ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

আয়েসী পাঠ-সংক্ষেপঃ

সৃষ্টির আদিকাল থেকেই সমাজে কোন না কোন প্রকারের পুলিশ-ব্যবস্থার অস্তিত্ব ছিল। গ্রীক ভাষার মূল শব্দটি ক্রমান্বয়ে লেটিন ও ফরাসী ভাষা হয়ে ইংরেজি ভাষায় প্রবেশ করে পুলিশ নাম গ্রহণ করেছে। বেসামরিক সংগঠন হিসেবে পুলিশের যাত্রা ফ্রান্সে হলেও ব্রিটেনের রবার্ট পীলের পুলিশ-ব্যবস্থা বিশ্বব্যাপী স্থান করে নিয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশ ব্রিটিশ সরকারের ঔপনিবেশিক কাঠামো থেকেই নিঃসৃত হয়েছে। ব্রিটিশদের মূল ভূ-খণ্ডের পুলিশ জনগণ কর্তৃক সমাদৃত হলেও তাদেরই তৈরি ভারতীয় পুলিশ জনগণের কাছে অদক্ষ, দুর্নীতিবাজ ও অত্যাচারী সংগঠন হিসেবেই পরিচিত। ব্রিটিশ ভারতীয় পুলিশের উত্তরাধিকার বাংলাদেশ পুলিশ স্বাভাবিক কারণেই জনগণের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয় নাই।

পৃথিবীর অন্যান্য দেশের পুলিশের মতো বাংলাদেশ পুলিশও প্রতিনিয়ত জনগণের আলোচনা-সমালোচনার বস্তুতে পরিণত হয়। কিন্তু অন্যান্য দেশের পুলিশের ইতি-নেতি উভয়বিধ প্রতিমূর্তি থাকলেও বাংলাদেশ পুলিশের ভাবমূর্তি বরাবরই নেতিবাচক। অন্যদিকে, এ কথাও ঠিক যে পুলিশ নিয়ে অসন্তুষ্ট হলেও মানুষ পুলিশ ছাড়া চলতে পারে না। তাই বাংলাদেশীদের কাছে পুলিশের উপস্থিতি ও অনুপস্থিতি উভয় অবস্থাই অস্বস্থিকর। আলোচ্য নিবন্ধে এই পরস্পর বিরোধী অবসস্থার স্বরূপ উন্মোচনের চেষ্টা করা হয়েছে। মূল প্রবন্ধটির শব্দ সংখ্যা ছয় হাজারের মতো। প্রথম পর্বে ইতিহাস পর্যালোচনা করা হয়েছে।

মূল প্রবন্ধ

ইতিহাস পর্যালোচনা
পৃথিবীর ইতিহাসে সম্ভবতঃ পুলিশবিহীন সমাজ বা রাষ্ট্রের কোন অস্তিত্ব নেই। সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ নিবারণ, সংঘঠিত অপরাধের তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে বিচারের সম্মুখিন করা এবং এই সব দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে সমাজকে একটি নির্দিষ্ট ও স্বীকৃত মূল্যবোধের মধ্যে ধরে রাখার জন্য সৃষ্টির আদিকাল থেকেই পৃথিবীতে কোন না কোন প্রকারের পুলিশ-ব্যবস্থার অস্তিত্ব ছিল। তবে সেই কালের পুলিশ-ব্যবস্থার সাথে বর্তমানের পুলিশ-ব্যবস্থার বিস্তর পার্থক্য রয়েছে।

‘পুলিশ বিভাগ’ বা ‘বাহিনী’ বলতে কোন রাষ্ট্রের সেই বেসামরিক বাহিনীকে বোঝায় যারা রাষ্ট্রের জন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য দায়বদ্ধ। পুলিশের প্রাথমিক দায়িত্ব আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা ও অপরাধ নিবারণ ও নিয়ন্ত্রণ করা হলেও সমাজের প্রায় সকল জরুরী কাজেই পুলিশের কোন না কোন ভাবে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ ও তাগিদ রয়েছে। জন-শৃঙ্খলা বা শান্তি রক্ষার কাজটির পরিধি ব্যাপক বলেই পুলিশকে কোন নির্দিষ্ট কয়েকটি দায়িত্বে সীমাবদ্ধ করা সম্ভব হয় না।

