ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত

ঘটনা-১

ইউকে তে এসেছি ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। গরমের দেশ থেকে এসে এখানকার অটামের তাপমাত্রা সহ্য করতে বাইরে গেলে কোট পরে না যাওয়ার উপায় ছিলনা। এটা দেখে আমার সুপারভাইজার বেশ মজা করে বলতেন “আর ইউ কোল্ড আজিজুর?” আমি হেসে বলতাম “ইয়েস আই এম”। যাই হোক এসে এখানকার পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে না খাওয়াতে নভেম্বরের শেষে গেলাম বার্মিংহামে দুই দিনের একটা ওয়ার্কশপে। দেশে থাকতেই সুপারভাইজার আমার জন্য রেজিস্ট্রেশন করে রেখেছিলেন। “মেকানিজম অফ অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স’’ নিয়ে ব্রিটিশ সোসাইটি অফ অ্যান্টিমাইক্রবিয়াল কেমোথেরাপির বাৎসরিক প্রোগ্রাম এটি। অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে কাজ করা সব গবেষকদের বিশাল সম্মিলন হয় এখানে। হাই প্রোফাইলের প্রফেসররা/ গবেষকরা তাঁদের কাজ নিয়ে টক দেন, পিএইচডি ছাত্ররা পোস্টার প্রেজেন্ট করে, তাদের জন্য কিছু ওরাল প্রেজেন্টেশনের সুযোগও থাকে।

আমাদের গ্রুপের সবার একসাথে লন্ডন ইউস্টন স্টেশন থেকে ৯.৩০ মিনিটে ট্রেনে যাবার কথা। বাসা থেকে ঠিক সময়ে বের হয়েও স্টেশনের আগামাথা বুঝতে বুঝতে তিন মিনিটের জন্য ট্রেন মিস করলাম। সবাই আমাকে নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন ছিল। সুপারভাইজারের একের পর এক মেসেজ। “আর ইউ ওকে আজিজুর?” তাকে মোবাইল মেসেজে বুঝালাম আমি আসতে দেরি হওয়ায় ট্রেন মিস করেছি। কি করব বুঝছিনা। উনি বললেন টিকিট কেটে পরের ট্রেনে চলে আসতে। বললেন “আই উইল পে ফর দ্যা টিকেট। ডোন্ট ওয়ারী।” টিকিট কাটতে গিয়ে মাথা খারাপ। যে টিকেট এক মাস আগে আমার  সুপারভাইজার কিনেছিলেন মাত্র ৭ পাউন্ডে, সেটা ভ্রমণের দিন ৭০ পাউন্ড। এটা এখানকার নিয়ম। দূ্রপাল্লার অনেক ট্রেনে দিনে দিনে ভাড়া বাড়তে থাকে এবং জার্নির দিন হয়ে যায় কয়েকগুণ!

ট্রেনের টিকিট কেটে আধাঘণ্টা পরের ট্রেনে একা একা হলিডে ইনে যখন পোঁছালাম তখনও প্রোগ্রাম শুরু হয়নি। রেজিস্ট্রেশন ডেস্কের কাছেই আমার বসের সাথে দেখা। হাসিমুখে সম্ভাষণ। তারপর আমার ড্রেসের দিকে তাকিয়ে খুব হাসিমুখে বললেন, “ ইউ লুক ভেরি গুড আজিজুর”। আমি ধন্যবাদ জানালাম। চা-কফি খেয়ে গ্রুপের সবাই বসলাম এক গোল টেবিলে। প্রোগ্রাম শুরু হল। এক ফাঁকে আমার সুপারভাইজার আমাকে বললেন, “ডিড ইউ নোটিস দ্যাট ইউ আর দি অনলি পারসন ইন দিস ওয়ার্কশপ উইথ আ টাই? ইভেন দ্যা চেয়ার অফ দ্যা সেশান ডিড নট পুট অন এ টাই। হা হা হা।” এ বিষয়টা উনি না বলা পর্যন্ত চোখে পড়েনি। চোখ বুলিয়ে দেখালাম আসলেই তো গোটা হলে আমি শুধু একাই টাই পরে ভাব নিয়ে বসে আছি। বেশ লজ্জা লাগা শুরু করলো।  কিছুক্ষণ পরে বের হয়ে টয়লেটে গিয়ে টাই খুলে কোটের পকেটে রেখে সভ্য হয়ে বসলাম।  এবার আমার বস (সুপারভাইজার) বললেন “ইউ লুক বেটার নাউ।” কালচারাল কনফ্লিক্ট/ কালচার শক মনে হয় এটাকেই বলে।

