিভাগগুলোতে শিক্ষকের পরিমাণ বাড়িয়ে, এই ভাগে বেশী মার্কস নিয়ে আসা সম্ভব। কত সংখ্যক গ্রাজুএইট তৈরি হলো তা না কাউণ্ট করে, কত সংখ্যক ভালো গ্রাজুএইট বের হলো সেটা  বিবেচনায় আনা উচিৎ।

৪। প্রতি শিক্ষক প্রতি সাইটেশনের সংখ্যা (২০%)ঃ  সাইটেশন মানে হল কোন একটা গবেষণা পত্র অন্য কোন গবেষণা পত্রে সাইট করা বা রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করা। জার্নালের ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টরও এই সাইটেশন গণনার মাধ্যমে করা হয়। কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বমোট সাইটেশন তার সর্বমোট শিক্ষক সংখ্যা দিয়ে ভাগ করা হয়, যাতে বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সুবিধা না নিতে পারে।

সাইটেশন গবেষণার মানের উপর নির্ভরশীল। ভালো মানের কাজ না হলে আপনার পেইপার  ভালো জার্নালে প্রকাশ হবে না এবং কেউ রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করবে না। উন্নত কাজের সাথে আবার সেই উন্নতমানের গবেষণা ল্যাব এবং সাথে সাথে গবেষণার জন্য সুযোগসুবিধা সম্পর্কিত। তার মানে প্রথম ইনডিকেইটরের ৪০% এবং এই ইনডিকেইটরের ২০%, সবমিলিয়ে ৬০% মার্কস প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে গবেষণার সাথে জড়িত। এক্ষেত্রে ভালো করতে হলে শুধুমাত্র বিজ্ঞান গবেষণায় বরাদ্দ বাড়ালে হবে না, আর্টস, সোশ্যাল সায়েন্স, বানিজ্য সব বিষয়ে গবেষণা বাড়াতে হবে এবং ভালো জার্নালে প্রকাশনা করতে হবে। তা না হলে, যখন সর্বমোট সাইটেশন তার সর্বমোট শিক্ষক সংখ্যা দিয়ে ভাগ করা হবে, তখন অবিজ্ঞান শাখার শিক্ষকদের কম সাইটেশনের কারণে, টোটাল স্কোর কমে যাবে। মোদ্দা কথা হলো, র‍্যাঙ্কিং-এ আগাতে হলে গবেষণা বাড়াতে হবে।

৫। আন্তর্জাতিক শিক্ষকের সংখ্যা (৫%)ঃ এই ইনডিকেটরটা খুব ইন্টেরেস্টিং। তার মানে র‍্যাঙ্কিং এর শতকরা পাঁচ ভাগ নির্ভর করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কত সংখ্যক বিদেশীকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে পারলো তার  উপর।

এটা উন্নত করা কত কঠিন তা সহজেই অনুমেয়। আমাদের দেশে যেখানে এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা ছাত্রদের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ দেয়া এক ধরণের অকল্পনীয় বিষয় (নতুন বিভাগ/নতুন বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া), সেখানে বিদেশীদের! আর বিদেশীরা এই অল্প বেতনে কেন যাবে বাংলাদেশে শিক্ষকতা করতে? আমাদের পাশের গরীব দেশ নেপালেও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিকদের বেতন, আমাদের থেকে বেশী।

৬। আন্তর্জাতিক ছাত্রের সংখ্যা (৫%)ঃ আন্তর্জাতিক শিক্ষকের সংখ্যার পাশাপাশি কিউ এস আন্তর্জাতিক ছাত্রের সংখ্যাও ইনডিকেটর হিসেবে রেখেছে। এটা করা খুব সহজ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদেশী ছাত্রদের জন্য সহজে ভর্তির শর্ত,  এবং নিরাপত্তা বাড়িয়ে এ ইনডিকেটরটায় ভালো করা সম্ভব। ইউসিএলে বিদেশী ছাত্রের সংখ্যা ৩৪%।

আমার ধারণা আমি আপনাদের বুঝাতে সক্ষম হয়েছি, কেন বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয় সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সারিতে যেতে পারেনা। আমাদের অনেক পথ বাকি। এই সকল ইনডিকেটরকে আমলে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারের আলোচনা হওয়া উচিৎ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি নিজস্ব পরিকল্পনা থাকতে হবে এবং কিভাবে তা বাস্তবায়ন করা যায় তা নিয়ে সরকারকে প্রস্তাব দিতে হবে। বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে আগামীতে আর হয়তো কোন বাংলাদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম লিগ টেবিলে স্থান পাবেনা।

মোঃ আজিজুর রহমান

লন্ডন থেকে