‘পুলিশ’ শব্দটি ইংরেজী ভাষায় এসেছে ফরাসী ভাষা থেকে। কিন্তু এর মূল নিহিত আছে প্রাচীন গ্রীক ভাষায়। প্রাচীন গ্রীক ভাষায় ‘পুলিশ’ (polis) শব্দটি বর্তমানের ‘পুলিশ’ শব্দের অর্থ থেকে অনেকটাই ভিন্ন অর্থ নির্দেশ করে। গ্রীক ‘পুলিশ’ শব্দের অর্থ, শহর। গ্রীক ভাষার ‘পুলিশ’ শব্দটি ল্যাটিন ভাষায় এসে ‘পলিটিয়া’ (politia) রূপ নেয় যার অর্থ হল, ‘বেসামরিক প্রশাসন’ (Civil Administration)| ফ্রান্সে একটি বেসামরিক সংগঠন হিসেবে পুলিশ ব্যবস্থার প্রচলন হয় ১৬৬৭ সালে সম্রাট চতুর্দশ লুইয়ের শাসন আমলে। এর পর লন্ডনে ১৮০০ সালে মেরিন পুলিশ প্রতিষ্ঠা করা হয়। কিন্তু পুলিশ-ব্যবস্থার সর্বাধুনিক রূপের কারিগর হলেন বৃটেনের এক কালীন স্বরাষ্ট্র সচিব ও প্রধান মন্ত্রী স্যার রবার্ট পীল। ১৮২৯ সালে লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পীল যে পুলিশ-ব্যবস্থা চালু করেন সামান্য কিছু পরিবর্তন ছাড়া পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই মূলতঃ সেই ব্যবস্থায় পুলিশ পরিচালিত হচ্ছে।

তৎকালীন ঔপনিবেশিক ভারতে ব্রিটিশরা যে পুলিশ-ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল বাংলাদেশ পুলিশ তারই উত্তরাধিকার বহন করছে। এই পুলিশ ব্যবস্থা ১৮৬১ সালের ইন্ডিয়ান পুলিশ আইনের উপর প্রতিষ্ঠিত। তবে লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের কাঠামো আর আমাদের ব্রিটিশ ভারত পুলিশের কাঠামোর মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। এমনকি ভারতের পুলিশ কাঠামো বৃটেনের অন্যান্য উপনিবেশগুলোর পুলিশি কাঠামো থেকেও বহুলাংশে পৃথক। উদাহরণ স্বরূপ, উত্তর আয়ারল্যান্ডের আইরিশ কনস্টেবুলারির আদলে গঠন ও পরিচালনার নীতি থাকলেও ব্রিটিশদের জন্ম দেওয়া বঙ্গ-ভারতের পুলিশ আয়ারল্যান্ডের পুলিশের মতোও কখন হতে পারেনি।

ভারতীয় পুলিশকে ব্রিটিশরা সব সময় তাদের খাজনা আদায়ের সহায়ক একটি সংগঠিত বাহিনী হিসেবেই দেখতে চেয়েছিল। এই জন্য তাদের সংগঠন, নেতৃত্ব, নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসন সব কিছুই এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে এই বাহিনীর সদস্যদের কোন স্বাধীন চিন্তা না থাকে এবং তাদের মধ্যে স্বজাত্যবোধ জাগ্রত না হয়। ইংরেজরা চলে যাবার পরে পাকিস্তানীরা আমাদের মাথার ওপর চেপে বসেছিল। এর পর ’৭১ সালে স্বাধীনতা পর স্বদেশী শাসকরাও পুলিশকে গতানুগতিক ধারায় ব্যবহার করতে থাকে। বস্তুতঃ বাংলাদেশের বর্তমান পুলিশ-ব্যবস্থায় মেট্রোপলিটন পুলিশিং এর মতো সামান্য কিছু পরিবর্তিত ধারণা ছাড়া অন্য কোন পরিবর্তন লক্ষ্য করা দুষ্কর। তাই আমাদের অশীতিপর বৃদ্ধদের দেখা ব্রিটিশ পুলিশের ‘দারোগা বাবুর’ সাথে স্বাধীন বাংলাদেশের টগবগে যুবকের প্রাত্যহিক জীবনে দেখা পুলিশ ‘সাব-ইন্সপেক্টরের’ মধ্যে মৌলিক কোন পার্থক্য নেই। এক কালে ব্রিটিশ-বাংলার দারোগাদের দেখলে যেমন জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি হত, তেমনি বর্তমানের পুলিশ সদস্যরাও জনগণের কাছে কাঙ্খিত কোন গণ-কর্মচারী নয়। দেশের জনগণ ক্ষমতাসীন শাসক গোষ্ঠির সাথে পুলিশকে কোন দিনই আলাদা করে দেখতে পারে নাই। অথচ ব্রিটেনের মূল ভূখণ্ডের মানুষ তাদের দেশের পুলিশকে সব সময় তাদের সরকার যন্ত্র থেকে পৃথক করে দেখেছে। সরকারের নীতি জন-নিপীড়ক হলে, ব্রিটেনের পুলিশ সরকারের সাথে থাকেনি। সরকারের অপকর্মের দায়ভার লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ কখনো নিজেদের ঘাড়ে নেয়নি। ইংল্যান্ডের পুলিশ সব সময় আইন, আদালত ও জনগণের কাতারেই ছিল এবং এখনও আছে। আর এজন্যই ব্রিটিশ মেট্রোপলিটনের ‘ববিদের’ এত আদোর, তাদের প্রতি মানুষের এত ভালবাস ও ভরসা।

