ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

জনশক্তি রপ্তানি, বাংলাদেশের ২য় সর্বোচচ বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস। মোট রপ্তানি আয়ের দুই তৃতীয়াংশ আসে প্রবাসী আয় থেকে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথ্য দিয়েছে চলতি বছরে প্রবাসী আয় বৃদ্ধি পেয়েছে গত বছরের তুলনায় ১০.২৬ ভাগ। চলতি অর্থ বছরে (জুন-জুলাই) মোট প্রবাসী আয় হয়েছে ১২.৮৬ মার্কিন ডলার। ২০১০-১১ অর্থ বছরে যা ছিল ১১.৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার । কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাময়িক ভাবে প্রস্তুতকৃত এই আর্থিক চিত্র থেকে দেখা যায় যে জুন মাসে বাংলাদেশ প্রবাসী আয় হয়েছে ১.০৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। চলতি অর্থ বছরে মোট প্রবাসী আয় ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা এর কাছাকাছি একটা পর্যায়ে উন্নীত হতে পারে। তথ্যমতে দেখা যায় যে সেপ্টেম্বর মাসে আয়কৃত প্রবাসী আয় ৪৫৫.৪৪ হয়েছে, যা চলতি আর্থিক বছরে নর্বনিম্ন। জানুয়ারী মাসে প্রবাসী আয় হয়েছে ১.২২ যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। বর্তমানে আমাদের দেশের মোট ৮ মিলিয়ন শ্রমিক প্রবাসে কর্মরত আছে। তাদের পাঠানো অর্থ আমাদের অর্থনীতিতে অনেক বড় ভূমিকা রাখে। প্রবাসী আয় কমে গেলে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ কমে যাবে। এর ফলে সরকার টাকার মূল্য মান কমাবে। যার ফলশ্রুতিতে অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতির পরিমান বেড়ে যাবে। মুদ্রাস্ফীতির বেড়ে গেলে স্বাভাবিক ভাবে নিত্য নৈমত্তিক দ্রব্যাদির দাম বেড়ে যাবে। যার ফল ভোগ করতে হবে মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীকে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক পরিসংখ্যান দেখা অনুযায়ী প্রবাসী আয়ের ৬০ ভাগ ই আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। কিন্তু বর্তমানে মধ্য প্রাচ্যের শ্রম বাজারে বাংলাদেশী শ্রমিকের মান কমে গেছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ইরাক এবং লিবিয়া বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। মালয়শিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি তিন মাস ধরে বন্ধ আছে। ফলে নেপাল, ভারত এবং ইন্দোনেশিয়া জনশক্তি রপ্তানি এই বাজারকে আঁকড়ে ধরেছে। বৈদেশিক সম্পর্ক মন্ত্রনালয় এই সম্পর্কে কিছূ বলেনি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমাদের কর্মরত শ্রমিকদের বিভিন্ন কারনে দেশে ফেরার জন্য জোর করা হচ্ছে। যতক্ষন না পর্যন্ত জনশক্তি রপ্তানির স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসবে ততক্ষণ রেমিটেন্স এর উপর খারাপ প্রভাব পড়বে। সম্প্রতি জনশক্তি রপ্তানি মন্ত্রনালয় এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, সৌদি আরব বাংলাদেশসহ কিছু দেশের উপর জনশক্তি রপ্তানির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। বিদেশী শ্রমিকদের উপর তারা কিছু নতুন নিয়ম আরোপ করেছেন। বিদেশী শ্রমিকরা বিক্রয়প্রতিনিধি, হিসাবরক্ষক এবং ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করতে পারবে না এবং প্রত্যেক কোম্পানিতে কমপক্ষে ত্রিশ শতাংশ কর্মচারী সৌদি আরবের হতে হবে।

