ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

আমার ডায়রির এই অংশে আমি কিছু গুরুত্বপূর্ন কথা তুলে ধরতে চাই । আমার জীবনের একটি বড় অধ্যায় হলো মুক্তিযুদ্ধ, যদিও আমি তা ইচ্ছাকৃত ভাবে করিনি । কোনো সৈনিক তার রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিতে পারে না । শেখ মুজিবের বাংলাদেশ আন্দোলনের কারণে আমার মতো অগনিত বিশ্বস্ত সৈনিককে নিজের প্রিয় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিতে হয়েছিলো, যেই রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষা করার শপথ একদিন আমরা নিয়েছিলাম নিজেরই হাতে সেই দেশকে দ্বিখণ্ডিত করতে হলো এটা যে একজন দেশ প্রেমী সৈনিকের জন্য কতটা বেদনাদায়ক তা একজন সৈনিকই বুঝতে পারে ।

আওয়ামী লীগের বাঙালি বাদী আন্দোলন শুরু থেকেই আমার পছন্দ ছিলো না । শুধু আমি নই কোনো রাষ্ট্রীয় কর্মচারী রাষ্ট্র বিরোধী কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দিতে পারে না । এই কারণেই ৭৫-এর পর আমি যখন একটি রাজনৈতিক দল গড়ার আহবান জানাই তখন আমার ডাকে যারা সাড়া দেয় তাদের একটা বড় অংশ ১৯৭০ পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কর্মচারী ছিল যারা মনে প্রাণে পাকিস্তানের পক্ষে ছিল কিন্তু পরিস্থিতি তাদেরকে বাংলাদেশের তথা আওয়ামী লীগের পক্ষে কাজ করতে বাধ্য করেছিল ।

আপনারা জানেন আওয়ামী লীগের বাঙালিবাদী আন্দোলনের ফলে অবাঙালিরা বাঙালিদের ওপর অবিশ্বাস করতে শুরু করে যার প্রভাব সরাসরি বাঙালি সৈনিকদের ওপর পড়ে । আমরা বিশ্বস্ত সৈনিক হওয়া সত্বেও পশ্চিম পাকিস্তানিরা আমাদেরকে নিরস্ত্র করে বন্দি করতে শুরু করে এবং আমাদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালাতে শুরু করে এমতাবস্থায় হাতে অস্ত্র তুলে নেয়া ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো বিকল্প পথ ছিল না ।

শেখ মুজিবের বাঙালিবাদী আন্দোলনের ফলে জাতিগত দাঙ্গা শুরু হয়, যার প্রভাব সর্ব প্রথম আমাদের মতো সৈনিকদের ওপর পড়ে; বিশেষ করে আর্মি, ইপিআর ও পুলিশের ওপর । মুজিব যদি সেদিন বাঙালিবাদী আন্দোলন না করতো তাহলে আমাদেরকে এরকম বিপদে পড়তে হতো না । পাকিস্তানিদের নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে তখন আমি আমার নিজের (পাক সেনা) বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামি, এছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না ।

ইসলামী দল গুলোকে পাক সরকার বিশ্বাস করতো তাই তাঁরা ৭১-এ পাকিস্তানের পক্ষে থাকতে পেরেছে । আমি যখন আওয়ামী লীগের ব্যানারে যুদ্ধে নামি তখন ইসলামী দল গুলোর সাথে আমার দূরত্ব শুরু হয় । পরে আমি ইসলামী দলগুলোকে বোঝাতে সমর্থ হই যে আমি আসলে জাতিগত হিংসার হাত থেকে বাঁচতে যুদ্ধ করেছি । ঐ সময় আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের এক মাত্র প্রতিনিধি ছিল তাই আওয়ামী লীগের আশ্রয় আমাকে নিতে হয়েছিল ।

৯৫% মানুষ তখন আওয়ামী লীগের সমর্থক ছিল অতএব, লীগের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার সাহস তথা সুযোগ কারো ছিল না । তখন আওয়ামী লীগের পক্ষে থাকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ ছিল, তাই আমি আ’লীগের পক্ষে কাজ করেছি । কিন্তু আ’লীগের সাথে আমার আদর্শগত কোনো মিল ছিল না, তাই যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর আমি আগের মতো পুনরায় আ’লীগ তথা মুজিবের বিরুদ্ধে অবস্থান নিই এবং আমি রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর বাংলাদেশকে পাকিস্তানের মতো একটি ইসলামী রাষ্ট্রের রূপ দিতে সক্ষম হই । মুজিব বেঁচে থাকলে এটা কখনো সম্ভব হতো না ।

মুজিবের স্বাধীনতা আন্দোলনের আদর্শ এবং মুক্তি যুদ্ধের চেতনার প্রতি আমি কখনো শ্রদ্ধাশীল ছিলাম না এবং এখনও নই । কারণ, আমি ছিলাম পাকিস্তানের সৈনিক, পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষা করার শপথ নিয়েছিলাম যেই কারণে বাঙালিদের স্বাধীনতাকে আমি ভালো চোখে দেখিনি । এই কারনে আমার রাজনৈতিক আদর্শের সাথে মুক্তি যুদ্ধ বা তথাকথিত স্বাধীনতা আন্দোলনের আদর্শের কোনো মিল নেই ।

আমি আমার প্রিয় দেশ পাকিস্তানকে এখনো আগের মতোই শ্রদ্ধার চোখে দেখি আর মুজিব ও আওয়ামী লীগকে ঘৃণার চোখে দেখি । শুধু আমি না আমার দলের সকল সমর্থকদেরকেও আমি আমার আদর্শে আদর্শিত করেছি এই কারণে বিএনপির সকল সমর্থকরা আ’লীগ, মুজিব ও স্বাধীনতা আন্দোলনের চেতনা তথা আদর্শকে ঘৃণা করে । আমি একাত্তরের যুদ্ধকে মুক্তিযুদ্ধ মনে করি না । আসলে ওটা ছিল গৃহযুদ্ধ, যেই গৃহ যুদ্ধের নায়ক ছিল শেখ মুজিব । তাই শেখ মুজিবকে যাতে কেউ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ না করে সেই ব্যবস্থাই আমি করবো । যারা আমাকে ভালোবাসবে তাঁরা কখনই তথা কথিত মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গর্ব করবে না।