ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

ভূমিকা: বাঙালি জাতির ইতিহাস হাজার বছরের পুরনো। ইতিহাসে দেখা যায় অনেক জনগোষ্ঠী সভ্যতার আদিলগ্নেই সচেতন জাতীয়তাবাদী ভাবাদর্শে না-হোক জ্ঞাতিসম্পর্কের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাষ্ট্র গঠনে প্রয়াসী হয়েছে; কিন্তু বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর তেমন কোনো সচেতন ও সংঘবদ্ধ প্রয়াস লক্ষ্য করা যায় না। অন্যদিকে আঠারো শতকের মাঝামাঝি পশ্চিম ইউরোপে জাতীয়তাবাদী ভাবাদর্শের উদ্ভব হলেও বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ পরিলক্ষিত হয় বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে। বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে এই সচেতন ও সংঘবদ্ধ জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকশিত করার ক্ষেত্রে যিনি প্রাণপুরুষের ভূমিকা পালন করেছেন তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বলা বাহুল্য, কাজটি মোটেও সহজ ছিল না। কারণ বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম জনগোষ্ঠী জাতিগত পরিচয়ে মুসলমান নাকি বাঙালি এ ব্যাপারে এই সাম্প্রতিক সময়েও অনেকেরই ধারণা বড়ই গোলমেলে। এই যে নিজেদের জাতিগত পরিচয় সম্পর্কে অস্পষ্টতা তার নানান ঐতিহাসিক কার্যকারণ রয়েছে। বিশেষত, ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক হিন্দু মুসলিম সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ উসকে দেওয়ার ফলশ্রুতিতে ১৯৪০ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর দ্বিজাতি-তত্ত্ব এবং তার ভিত্তিতে পাকিস্তান আন্দোলন এ ক্ষেত্রে প্রধান নিয়ামক। তথাপি বঙ্গবন্ধুই বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে প্রথম সচেতন ও সংঘবদ্ধ বাঙালি জাতীয়তাবাদী ভাবাদর্শের ভিত্তিতে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কৃতিত্বের অধিকারী। সেজন্যে তিনি বাঙালি জাতিরাষ্ট্রের জনক তথা জাতির জনক এবং হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের ইতিহাসের নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকগণ মনে করেন, বঙ্গবন্ধু, স্বাধীনতা ও সত্যিকার সার্বভৌম বাংলাদেশ একসূত্রে গাঁথা।
শেখ মুজিবুর রহমান যেভাবে বঙ্গবন্ধু হলেন: ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ১৭-দিনব্যাপী ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর দেশের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার উদ্দেশ্যে ১৯৬৬ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের সকল আইয়ুব-বিরোধী রাজনৈতিক দল লাহোরে এক জাতীয় সম্মেলন আহবান করে। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ঠিক হয় দলের পক্ষ থেকে সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান এবং সাংগঠনিক সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ সম্মেলনে যোগ দেবেন। দলের পক্ষ থেকে কী বক্তব্য সম্মেলনে উপস্থাপন করা হবে সে ব্যাপারে আলাপ-আলোচনার পর ৭-দফা বক্তব্য-বিষয় ঠিক হয় এবং সিএসপি অফিসার রুহুল কুদ্দুসকে সেগুলো মুসাবিদা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু তাজউদ্দীন আহমদ সেটাকে পরিমার্জন করে ৬-দফা সম্বলিত বক্তব্য-বিষয় চূড়ান্ত করেন। ৫ ফেব্রুয়ারি সম্মেলনের আলোচ্যবিষয় নির্ধারণী কমিটির বৈঠকে এই ৬-দফা সম্বলিত বক্তব্য-বিষয় জাতীয় সম্মেলনের মূল অধিবেশনে উপস্থাপনের ব্যাপারে অসম্মতি জানানো হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, পাকিস্তানের আইয়ুব-বিরোধী সকল রাজনৈতিক দলই যে কেবল ৬-দফা কর্মসূচির বিরোধী