ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

ছোট বেলায় হুজুরদের মুখে কথায় কথায় উর্দু শুনতাম । তার পর যখন থেকে বুঝতে শুরু করলাম পাকিদের কথা শুনে আমার একটা ধারনা হয়েছিল , পাকিস্থানে ব্যাপক ইসলামের চর্চা হয় ।কট্টরপন্থী ইসলামিক দেশ । কিন্তু যখন বেনঞ্জির ভুট্টো প্রধান মন্ত্রী হলেন বেশ অবাক হয়েছিলাম । কি ভাবে একটি কট্টরপন্থী ইসলামিক দেশে একজন মহিলা প্রধান মন্ত্রী হয় ? ইউরোপ থেকে সুয়েজ পারি দিয়ে সিঙ্গাপুর যাচ্ছিল জাহাজ । একটি মেসেজ আসল অফিস থেকে পাকিস্থান থেকে কিছু কার্গো নিয়ে যেতে হবে । জাহাজে আমরা দুজন বাংলাদেশী , কাপ্তান ইংলিশ বাকিরা ইন্ডিয়ান। আমরা বাংলাদেশীরা খুশী হলেও বাকিরা বেশ বেজার ছিল । এরই মাঝে হেড অফিস থেকে বড় একটা সতর্ক বার্তা এলো । সারাংশ ইন্ডিয়ান কেউ বাইরে যেতে পারবে না , বাকিরা বাইরে গেলেও খুব সাবধান থাকতে হবে । রোজার মাস ।Sunset এর আগে বাইরে কোন খাওয়া দাওয়া করা যাবে না । রোজার মাসে সিলেটে বেড়াতে গিয়েছিলাম । দিনের বেলা আমাদের কাছে বিস্কুট/ফ্রুটস ও কেউ বিক্রি করে নি ।ভাবলাম এরকম কিছুই হবে । তখনও জানতাম না আমাদের জন্য বিস্ময় অপেক্ষা করছে । আমরা দুজন দেশি ভাই একসাথে বের হলাম । কাপ্তান বার বার করে বলে দিলেন সাবধানে চলাচল করার জন্য । Security হিসাবে এজেন্টের একজন আমাদের সাথে দেওয়া হল । করাচী শহরে যেয়ে আমাদের বেশ অবাক হতে হল । কারন রোজার সময় আমাদের দেশে দিনের বেলা সাধারণত পর্দা থাকে খাবার দোকান গুলোতে । কিন্তু ওখানে এর কোন বালাই নেয়।সবাই রাস্তাতে ধুমসে খাচ্ছে । আর মেয়েদের পর্দার কথা নাই বা বললাম ? যাক হাতে বেশী সময় নেই তাই কেনাকাটায় মন দিলাম । যেহেতু আমরা দুজনই বের হয়েছি তাই সবার অনেক অর্ডার আছে । প্রায় প্রতিটি দোকানে দেখলাম কমপক্ষে দুজন মেশিনগান ধারী প্রহরী । আমাদের এজেন্টকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম প্রায়ই হাঙ্গামা হয়, দোকান লুটপাট হয় । তাই সরকারের অনুমুতি নিয়ে এরা প্রাইভেট প্রহরী রাখে । স্বর্ণের দোকান গুলো একেকটা দুর্গ । করাচীতে কম দামে খুব ভাল সার্ট, থ্রিপিছ , বেড কভার পাওয়া যায় । এদের তৈরি লেদার সামগ্রী ইউরপ/আমেরিকাতে অনেক চাহিদা । পাথরের কিছু শো পিছ / দাবা এনেছিলাম। বেশ তাড়াহুড়া করে কেনাকাটা করছি এইসময় জানতে পারলাম জাহাজে লোডিঙ্গ হবে না হরতাল চলছে । দুজন মিলে খেতে বসলাম । খাবারের দিক দিয়ে পাকিরা বেশ শৌখিন । হরেক রকম কাবাব,বিরয়ানী,জিলাপি । হাতে সময় পেয়ে পাকিটাকে বললাম একটু ঘুড়িয়ে দেখাতে । ঘুরতে ঘুরতে জানতে পারলাম আমাদের দেশে যেমন কিছু বিহারী আছে তেমনি ওখানেও কিছু বাঙালি আছে । পাকি সরকার এদের একটি জায়গা দিয়েছে ঠিক যেন বিহারী ক্যাম্প ।এদের প্রায় সবাই লেদার সামগ্রী তৈরিতে অভিজ্ঞ । লেদার জ্যাকেট কিনতে যেয়ে এরকম একজনের সাথে পরিচয় হল ।দিব্যি বাংলা বলছেন । সবাই নাকি বাংলায় কথা বলেন । জিজ্ঞাসা করলাম এভাবে না থেকে দেশে ফিরে জান ? বলল বাপদাদার ভিটা/পেশা ছেরে কিভাবে যাব ? দেশেত কেউ নাই ।বাংলাদেশকে তারা নিজের দেশ মনে করে কিন্তু আসতে চায় না,আবার পাকিদের নাগরিকও তারা হবে না । ওদের প্রধান শ্ত্রু হচ্ছে পাঠানরা । প্রায়ই ওদের সাথে দাঙ্গা হয় । আর ওরা আর্থিক ভাবে খুবই সবল তাই কেউ তাদের নিয়ে বিশেষ ঘাটায় না । সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল আমাদের দেশের টাকা দিয়ে আপনি করাচীতে কেনাকাটা করতে পারবেন ! করাচীর রাস্তাতে একটু পরপর দেখবেন বাংকে বাংকে ভারী অস্ত্র নিয়ে পুলিশ পাহারা দিচ্ছে । বোমাবাজি এখানে খুবই সাধারন ঘটনা । আর এদের জাতি/উপজাতি ভেদাভেদ অনেক । এক প্রদেশের লোকজন আরেক প্রদেশের লোকজনকে সহ্য করে না। আইন বলে কিছু নেই ওখানে। চাইলেই আপনি হতে পারেন একটি আধুনিক আস্ত্রের মালিক । আমাদের জাহাজের অনেকেই Night vision Camera/Sunglass কিনেছে যার গায়ের উপর পাকিস্তান আর্মি /সোভিয়েট আর্মি লেখাছিল । এবং এসব জিনিস কেবল আর্মিরাই ব্যাবহার করে । করাচী বন্দরের খুব কাছেই একটা মার্কেট আছে যেখানে আস্ত্র/ড্রাগস বিক্রি হয় পুলিশের সামনে । আমাদের অনেক বুজুর্গ আছেন যারা এখন পাকিস্তানকে আদর্শ মনে করেন । তাদের প্রতি আমার একটাই অনুরধ একবার ঘুরে আসুন আপনাদের পাকিস্তানে । মুখে ইসলামের কথা বললেও কোথাও দেখিনি তার নমুনা । টানা তিনদিন করাচী শহর বেড়াতে যেয়ে আমার চোখে হানাহানি / ড্রাগে আসক্ত যুব সমাজ / কারনে অকারনে একে অপরের সাথে মারামারি ছাড়া আর কিছুই পড়েনি। জানিনা অন্যান্য শহর গুলোতে কি অবাস্থা । তবে শুনেছি এর চাইতে ভাল নয় ।