ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পরিমাপের অন্যতম মাপকাঠি হচ্ছে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি পরিমাপ করা। জিডিপি হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট বছরে কোনও দেশের সীমানার অভ্যন্তরে কতটুকু পণ্য বা সেবা উৎপাদিত হচ্ছে তার মূল্য। কিন্তু প্রকৃত অর্থে কি জিডিপিতে দেশের মোট উৎপাদন প্রতিফলিত হয়? না, কারণ জিডিপিতে সেই সকল পণ্যের মূল্য হিসাবভুক্ত হয় যেগুলো বাজারে ক্রয়-বিক্রয় হয় বা যার বাজার মূল্য সুনির্দিষ্ট। যেমন, কোনও ফল বা সবজি যা বাজারে পাওয়া যায় তা জিডিপির অন্তর্ভুক্ত কিন্তু যদি কোনও ব্যক্তি শুধুমাত্র নিজের বা নিজের পরিবারের জন্য সেই ফল বা সবজি উৎপাদন করে এবং ভোগ করে তাহলে সেটা জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত হয় না। কারণ সেটা পণ্যের বাজারে অর্থাৎ বাজারের চাহিদা বা যোগানে কোনও প্রভাব ফেলে না। সামগ্রিক দিক থেকে হয়ত এর কোনও প্রভাব নেই কিন্তু ব্যষ্টিক দিক থেকে অবশ্যই এটা প্রভাব ফেলে। কারণ যদি সে উৎপাদন না করত তাহলে অবশ্যই বাজার থেকে কিনত।

জিডিপি নির্ধারণের জন্য প্রধান তিনটি উপায় হল (১) অর্থনীতির সামগ্রিক উৎপাদন মূল্যায়ন করা, (২) মোট ব্যয় নির্ধারণ করা অথবা (৩)মোট আয় নির্ধারণ করা। জিডিপি যেহেতু একটি সামগ্রিক বিষয় তাই এতে শুধুমাত্র বাজারে ক্রয়-বিক্রয় হওয়া পণ্য বা সেবাই অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত না বরং যেসকল পণ্য বা সেবার বাজার মূল্য নেই সেগুলোও অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত। যেসকল পণ্যের বাজারমূল্য নেই সেগুলোর মূল্য নির্ধারণ করা হয় ইম্পিউটেশন বা আরোপণের মাধ্যমে। এক্ষেত্রে যেসকল পণ্যের বাজারমূল্য নেই তাদের সমজাতিও পণ্যের সাথে তুলনা করে মূল্য নির্ধারণ করা হয়। এমন নয় যে জিডিপিতে শুধুমাত্র বাজারে ক্রয়-বিক্রয় হওয়া পণ্যের মূল্যই ধরা হয়। জিডিপির একটি অন্যতম উপাদান হচ্ছে আরোপিত মূল্য। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে যদি জিডিপিতে আরোপিত মূল্য অন্তর্ভুক্ত হবেই তবে সকল প্রকার আরোপিত মূল্য কেন অন্তর্ভুক্ত হবে না? যেমন, কেউ যদি একটি বাড়ি কিনে সেই বাড়িতে বসবাস করতে শুরু করে তাহলে বাড়ি কেনাটাকে একটি বিনিয়োগের মতো ধরা হয় এবং যে সুবিধা ঐ ব্যক্তি বাড়িটি থেকে ভোগ করবে তাকে তার আরোপিত আয় হিসেবে ধরা হবে। কারণ ঐ ব্যক্তি যদি বাড়িটি ভাড়া দিত তাহলে তার যে আয় হত সেই আয়টা সে নিজে ঐ বাড়িতে থেকে ভোগ করছে। আবার, ব্যাংক কিংবা অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে তারা যে অর্থটা তারল্য হিসেবে সংরক্ষণ করে সেটার সুযোগ ব্যয় নির্ধারণ করে। এটাও এক ধরনের আরোপণ। কারণ আপাত দৃষ্টিতে ঐ সংরক্ষিত অর্থের কোনও ব্যয় নেই কিন্তু তারা ঐ অর্থটা ঋণ হিসেবে বিনিয়োগ করলে যে আয় হত সেটা থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে। আর সেই বঞ্চিত আয়টাকেই আমরা বলছি সুযোগ ব্যয়। কিন্তু আমরা মহিলাদের গৃহস্থালী কাজের প্রেক্ষিতে কোনও আরোপিত আয় ধরি না। তারা যদি গৃহস্থালীর কাজ না করে সেই শ্রমটা অন্য কোথাও যেমন কোনও শিল্প-কারখানায় বা অফিসে বা ব্যবসায়ের কাজে নিয়োগ করত তাহলে সেটা থেকে তাদের যে আয় হত সেটা অবশ্যই জিডিপির অন্তর্ভুক্ত হত। এক্ষেত্রে তাদের গৃহস্থালির কাজকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে গ্রহণ করলে তাদের এই কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ আরোপণের মাধ্যমে তাদের আয়টা নির্ধারণ করতে হবে। যেহেতু আমাদের জনসংখ্যার অর্ধেক অংশ মহিলা সেহেতু তাদের আয় যদি জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত হয় তাহলে দেশের মোট আয়ও অনেকাংশে বাড়বে এবং তা জিডিপির প্রবৃদ্ধি তথা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করবে।