ছিল তা-ই নয় বরং নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি নবাবজাদা নসরুল্লাহ খান স্বয়ং ছিলেন ৬-দফা কর্মসূচির ঘোর বিরোধী। যা হোক, ৬ ফেব্রুয়ারি সম্মেলনের মূল অধিবেশনে ৬-দফা কর্মসূচি উপস্থাপনের সুযোগ না হলেও শেখ মুজিব ঐদিন পৃথক সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে ৬-দফা কর্মসূচি জন সমক্ষে তুলে ধরেন এবং অতঃপর লাহোর ত্যাগ করেন। এভাবে ৬-দফা কর্মসূচি সর্বপ্রথম জন সমক্ষে প্রচারিত হওয়ার পর সরকারি মহলে তো বটেই, এমনকি সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র এবং রাজনীতিক মহলেও এই ৬-দফা কর্মসূচির যথেচ্ছ সমালোচনা শুরু হয়ে যায়। অনেকেই এটাকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ প্রচেষ্টার নীলনকশা হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি তা বলে হতোদ্যম হননি। ওই বছরেরই ২১ ফেব্রুয়ারি তিনি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় ৬-দফা কর্মসূচি অনুমোদন করিয়ে নেন। এখানে যত সহজভাবে বলা হলো পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় ৬-দফা কর্মসূচি অনুমোদন করিয়ে নেন; বাস্তবে কিন্তু কাজটি মোটেও ততটা সহজ ছিল না। কারণ, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যদের অনেকেই ছিলেন ৬-দফা কর্মসূচির প্রকাশ্য সমালোচক। কাজেই ৬-দফা কর্মসূচি অনুমোদন করিয়ে নেওয়ার জন্যে ওয়ার্কিং কমিটির সভায় উত্থাপন করার মারাত্মক ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তিনি পিছপা হননি এবং ৬-দফা কর্মসূচি অনুমোদন করিয়ে নিতে সমর্থ হন। এবার ৬-দফা কর্মসূচি হলো পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের দলীয় কর্মসূচি। এ পর্যায়েও তৎকালীন পুর্ব পাকিস্তানের আর কোনো রাজনৈতিক দলকে এগিয়ে আসতে দেখা যায়নি। যে মাওলানা ভাসানী ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনিও নন।
৬-দফা কর্মসূচি স্তব্ধ করে দেওয়ার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য সামনে রেখে ১৯৬৬ সালের ৮ মে শেখ মুজিবকে আটক করা হল দেশ রক্ষা আইনে। অতঃপর একে একে আওয়ামী লীগের প্রধান নেতাদেরও আটক করা হলো। শেখ মুজিব ও অন্যান্য নেতাদের মুক্তির দাবিতে ৭ জুন পূর্ব পাকিস্তানের সর্বত্র পালিত হলো সর্বাত্মক ধর্মঘট। শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে আনা হলো দেশদ্রোহের অভিযোগ। দায়ের করা হলো,‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য মামলা’। গণমাধ্যমে যাকে অভিহিত করা হলো, ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ হিসেবে। ১৯৬৮ সালের জুন মাসে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে যখন সে মামলার বিচার শুরু হলো তখনই দানা বাঁধতে শুরু করলো আইয়ুব-বিরোধী দুর্বার গণ-আন্দোলন। ওই আন্দোলনে পুরোভাগে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের দাবি-দাওয়ার সাথে একটু কৌশল করে ৬-দফার মিশেল দিয়ে ১১-দফার ভিত্তিতে রচিত হলো ছাত্রসমাজের আইয়ুব-বিরোধী আন্দোলন। নভেম্বর মাসে সে আন্দোলন বেশ বেগবান হয়ে উঠলো। আর ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে সে আন্দোলন পরিণত হলো অপ্রতিরোধ্য গণ-আন্দোলনে; অবশেষে ২২ ফেব্রুয়ারি ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবসহ সকল বন্দীকে মুক্তি দিতে বাধ্য হলেন আইয়ুব খান। ২৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান অধুনা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবকে দেওয়া হলো গণসংবর্ধনা। সেই সভায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা জনাব তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ অভিধায় অভিষিক্ত করলেন। শেখ মুজিব হলেন ‘বঙ্গবন্ধু’।

