ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

পুলিশের দুর্নীতি সারা পৃথিবীতে একটি আলোচিত বিষয়। উৎপত্তির আদিকাল থেকেই পুলিশ বিভাগে দুর্নীতি যেন অপরিহার্য বাস্তবতা হিসেবে রয়ে গেছে। পুলিশের দায়িত্ব পালনের ধরণ ও পরিবেশ, কর্ম পরিধি ও বিস্তৃতি এবং আইনগত ক্ষমতার মধ্যে রয়ে গেছে দুর্নীতির সীমাহীন সুযোগ। কিন্তু দুর্নীতি পুলিশের মতো একটি অপরিহার্য ও বিকল্পহীন জন সংগঠনের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

কোন পুলিশ কর্মকর্তা কর্তৃক তার উপর আইনানুগ ভাবে অর্পিত ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের অপব্যবহার করে নিজের কিংবা অপরের স্বার্থ উদ্ধার করাই হল দুর্নীতি। দুর্নীতি হচ্ছে একটি ফৌজদারী অপরাধ। পুলিশের সৃষ্টিই হয়েছিল ফৌজদারী অপরাধ প্রতিরোধ করা ও সংঘটিত অপরাধ তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিদের বিচারের সম্মুখীন করা। কিন্তু এই পুলিশই যখন দুর্নীতির মতো ফৌজদারী অপরাধে জড়িয়ে পড়ে তখন গোটা ফৌজদারী ব্যবস্থাকেই অবদমিত করা হয়। কারণ দুর্নীতি অপরাধীদের প্রশ্রয় দেয়। অন্যদিকে পুলিশ যখন অপরাধীদের আদালতে সোপর্দ করে তাদের বিচার বা শাস্তি দাবী করে তখন বিচারকগণ পুলিশকে বিশ্বাস করে না। আমাদের সাক্ষ্য আইন-১৮৭৮ এর ২৫ ধারার বিধান মূলতঃ পুলিশ অফিসারদের প্রতি আদালতের অবিশ্বাস থেকেই উদভূত। আদালতের মতে দুর্নীতি ও নির্যাতনে নিমজ্জিত পুলিশ অফিসারের নিকট প্রদত্ব আসামীর সাক্ষ্য আদালতে গ্রহণ যোগ্য নয়। এমন কি তদন্তকারী কর্মকর্তা, মামলা রুজু কারী কর্মকর্তা কিংবা সাধারণ সাক্ষ্যি হিসেবেও পুলিশ অফিসারদের বিশ্বাস করতে আদালতের বিবেকে বাঁধে।

দুর্নীতি পুলিশের পেশাদারিত্বকে ধ্বংস করে। দুর্নীতির মাধ্যমে স্বীকারোক্তি আদায়, লোভনীয় স্থানে পোস্টিং প্রদান বা গ্রহণ, পদোন্নতী ইত্যাদি পুলিশ অফিসারদের পেশাদারী মনভাবকে নষ্ট করে দেয়। অধিকনন্তু, দুর্নীতি হল সেবা প্রত্যাশী জন সাধারণের উপর পুলিশ কর্তৃক আরোপিত অলিখিত প্রত্যক্ষ কর। পুলিশের বেতন-ভাতা,রেশন সামগ্রী, বাড়ী-গাড়ি ও অন্যান্য লজিস্টিক সুবিধা সমূহ জনগণের ট্যাক্সের অর্থে সরবরাহ করা হয়। এই অর্থ জনগণের কাছ থেকে সংগ্রহের জন্য আলাদা বিভাগ রয়েছে। পুলিশের কাছ থেকে নিরাপত্তা বা আইনী সহায়তা পাওয়ার জন্য পৃথিবীর কোন দেশেই জনগণ সরাসরি পুলিশকে কোন ফি বা কর দেন না। কিন্তু দুর্নীতির ফলে জনগণ সরা সরি দুর্নীতিবাজ পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে কষ্টার্জিত অর্থ প্রদান করেন।