গত আট মাসে বাংলাদেশ থেকে মাত্র এগার হাজার শ্রমিক সৌদি আরবে যেতে পেরেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত বাংলাদেশের জন্য দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ জনশক্তি রপ্তানির বাজার। তারা আমাদের শ্রমিকদের ভিসা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। এর কারণ হিসেবে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডকে বাংলাদেশী শ্রমিকদের লিপ্ত হওয়াকে বিবেচনা করা দিয়েছেন। কুয়েতে জনশক্তি রপ্তানির বাজার বন্ধ হয়েছে ২০০৬ সালে। ফলে ভারত এবং পাকিস্তান থেকে জনশক্তি রপ্তানির হচ্ছে। গালফ সহযোগী দেশগুলো চেষ্টা করছে বিদেশি শ্রমিকদের উপর নির্ভরতা কমাতে। মালয়শিয়া, লিবিয়া, ইরাক এবং দুবাইতে অবৈধভাবে বসবাসরত শ্রমিকের সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। মালায়শিয়া বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি নিতে আগ্রহী কিন্তু তার আগে অবৈধভাবে জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে বন্ধ করতে হবে। জনশক্তি রপ্তানি মন্ত্রনালয় বলছে যে, বাংলাদেশ হতে ১৪৩ টি দেশে জনশক্তি রপ্তানি করা হচ্ছে যা প্রথম দিকে ১৫ টি দেশে রপ্তানি করা হতো। মন্ত্রনালয় আরো বলেছেন, জনশক্তি রপ্তানি প্রকৃতপক্ষে বৃদ্ধি পাচ্ছে যদি ও অনেক দেশই বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত বাংলাদেশী শ্রমিকদেরকে ভিসা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। এর কারণ হিসেবে অসামাজিক কাজে শ্রমিকদের লিপ্ত হওয়াকে বিবেচনা করা হয়েছে। কুয়েতে জনশক্তি রপ্তানি ২০০৬ সাল থেকে বন্ধ। প্রায় দুই লক্ষ বাংলাদেশী শ্রমিক কুয়েতে কর্মরত রয়েছে। সাম্প্রতিকালে কুয়েতে বাংলাদেশীদের কোনঠাসা করা হচ্ছে। প্রায় দুইশত শ্রমিক কুয়েত থেকে ফেরত এসেছে। ফলে পাকিস্তান, নেপাল এবং অন্যান্য দেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানি করছে। অবৈধভাবে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তান, নেপাল এবং অন্যান্য দেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানি করছে। অবৈধভাবে বাংলাদেশ থেকে মালায়শিয়া, লিবিয়া, ইরাক, দুবাই এবং বিভিন্ন দেশে শ্রমিকেরা যাচ্ছে। জনশক্তি রপ্তানি সংস্থাগুলো মনে করছে বাংলাদেশের জন্য শ্রম বাজার ক্রমে ক্রমে মুক্ত হচ্ছে। কিন্তু অবৈধভাবে বাংলাদেশীদের প্রবেশ বন্ধ না করলে এ দ্বার বন্ধ হয়ে যাবে। এটা অভিযোগ করা হচ্ছে যে, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারনে মধ্যপ্রাচ্যের রপ্তানির বাজার বাংলাদেশ হারিয়ে ফেলছে। গ্রামীন ব্যাংক এবং ডঃ মুহাম্মাদ ইউনুস সমস্যার কারণে বাংলাদেশ এবং পশ্চিমা দেশের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়াও পদ্মা সেতু প্রকল্পের কারণে ও সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। গত বছর লিবিয়ায় সংঘর্ষের প্রায় ৪০০০০ বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। যাদের আংশিক রাজনৈতিক দৃঢ়তা আছে তারা নিজের চেষ্টায় ফিরতে শুর করেছে। কিন্তু এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর প্রধান সৌদি আরব। এজন্য মুসলিম দেশগুলোর সাথে আমাদের সম্পর্ক সৌদি আরবের সাথে আমাদের সম্পর্কের গভীরতার উপর নির্ভর করে। মধ্যপ্রাচ্যের জনশক্তির রপ্তানি এই বাজার ধরে রাখতে আমাদের সম্পর্কের গভীরতার উপর নির্ভর করে। মধ্যপ্রাচের জনশক্তির রপ্তানির এই বাজার ধরে রাখতে আমাদের তাদের সাথে আমাদের সম্পর্ক গভীর করতে হবে। পশ্চিম দেশগুলোর সাথে আমাদের সম্পর্ক এত বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ নয়। ফলে আমাদের শ্রম বাজার একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। জনশক্তির রপ্তানির এই বাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে আমাদের অর্থনীতিকে খারাপ প্রভাব পড়ছে। তবে বর্তমানে আশার কথা যে, মালয়শিয়া শীঘ্রই বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি আমদানী করবে বলে আশ্বাস দিয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নিচ্ছে।

শামসুন নাহার, রাকিবুল ইসলাম, আইভি আক্তার, মরিয়ম সুলতানা এবং নিপুল হোসেন
ডিপার্টমেন্ট অফ ফিন্যন্স ১৭তম ব্যাচ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।