03_Bangabandhu+museum_Art+campaign_0022

স্বাধীনতাযুদ্ধ অত্যাসন্ন হলো: আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তি লাভের পর ৬-দফা কর্মসূচি নিয়ে দর কষাকষির যেমন শক্ত ভিত তৈরি হলো তেমনি এর আগে-পরে ছাত্রসমাজের আরো কিছু ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে অনুমোদন দিয়ে বাঙালি জাতীয়বাদী ভাবাদর্শকে সংহত ভিত্তির ওপর স্থাপন করতে সাহায্য করলেন বঙ্গবন্ধু। তার মধ্যে ছিল জাতীয় শ্লোগান ‘জয় বাংলা’, ‘জাতীয় পতাকা’, ‘জাতীয় সঙ্গীত’। আর ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদী বিভিন্ন শ্লোগান যেমন, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’; ‘তুমি কে, আমি কে বাঙালি বাঙালি।’ এই অনুমোদনের কাজটি বঙ্গবন্ধু ঘটনাপ্রবাহের স্বাভাবিক গতিধারায় এমনভাবে করেছেন যে ওসবের জন্যে তাঁকে বিচ্ছিন্নতাবাদের দায়ে দায়ী করার উপায় ছিল না; আবার তিনি যদি ওগুলো অনুমোদন না করতেন তাহলে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনও অমন সংহত হতে পারতো না। বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রাণপুরুষ। বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তাঁকে কেন্দ্র করে। গণ-আন্দোলনের মুখে সেনাপ্রধান ইয়াহিয়ার হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে আইয়ুব খান ২৫ মার্চ, ১৯৬৯ পদত্যাগ করলেন । দেশে পুনরায় জারি হলো সামরিক শাসন। ইয়াহিয়ার উপায় ছিল না আইয়ুবের মতো ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার। তাই বাধ্য হয়ে সামরিক শাসন জারি রেখেই ইয়াহিয়াকে সাধারণ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করতে হলো। সামরিক শাসনের নানান বাধ্যবাধকতার মধ্যে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানি ওই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু আত্মবিশ্বাসে ছিলেন অটল। আওয়ামী লীগ পেল সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন। কিন্তু সামরিক জান্তা নির্বাচিত জনপ্রতিধিদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করতে রাজি হলো না। কাজেই ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু স্পষ্টতই বললেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ মূলত, ৬-দফা কর্মসূচি ঘোষণার মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু পশ্চিম পাকিস্তানের চেপে-বসা শাসকদের এমন ত্রিশঙ্কু অবস্থায় ফেলে দিয়েছিলেন – তারা না-পারছিল ধরতে, না-পারছিল ছাড়তে। অর্থাৎ, সাধারণ নির্বাচন দেওয়ার ইচ্ছে সামরিক জান্তার না থাকলেও নির্বাচন না দিয়েও আর উপায় ছিল না। আর বঙ্গবন্ধু চাইছিলেন সাধারণ নির্বাচনে ৬-দফা কর্মসূচির গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করতে। কেননা কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি যতক্ষণ না কোনো সাধারণ নির্বাচনে জনসমর্থন লাভ করে ততক্ষণ পর্যন্ত সে কর্মসূচি বাস্তবায়নের আইনগত ভিত্তি তৈরি হতে পারে না। কাজেই ’৭০-এর নির্বাচনকে বঙ্গবন্ধু নিয়েছিলেন ৬-দফার জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের গণভোট হিসেবে।