পুলিশ বিভাগে দুর্নীতির পিছনে বিশেষ কিছু কারণ জড়িতে আছে। সাধারণভাবে স্বল্প বেতন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি,সামাজিক অসুস্থ প্রতিযোগিতা,অল্প সময়ে প্রাচুর্য লাভের আকাঙ্খা,সামাজিক অবস্থান রক্ষা ইত্যাদি কারণকে কোন সরকারী কর্মচারীর দুর্নীতির কারণ বলে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু পুলিশ বিভাগের দুর্নীতির পিছনে এই সব প্রচলিত কারণের বাইরেও অনেক কারণ রয়েছে যা সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে সাধারণভাবে আসে না। কমিউনিটি পুলিশিং পুলিশ বিভাগের সেই সব কারণের গোড়ায় আঘাত হানে। পুলিশ বিভাগের দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কমিউনিটি পুলিশিং নিম্নলিখিত ভাবে সহায়তা করে।

জবাবদিহিতা নিশ্চত করাঃ
জবাবদিহিতা হল কোন বিভাগের কৃত কর্ম,আয়-ব্যয় ইত্যাদি অন্য কোন বিভাগ বা অন্য শ্রেণীর কর্মকর্তার কাছে তুলে ধরা। কোন সরকারী প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতির পিছনে বড় কারণ হল তার জবাবদিহিতার অভাব। সাধারণভাবে কোন প্রতিষ্ঠান যার কাছে বা যে বিভাগের কাছে জবাবদিহি করে সেই প্রতিষ্ঠান বা সেই প্রকার কর্মকর্তারা নিজেরাও দুর্নীতির সাথে জড়িত। যেমন,সরকারী অর্থ ব্যয়ের পদ্ধতি, প্রাপ্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় অর্থ নির্ধারিত উপায়ে পরিশোধ না করা ইত্যাদির জন্য সরকারের অডিট বিভাগ রয়েছে। কিন্তু অডিট বিভাগ নিজেও দুর্নীতির উদ্বের্ধ নয়। পুলিশকে জবাবদিহি করতে হয় নির্ধারিত সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে,সরকারের কাছে এবং আদালতের কাছে। কিন্তু পৃথিবীর কোন দেশেই এই সব বিষয় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পুরোপুরি সফল হয় না। অধিকন্তু, এই সব উপায়ে জবাবদিহিতা করার বিষয়টি আমলাতান্ত্রিক নিয়ম-নীতির উপর মাত্রাতিরিক্তভাবে নির্ভরশীল। মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে দুর্নীতি আশ্রয় নিয়ে কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোন তদন্তকারী পুলিশ অফিসার অভিযোগ পত্র দাখিল করলে কিংবা সত্য ঘটনায় আসামীদের পক্ষে প্রতিবেদন দাখিল করলে তদন্তকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে,আদালত কর্তৃক সেই তদন্তকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ আসতে পারে। কিন্তু এই ব্যবস্থা গ্রহণের অনেক আগেই ভূক্তভোগিরা নিঃস্ব হয়ে যায়। কিন্তু কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থার মাধ্যমে তদন্তকারী কর্মকর্তা বা আসামীদের অভিসন্ধি শুরুতেই ধরা পড়ে। কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামে স্থানীয় সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়। কোন তদন্তাধীন মামলা নিয়ে ফোরামে আলাপ-আলোচনা হতে পারে। একই ভাবে কোন এলাকার অপরাধ সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পণা প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের প্রত্যক্ষ অংশ গ্রহণ থাকে। কোন প্রকল্প বাস্তবায়নের পূর্বে স্থানীয় জনগণের মতামত নেয়া হয়;তারা তা বাস্তবায়নে সহযোগিতাও করে । তাই পুলিশ বাস্তবায়নের অযোগ্য কোন প্রকল্প যেমন গ্রহণ করবে না তেমনি কোন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিফলও হবে না। একমাত্র কমিউনিটি পুলিশিং ছাড়া সাধারণ জনগণের কাছে সরাসরি জবাবদিহি করার কোন কার্যকর পদ্ধতি নেই।