এটাতো গেলো আয়ের দিক থেকে জিডিপিতে আরোপিত মূল্যের প্রভাব। এখন দেখা যাক ব্যয়ের দিক থেকে জিডিপিতে এর প্রভাব কী। মহিলারা যদি গৃহস্থালির কাজ না করে তাহলে তাদের এই কাজের জন্য অবশ্যই একজন লোক নিয়োগ করতে হবে এবং বলা বাহুল্য যে তাকে অবশ্যই বেতন দিতে হবে। মহিলাদের কাজের বিনিময়েও তারা পরোক্ষ ভাবে পারিশ্রমিক পায়। যেহেতু তারা এটা অর্থের অঙ্কে পায় না সেহেতু এই ব্যয়টা জিডিপি নির্ধারণে আসে না। কিন্তু যদি তারা একজন লোক নিয়োগ করত তাহলে তার বেতন অবশ্যই জিডিপি নির্ধারণে আসতো। সামগ্রিক দিক থেকে অর্থনীতিতে ততটুকুই ব্যয় বা ভোগ করা হচ্ছে কিন্তু ব্যক্তিগত দিক থেকে যে ব্যয় করছে আর যে ভোগ করছে সে এক ব্যক্তি নয়। সামাজিক রীতির কারণে আমরা এই ব্যয়কে পারিশ্রমিকের নাম দিতে চাই না কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটাও পারিশ্রমিক। সুতরাং এটাও জিডিপির অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত।

এবার সামগ্রিক উৎপাদনের দিক থেকে আরোপিত আয়ের প্রভাব দেখা যাক। প্রথম উদাহরণ থেকেই এর গুরুত্ব বুঝা যায়। একটি দেশে এমন অনেক পণ্য উৎপাদিত হয় যা বাজারে ক্রয়-বিক্রয় হয়না কিন্তু তা ভোগ বা ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ তা ব্যক্তিগত চাহিদা পূরণে যোগানের কাজ করে। আর এধরনের পণ্য সবচেয়ে বেশি পরিমাণে উৎপাদিত হয় গৃহস্থালিতে। এই গৃহে উৎপাদিত পণ্য বা সেবা উৎপাদনের কাজে সবচেয়ে বড় অবদান মহিলাদের। তাদের বাসায় রান্না করা খাবার বা বাসার দেখাশোনা করাও এক ধরনের পণ্য বা সেবা। সুতরাং, এই পণ্য বা সেবাকেও জিডিপির অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।

সবদিক থেকেই জিডিপিতে মহিলাদের এই আরোপিত আয়ের প্রভাব রয়েছে। তাহলে কেনই বা এই আয়কে জিডিপি নির্ধারণে ধরা হবে না? যেহেতু এই আয়ের কোনও নির্দিষ্ট পরিমাপক নেই সেহেতু এই আয় নির্ধারণ করা এবং জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা কষ্টসাধ্য হবে কিন্তু আরোপণের মাধ্যমে কর্মজীবী মহিলাদের আয়ের সাথে তুলনা করে গৃহিণীদের আয় নির্ধারণ করা যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতা অবশ্যই বিবেচনায় আনতে হবে। আশা করি তাদের কর্মের এই মূল্যায়ন ও আয় জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

– ফাতেমা-তুজ-জোহরা, শান্তা দেব, মৌসুমি সাহা,ইমাজ সুলতানা, সাদিয়া শারমিন ঊর্মি, নাসরিন আক্তার, ম্যাক্রোইকোনোমিক্স ল্যাবের সদস্যবৃন্দ, ফিন্যান্স ১৭তম ব্যাচ, ঢাবি।