বলা বাহুল্য যে, ৬-দফা কর্মসূচির মূল বক্তব্যই ছিল পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন, প্রকারান্তরে স্বাধীনতা। কিন্তু আইনত, বঙ্গবন্ধুকে বিচ্ছিন্নতাবাদের অভিযোগে অভিযুক্ত করার উপায় ছিল না। এখানেই বঙ্গবন্ধু অনন্য। তিনি চালাচ্ছেন স্বাধীনতা আন্দোলন, অথচ তাঁকে আইনত ধরা যাচ্ছে না। এ-ও ছিল পাকিস্তানি শাসকচক্রের মর্মপীড়ার আরেকটি কারণ। সে জন্যেই দেখা যায়, ২৪ বছরের পাকিস্তানি জমানায় ১৪ বছর বঙ্গবন্ধুকে কারান্তরালে অতিবাহিত করতে হয়েছে। কিন্তু কখনোই তাঁকে বিচার করে সাজা দিতে পারেনি পাকিস্তানি শাসকচক্র। প্রত্যেকবার আটক করেছে, কোনো অভিযোগে সাজা দিতে না পেরে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছে। মানে, কোনো কিছুতেই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে এঁটে উঠতে না পেরে অবশেষে তারা সামরিক বাহিনী নামিয়ে গণহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আর তাতেই সূচিত হলো আমাদের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ।

 

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে বঙ্গবন্ধু: অনেক বিদেশী পর্যবেক্ষকের ধারণা ছিল যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে বিবদমান মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপগুলোর ভেতর রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ শুরু হবে। কারো কারো ধারণা ছিল – ভারতীয় বাহিনী সহসাই বাংলাদেশ ত্যাগ করবে না। তাছাড়া চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ তাদের ইউরোপীয় মিত্র দেশসমূহ এবং মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর বৈরিতার মুখে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের অবকাঠামো পুর্নগঠনে প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক সাহায্যের ক্ষেত্রে দেশটি এমন সংকটে পতিত হবে যে, তিন দিকে ভারত-বেষ্টিত উদ্বৃত্ত জনসংখ্যার দরিদ্র দেশটির স্বাধীন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু সেসব কোনো ধারণাই সত্যি হয়নি। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এলেন ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি। তার পরদিনই জারি করলেন ‘বাংলাদেশ অস্থায়ী সংবিধান আদেশ’। তাতে উল্লেখ ছিল: ১. বাংলাদেশ সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত হবে। ২. ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর ও ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে নির্বাচিত সদস্যদের মধ্যে যারা আইনত অযোগ্য বিবেচিত নন তাঁদের নিয়ে গণপরিষদ গঠিত হবে। ১৭ জানুয়ারি বিভিন্নস্তরের মুক্তিযোদ্ধাদের ১০ দিনের মধ্যে অস্ত্র জমা দেওয়ার আহবান জানালেন বঙ্গবন্ধু। ২৪ জানুয়ারি অস্ত্র জমা দিলেন কাদের সিদ্দিকী টাঙ্গাইলে আর ৩১ জানুয়ারি অস্ত্র জমা দিলেন মুক্তিবাহিনী ঢাকা স্টেডিয়ামে; বলা যায়, বঙ্গবন্ধুর আহবানে সাড়া দিয়ে সারা দেশের অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্র সমর্পন করলেন যথাসময়ে। বিবদমান মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপগুলোর ভেতর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সম্ভাবনা এতে তিরোহিত হলো। অন্যদিকে মার্চ মাসের প্রথমার্ধেই ভারতীয় বাহিনী প্রত্যাহার সম্পন্ন হলো। ২৩ মার্চ জারি করা হলো গণপরিষদ আদেশ। ১০ এপ্রিল বসলো গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন। গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনেই তৎকালীন আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনকে প্রধান করে ৩৪ সদস্যবিশিষ্ট সংবিধান প্রণয়ন সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি গঠিত হলো। ১২ই অক্টোবর শুরু হলো গণপরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশন; সেখানে উপস্থাপন করা হলো খসড়া সংবিধান বিল এবং ৪ নভেম্বর গণপরিষদে সংবিধান গৃহীত হলো। ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর সংবিধান কার্যকর হওয়ার ভেতর দিয়ে সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশে শাসনতান্ত্রিক সংকটের যারা আশঙ্কা করেছিলেন তাদের মুখে ছাই পড়লো। তবে আওয়ামী লীগেরই তরুণ নেতৃবৃন্দের একাংশ ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর জাসদ গঠন করেন এবং তাদের সাথে যোগ দেয় মাওবাদী বামপন্থীগণ। এরা দেশের অভ্যন্তরে সাময়িক একটা হানাহানির অবস্থা তৈরি করেছিল ঠিক; কিন্তু সেটা মোটেও গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি ছিল না। ১৯৭২ সালেই বাংলাদেশ ৯০টি দেশের স্বীকৃতি আদায় করতে সক্ষম হয় এবং ১৯৭৩-এর মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় ১০৮টি দেশ । ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার পূর্ব পর্যন্ত চীন, সৌদি আরব এবং ওমান এই তিনটি দেশ ব্যতীত বিশ্বের সবগুলো স্বাধীন সার্বভৌম দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৭২ সালেই বাংলাদেশ কমনওয়েলথের সদস্যপদ এবং জাতিসংঘের স্থায়ী পর্যবেক্ষকের মর্যাদা লাভ করতে সক্ষম হলেও চীনের আপত্তির মুখে ১৯৭৪ সালের পূর্বে বাংলাদেশ জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্যপদ লাভ করতে পারেনি। কিন্তু ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধুর কূটনৈতিক তৎপরতার কাছে বশ্যতা স্বীকার করে পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হওয়ার পর চীনের আপত্তি হয়ে দাঁড়ায় অর্থহীন; ফলে বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালের ১৭ অক্টোবর জাতিসংঘের স্থায়ী সদস্যপদ লাভ করতে সক্ষম হয়।

একটা নীতি বঙ্গবন্ধু বরাবরই ব্যতিক্রমহীনভাবে মেনেছেন; সেটা হলো, তিনি কখনোই বুলেটে বিশ্বাস করতেন না, বিশ্বাস করতেন ব্যালটে। সে জন্যেই দেখা যায়, ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর সংবিধান কার্যকর হওয়ার সাথে সাথে গণপরিষদ ভেঙ্গে দিয়ে ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ সাধারণ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করতে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যে গঠন করেন পরিকল্পনা কমিশন। গ্রহণ করেন পঞ্চ-বার্ষিকী পরিকল্পনা। পাহাড়-সম বাধা ডিঙ্গিয়ে যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশটা যখন আর্থিক ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার দ্বারপ্রান্তে ঠিক সেইসময় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে নৃশংসতম হত্যাকান্ডের শিকার হলেন বঙ্গবন্ধু সপরিবারে তাঁর এই স্বপ্নের বাংলাদেশে। তারপর চলেছে বঙ্গবন্ধুর বোধ-বুদ্ধি, বিচার-বিবেচনা এবং কর্মকান্ডের নেতিবাচক সমালোচনা। এই সমালোচনার গূঢ় ইঙ্গিত ছিল খুবই অবমাননাকর। মানে পাকিস্তানই ছিল ভাল। বঙ্গবন্ধু ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার কূট-কৌশল হিসেবে পাকিস্তানকে ভেঙ্গে দু টুকরো করেছেন মাত্র। তাতে লাভের লাভ কিছু হয়নি। বিরুদ্ধবাদীদের যদি সামর্থ্য থাকতো তাহলে তারা স্বাধীন বাংলাদেশটাকে পুনরায় পাকিস্তানে ফিরিয়ে নিয়ে যেত। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশকে আর কোনোক্রমেই পাকিস্তানে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার শক্তি-সাহস না থাকায় তারা বঙ্গবন্ধুর ভাবাদর্শ ও অবদান ভুলিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা হিসেবে সেসব বিকৃতআবে উপস্থাপন করেছে তরুণ প্রজন্মের সামনে। যার বিষময় ফলশ্রুতি আমরা নব্বইয়ের দশকে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তখন প্রত্যক্ষ করেছি তরুণ-যুবাদের মধ্যে। একটা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণ-যুবার মনে কোনোরকম দেশপ্রেমের বোধ ছিল না, সুবিধাবাদ জিন্দাবাদ ছিল তাদের জীবনাদর্শ। কোনো দেশের সমগ্র জনগোষ্ঠীর বোধ ও মননে যদি দেশপ্রেম না থাকে সে দেশের জাতীয় উন্নয়ন সুদূরপরাহত। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর একাদিক্রমে ২৮ বছর বাংলাদেশের হয়েছিল সেই অবস্থা। তখন বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের পরিচিতি ছিল হীনবীর্য জাতি হিসেবে। আজ যে আমরা ক্রম- সমৃদ্ধশীল বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে গর্ববোধ করতে পারছি তার কারণ বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা বাংলাদেশকে তাঁর পিতার অভীষ্ট স্বপ্নের পথে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। এ হচ্ছে নিখাঁদ দেশপ্রেমের সাক্ষাৎ ফলশ্রুতি।

02_Aparajeyo+Bangla

উপসংহার: বঙ্গবন্ধুর নিন্দা করা যায়, সমালোচনা করা যায়, তাঁকে ঈর্ষা করা যায় কিন্তু উপেক্ষা বা অবহেলা করার সাধ্য কারো নেই। বঙ্গবন্ধু শুভবোধসম্পন্ন বাঙালির মনে যে স্বপ্নবীজ বুনে দিয়ে গেছেন তাতে শরীরী বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা গেলেও সেই স্বপ্নবীজ যে অনন্ত-অমর। সে তো হত্যার অতীত। তাই তো দেখা যায়, বঙ্গবন্ধুর উত্তরসূরীগণ শত জুলুম-নির্যাতন, অত্যাচার-উৎপীড়ন সহ্য করেও বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠ কখনো ত্যাগ করেননি। দাঁতে দাঁত চেপে সব অত্যাচার সহ্য করে লড়ে গেছেন গণমুক্তি আর গণতন্ত্রের জন্যে; তারই সাক্ষাত প্রমাণ বঙ্গবন্ধু তনয়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গড়া আজকের মধ্যম-আয়ের বাংলাদেশ। এই স্বপ্নযাত্রা অব্যাহত থাকুক।

তথ্যসূত্র:
১। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি — গোলাম মুরশিদ; (প্রথম প্রকাশ-২০০৬, নবম মুদ্রণ-২০১৬); অবসর প্রকাশনা সংস্থা, ঢাকা।
২। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস — অধ্যাপক মাহবুবুল আলম (দ্বাদশ সংস্করণ-২০০৪, পুনমুদ্রণ-২০০৫ ); সালমানী প্রিন্টার্স, ঢাকা।
৩। বাঙালি মুসলমানের মন (১৯৮১); দ্রষ্টব্য: আহমদ ছফা রচনাবলী (১)– নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত; (প্রথম প্রকাশ-২০০৮, চতুর্থ মুদ্রণ-২০১৫); খান ব্রাদার্স এন্ড কোম্পানি, ঢাকা।
৪। Bangladesh Politics: Probmlems and Issues Ñ Rounaq Jahan; (New Expanded Edition-2005) ;The University Press Limited, Dhaka.
৫। অসমাপ্ত আত্মজীবনী — শেখ মুজিবুর রহমান; (প্রথম প্রকাশ-২০১২); দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ঢাকা।
৬। জাসদের উত্থান পতন: অস্থির সময়ের রাজনীতি — মহিউদ্দিন আহমদ; (চতুর্থ সংস্করণ-২০১৫); প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা।
৭। কাছ থেকে দেখা ১৯৭৩-১৯৭৫ — মেজর জেনারেল এম খলিলুর রহমান; (প্রথম প্রকাশ-২০১৬); প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা।
৮। পাক-ভারত যুদ্ধ ১৯৬৫– নূরুল হুদা আবুল মনসুর; দ্রষ্টব্য: অনলাইন বাংলাপিডিয়া (দ্বিতীয় সংস্করণ-২০১২); এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, ঢাকা।
৯। বাংলার ইতিহাস: ঔপনিবেশিক শাসনকাঠামো — প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম: (চতুর্থ চয়নিকা সংস্করণ-২০০৮); চয়নিকা প্রকাশনা সংস্থা, ঢাকা।
১০। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ দুটি নাম একটি ইতিহাস — মাহবুবুল আলম বিপ্লব; (প্রথম প্রকাশ-২০১১, তৃতীয় মুদ্রণ-২০১৫); পার্ল পাবলিকেশন্স, ঢাকা।
১১। বাংলাদেশ ও আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল — ( সম্পা.) নূহ-উল আলম লেনিন; (প্রথম প্রকাশ-২০১৬) ; সময় প্রকাশন, ঢাকা।