ঘটনা-২

আমার এক ছাত্র আমাকে কাল রাতে মেসেঞ্জারে মেসেজ পাঠালো। দেশের বাইরে থাকলেও আমি চেষ্টা করি আমার ছাত্র-ছাত্রীদের যেকোনো মেসেজের তাৎক্ষণিক উত্তর দিতে। তার মেসেজের ভাষা খুব সুন্দর। সম্বোধনটা এরকমঃ হ্যালো স্যার..ব্লা ব্লা ব্লা… আই নিড এ রেকামেন্ডেশন লেটার…ব্লা ব্লা ব্লা। পাশ্চাত্যে তিন বছর থেকে হাই হ্যালো এগুলোর সাথে বেশ মানিয়ে নিয়েছি। কোন মুসলিম সহকর্মীকে অনেকের সাথে দেখলে সালাম না দিয়ে হ্যালো দিয়েই সারতে হয়। এখানে সবার সামনে মিক্সড কমুনিটিতে সালাম দেয়ার প্রচলন নেই। তবুও কেন জানি আমার সেই ছাত্রের হ্যালো বলে সম্বোধন করাটা পছন্দ হলনা। দেশী ছাত্রের কাছে দেশী সংস্কৃতি আশা করেছিলাম। এটা মনে হয় আরেক রকমের কালচারাল কনফ্লিক্ট।

ছোট বেলা থেকে গুরুজনদের, শিক্ষকদের ধর্ম অনুযায়ী সালাম বা আদাব দিতে শিখেছি। এখনও দেশী কালচারে গেলে তাই করি। সালাম দেই, কেমন আছেন জিজ্ঞাসা করি। হ্যালো বলাটা হয়ে উঠেনা। সম্ভবত আমার ওই ছাত্র মনে করেছে, স্যারতো বিদেশে অনেকদিন। তাই মনে হয় হ্যালো বলাটাই স্মার্টনেস হবে। আমি সাথে সাথে উত্তর দিলাম। লিখলাম “আসসালামু আলাইকুম… থ্যাংকস… ব্লা ব্লা ব্লা…”। উত্তর পেয়ে ওই ছাত্রের কি অনুভূতি হয়েছিলো জানিনা, কিন্তু সে প্রতি উত্তরে আমাকে খুব সুন্দর করে সালামের উত্তর দিয়েছিলো দেখে ভালো লাগলো।

সংস্কৃতিকে আমাদের সবসময় সম্মান করতে হবে। এখানে ভার্সিটিতে শিক্ষকদের সবাই নাম ধরে ডাকে। নামের আগে এমনকি ডক্টর, প্রফেসর বলতে তেমন দেখা যায় না (বিশেষ মুহূর্ত বাদে)। আমি আমার সুপারভাইজারদেরকে শুধু তাঁদের নামের প্রথম অংশ দিয়ে ডাকি। কারণ এখানকার সংস্কৃতি এটাই। এখানে আমাদের দেশের মতো প্রফেসারদের “স্যার” বলে ডাকলে কি পরিস্থিতি হবে জানিনা। হয়তো বিশাল শক খাবে। আমাদের দেশে স্যার বলা সংস্কৃতি। যদিও মাঝে মাঝে এটা নিয়ে অনেক বাড়াবাড়িও হয়। তবে সেটা শিক্ষকদের ক্ষেত্রে নয়। অন্য প্রফেশনের লোকদের মধ্যে। আমাকে কেন স্যার বলে হলনা ইত্যাদি, ইত্যাদি।

কথা হল এখন আমি দেশে গিয়ে এখানকার সংস্কৃতি পালন করা শুরু করি, মানে যদি আমার শিক্ষকদের বা সিনিয়র  কলিগদের নাম ধরে ডাকা শুরু করি তাহলে কি দাঁড়াবে? কিংবা আমার ছাত্ররা যদি আমাকে শুধু আজিজুর বা শামীম বলে ডাকে? এটা কি মানতে পারব? মনে হয় না। সুতরাং, যেখানকার যেটা সংস্কৃতি সেটা সেখানে পালন করা আবশ্যক। বেশি স্মার্টনেস ভালো না।

মোঃ আজিজুর রহমান

লন্ডন থেকে