স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাঃ কর্ম বা দায়িত্ব পালনে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া কোন সরকারী প্রতিষ্ঠানকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে তোলে। পুলিশের দায়িত্বের অনেক বিষয় আছে যার অস্বচ্ছতা আইনগতভাবে স্বীকৃত। যেমন,কোন অভিযান চালানোর পূর্বে গ্রহণকৃত পরিকল্পণা জনসম্মুখে প্রকাশ করার বিধান নেই। গোয়েন্দাত তথ্য সংগ্রহ ও বিতরণের ক্ষেত্রে পুলিশ আইগত ভাবেই গোপনীয়তারব্ণা করতে পারে। কিন্তু এই জাতীয় বিশেষ কিছু বিষয় ছাড়া পুলিশের অন্যান্য বিষয় জনসম্মুখে প্রকাশ করতে কোন বাধা নেই। কিন্তু বাস্তব সত্য হল পুলিশের কাজের অনেক বিষয়ই জনগণের অগোচরে থেকে যায়। আসামী গ্রেফতার ও তাদের হেফাজত, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ, তল্লাশী কার্য পরিচালনা ইত্যাদি অনেক পুলিশি কর্মে জনগণের অংশ গ্রহণ ও তদারকী প্রয়োজন। কিন্তু প্রচলিত পুলিশ সংস্কৃতিতে এই সব কাজে জনগণের অংশ গ্রহণের সুযোগ দেয়া হয় না কিংবা যেখানে সুযোগ দেয়া হয় তা হয় মূলতঃ দায়সারা গোছের। কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা চালু হলে অপরাধ দমন,অপরাধের কারণ দূরীকরন তথা সমস্যা সমাধানের মতো এই সব কাজেও জনগণের সম্পৃক্ততা থাকবে। যেমন,পুলিশ হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের প্রাপ্য সুবিধাদি প্রদান কিংবা মানবাধিকার রক্ষা করা হচ্ছে কি না কমিউনিটি পুলিশিং এর আওতায় বেসরকারী কমিটি তা পর্যবেক্ষণ করার বিধান অনেক দেশেই প্রচলন করা হয়েছে। এর ফলে হেফাজতে রাখা ব্যক্তিকে পুলিশ ইচ্ছে করলেই নির্যাতন করতে পারে না। কমিউনিটির সদস্যরা বিশেষ কমিটির মাধ্যমে একত্রিত হলে পুলিশ কোন বাসা-বাড়ি বা প্রতিষ্ঠানে হয়রানী মূলক তল্লাশী চালাতে পারবে। অন্যদিকে পুলিশ কর্তৃক গৃহীত পরিকল্পণা বাস্তবায়নে সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণ থাকলে বাস্তবায়নকারীগণ কোন আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতির আশ্রয় নিতে পারবে না।

কমিউনিটি পুলিশিং ফোরাম (সিপিএফ) কার্যক্রমঃ কমিউনিটি পুলিশিং দর্শন বাস্তবায়নের জন্য বাস্তব কর্মকৌশলের অংশ হিসেবে কমিউনিটি পুলিশিং ফোরাম বা কমিটি গঠন করা হয়। এই সব কমিটি কাজ বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। কিন্তু,পুলিশের কাজের জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা ও মানবিকতা নিশ্চিত করা তাদের কাজের অন্যতম। অনেক দেশের সিপিএফ সমূহ(যেমন,দক্ষিণ আফ্রিকা) পুলিশ অফিসারদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের যে কোন অভিযোগ( দুর্নীতি সহ) গ্রহণ করতে পারে। এই সব অভিযোগের বিরুদ্ধে স্থানীয় তদন্ত পরিচালনা করতে পারে এবং কোন দুর্নীতির প্রতিকার বা তদন্ত পরিচালনার জন্য উর্দ্ধতন পুলিশ কর্মকর্তাদের অনুরোধ করতে পারবে।