ব্রিটিশ-বাংলা পুলিশের উত্তরাধিকার বাংলাদেশ পুলিশ তার প্রতিষ্ঠার আদিকাল থেকেই এক বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। নিভৃত পাল্লীর বট তলার পুঁথি পাঠের আসর থেকে শুরু করে আলোকোজ্জ্বল শহরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত তারকা খচিত হোটেল পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশ তর্ক-বিতর্ক ও সমালোচনার এক চিনিযুক্ত চুইং গাম। পানা পুকুরে লুক্কায়িত বেওয়ারিশ লাশ উত্তলোন বলেন, আর রাজধানী শহরে বিক্ষোভকারীদের উপর লাঠিচার্জ বলেন, বাংলাদেশ পুলিশ কর্তৃক কৃত এমন কোন কাজ নেই যা সমালোচনার বস্তুতে পরিণত হয় না। রাস্তায় টহলরত পুলিশ আমাদের ঘরের ভিতর প্রবেশ করুক তা আমরা চাই না; আবার বাসস্থানের কাছাকাছি পুলিশ না থাকলে স্বস্তিও বোধ করি না। নিভৃত গ্রামের কোন বাজার এলাকায় অবস্থিত পুলিশ ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যরা আমাদের অনেক বিরক্তির কারণ হতে পারে। কিন্তু, এই পুলিশ ফাঁড়িটি অন্যত্র সরিয়ে নিলে বা বন্ধ করে দিলে আমরা তার জন্য থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা থেকে শুরু করে স্বরাষ্ট্র সচিব, এমনকি মহামান্য রাষ্ট্রপতির সমীপে গণ-দরখাস্ত পেশ করি। বিক্ষোভকারীদের উপর পুলিশের লাঠিচার্জ দেখে আমরা পুলিশকে বর্বর বলে গালি দেই; কিন্তু একই ঘটনায় বিক্ষোভকারীদের দ্বারা গাড়ি ভাংচুর বা দোকান-পাটে অগ্নিসংযোগ ঠেকাতে না পারার ব্যর্থতার জন্য আবার একই পুলিশকে দোষারোপ করি।

পৃথিবীর সকল দেশের সকল পুলিশ সংগঠনই তাদের কাজের দ্বারা সব সময় আলোচনার বস্তুতে পরিণত হয়। কিন্তু উন্নত দেশ সমূহের পুলিশ জনগণের কাছে আমাদের বাংলাদেশের পুলিশের মতো এত বিরক্তির কারণ হয়ে ওঠে না। ঐসব দেশে পুলিশ জনগণের কেবল ধিক্কারই অর্জন করে না; তারা জনগণের কাছ থেকে শ্রদ্ধা-ভালবাসা-সহানুভূতিও পেয়ে থাকে। পৃথিবীর সকল দেশেই পুলিশের সাথে সাধারণ মানুষের সম্পর্ক অম্ল-মধুর। কিন্তু বাংলাদেশ পুলিশের সাথে সাধারণ মানুষের সম্পর্ক কেবলই তিক্ত; এতে মাধুর্য্যের ছিঁটা-ফোটাও নেই।

আমরা, বাংলাদেশীরা, কেন আমাদের পুলিশকে অচ্ছুত মনে করি; কেনই বা পুলিশের যে কোন কাজ শুধুই সমালোচনার বস্তুতে পরিণত হয়? বাংলাদেশ পুলিশ একটি সংগঠন হিসেবে কেন এত তর্কিত-বিতর্কিত ও সমালোচিত হয়? এই সব বিষয়ের অন্তর্নিহিত কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করাই এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য। আমরা এখন একে একে বিষয়গুলো আলোচনা করব। তবে পাঠককে অনুরোধপূর্বক স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, আমার নিবন্ধের মতামত সমূহ একান্তই আমার ব্যক্তিগত। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সাথে পেশাগত অভিজ্ঞতা মিলিয়ে আমার যে উপলব্ধি তারই প্রেক্ষাপটে আমার এই মতামত হলেও এর সাথে আমার পেশার বা পদবীর কোন সম্পর্ক নেই। সমাজে বসবাসকারী একজন সাধারণ মানুষ ও পুলিশ-বিজ্ঞানের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি পুলিশ সম্পর্কে এই সব মতামত পোষণ করি।

(চলবে)