সাধারণ জনগণের তত্ত্বাবধানঃ পুলিশ একটি পিরামিড আকৃতির বেসামরিক সংগঠন। বাস্তব কারণেই নিম্ম থেকে উপরের দিকে অফিসারের সংখ্যা দ্রুত কমতে থাকে। বাংলাদেশ পুলিশের ১,২৩,০০০ সদস্যের মধ্যে তত্ত্বাবধানকারী কর্মকর্তার সংখ্যা ১,৫৯০ জন। এই বিপুল সংখ্যক অধীনস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়-দায়িত্ব ও কর্মকাণ্ডের সঠিক তত্ত্বাবধান করা এই সামান্য সংখ্যক অফিসারের পক্ষে সম্ভব হয় না। এমনকি লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করতে গিয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি সিনিয়র অফিসারদের দ্বারা জুনিয়র অফিসারদের সঠিকভাবে তত্ত্বাবধান করা হয় না বলে প্রশ্ন তুলেছিল। অন্য দিকে পুলিশের কর্মকাণ্ডের বিরাট অংশ সিনিয়র বা তত্ত্বাবধান করী অফিসারদের অগোচরে হয়ে থাকে। যেমন,গভীর রাতে শহুরে রাস্তায় টহল দানের জন্য এক হাবিলদার ও দুই কনস্টেবল নিয়ে ছোট ছোট টিম গঠিত হয়। বিশাল এলায় টহল দানে ক্ষেত্রে এই টিম সমূহ অনেকটাই স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। কিন্তু কমিউনিটি পুলিশিং এর মাধ্যমে জনসচেতনতা সৃষ্টি হলে অধস্তন পুলিশ অফিসারদের সকল কর্মের প্রতি জনগন তিক্ষ্ণ নজর রাখবে। কোন অন্যায়,অনিয়ম,বা দুর্নীতির ঘটনা ঘটলে জনগণ নিজেই তা প্রতিরোধ করতে পারবে কিংবা উর্দ্ধতন পুলিশ অফিসারদের কাছে তা জানাতে পারবে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে মাঠ পর্যায়ে পুলিশ অফিসারদের সকল কর্মকাণ্ডে যেমন রাত্রিকালিন পাহারা,তল্লাসী ইত্যাদি কাজে কমিউনিটি সদস্যগণ নিজেরাও অংশগ্রহণ করে পুলিশ অফিসারদের দুর্নীতির সুযোগ কমিয়ে দিবে।

পুলিশের সীমাবদ্ধতা দূরীকরণে জনগণ এগিয়ে আসবেঃ
পুলিশের দুর্নীতির পিছনে বড় কারণ হল তাদের আইনগত, জন সম্পৃক্ততা, জনবল, অর্থবল, অবকাঠামো, গাড়ি-ঘোড়া, জ্বালানী তেল ও অন্যান্য লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা। কিন্তু এই সব সীমবদ্ধতা সম্পর্কে সাধারণ মানুষ খুব কমই ওয়াকিফহাল। কোন ঘটনা ঘটার সাথে সাথে জনগণ ঘটনাস্থলে পুলিশের উপস্থিতি কামনা করে। কোন ডাকাতীর ঘটনার পরপরই জনগণ চোরাই মাল উদ্ধার ও ডাকাতদের গ্রেফতারের প্রত্যাশা করে। কিন্তু হাজারো সীমাবদ্ধতার জন্য পুলিশ জনগণের প্রত্যাশা মতো কাজ করতে পারে না। অনেক সময় জনগণের প্রত্যাশা পূরণ বা নিজেদের কর্মদক্ষতা প্রমাণের জন্য পুলিশ এই সব কাজে দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে থাকে। যেমন,ডাকাতীর ঘটনার পরপরই ঘটনার সাথে সম্পর্কহীন নিরীহ মানুষকে গ্রেফতার করে ডাকাত হিসেবে চালান দেয়। কমিউনিটি পুলিশিং চালু হলে জনগণ পুলিশের সীমাবদ্ধতার কথা জানতে পারবে যা পুলিশের প্রতি অতি প্রত্যাশার মাত্রা কমিয়ে আনবে এবং অনেক ক্ষেত্রে এই সব সীমাবদ্ধতা দূর করার জন্য নিজেরাই এগিয়ে আসবে।

উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের সাথে সরাসরি যোগাযোগঃ
কমিউনিটি পুলিশিং জনগণের সাথে দ্বিমুখী যোগাযোগ স্থাপন করে। কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের মাধ্যমে সাধারণ জনগণ পুলিশের নিম্নতম পদবীর সদস্য থেকে শুরু করে উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের সাথে পরিচিত হবে। একে অপরের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে জনগণের সাথে উদ্ধতন কর্মকর্তাদের নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হবে । এর ফলে পুলিশের অধঃস্তন কর্মকর্তাদের দুর্নীতি,ক্ষমতার অপব্যবহার,দায়িত্ব পালনে অবহেলা ইত্যাদি বিষয় সাধারণ জনগণ সরাসরি উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের নজরে নিয়ে আসতে পারবে।

পুলিশের ক্ষমতা সংকীর্ণ স্বার্থে ব্যবহার নিরুৎসহিত হবেঃ

পুলিশের বৈধ ক্ষমতাকে অবৈধভাবে ব্যক্তিগত সংকীর্ণ স্বার্থে ব্যবহার পুলিশ দুর্নীতির অন্যতম উৎস ও হাতিয়ার। এক শ্রেণীর মানুষ তাদের নিজেদের স্বার্থে পুলিশকে ব্যবহার করে ফায়দা লুটতে তৎপর থাকে। অন্যদিকে এক শ্রেণীর পুলিশ অফিসারও সরকারী ও আইনী ক্ষমতার অপব্যহারে উৎসাহিত। কিন্তু কমিউনিটি পুলিশিং চালু হলে মানুষ পুলিশের প্রকৃত ক্ষমতা ও তা ব্যবহারের নিয়মাবলী,সীমাব্ধতা ও জবাবদিহিতা সম্পর্কে জানতে পারবে। এর ফলে তারা পুলিশকে কারো দলীয় বা ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহৃত হতে দিবে না এবং তারা নিজেরাও তা করতে সংকোচ বোধ করবে।

ওপেন হাউজ ডে কার্যক্রমঃ
কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমের একটি উল্লেখ যোগ্য কর্মকৌশল হল থানা বা পুলিশের মাঠ পর্যায়ের সেবাদানকারী ইউনিট গুলোর ব্যবস্থাপনায় ওপেন হাউজ ডে অনুষ্ঠান করা। প্রতি মাসে এক বার কোন নির্দিষ্ট দিনে থানায় উন্মুক্ত আলোচনার আয়োজন করা হয়। থানা এলাকার বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ সেই দিন থানায় এসে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও পুলিশ প্রশাসনের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের কাছে তাদের সুবিধা-অসুবিধা,লাঞ্ছনা-বঞ্চনার কাহিনী বর্ণনা করে সে সবের প্রতিকার দাবী করতে পারে। ওপেন হাউজ ডে তে থানায় সাধারণত পুলিশ সুপার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও অন্যান্য উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকেন। এখানে পুলিশ বিভাগের বাইরেও অন্যান্য সরকারী প্রতিষ্ঠান গুলোর বড় কর্তারা উপস্থিত থাকেন। পুলিশ অফিসারগণ ওপেন হাউজ ডে এর মাধ্যমে থানার সরকারী-বেসরকারী সেবাদানকারী সকল প্রতিষ্ঠান গুলোকে একই মঞ্চে নিয়ে আসেন। তাই ওপেন হাউজ ডে তে যোগদান কারী নাগরিকগণ কেবল পুলিশ বিভাগই নয়,বরং সকল সরকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ সমূহ সরাসরি উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের কাছে জানাতে পারে। এই সব প্রতিষ্ঠানের সেবার মান উন্নয়নের জন্য তারা প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দানের আশ্বাস দিতে পারে।

মোট কথা কমিউনিটি পুলিশিং পুলিশ বিভাগকে তথাকথিত গোপনীয়তার নীতি থেকে মুক্ত করে সাধারণ মানুষের দোর গোড়ায় নিয়ে আসে। যৌথ অংশিদারিত্ব প্রতিষ্ঠার অনুশীলন করতে গিয়ে পুলিশকে কমিউনিটি সদস্যদের কাছে তাদের ক্ষমতা,দায়িত্ব ও বাধ্যবধকতা গুলোকেও ভাগা-ভাগি করে নিতে হয়। এর ফলে দুর্নীতি রূপী প্যান্ডোরার বাক্সটি পুলিশ আর গোপনে রাখতে পারে না। মানুষ এর ভিতরের সব কিছু জেনে ফেলে। যেহেতু পুলিশের কাছ থেকে জনগণকে সবচেয়ে জরুরী ও বিকল্পহীন সেবাটুকু আদায় করতে হয় তাই জনগণ নিজ উদ্যোগেই পুলিশকে প্রত্যাশিত সেবাদানের জন্য তৈরী করে নিবে কিংবা সেবা প্রাপ্তির পিছনের কারণগুলো দূর করার জন্য তারা নিজেরাই এগিয়ে আসবে।

রচনা সূত্রঃ
1. পুলিশ করাপশন: এ পার্‌সপেক্টিভ অন ইটস নেচার এন্ড কন্ট্রোল- হারমান গোল্ডস্টাইন
2. দি পুলিশ ইন আমেরিকা: এন ইনট্রডাকশন বাই স্যামুয়েল ওয়াকার ও চার্লস এম. কার্টজ