ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

আয়েসী পাঠ-সংক্ষেপঃ

দেশের মানুষ নির্বিঘ্ন জীবন-যাপনের জন্য একটি সেবাদানকারী, দক্ষা ও নিরপেক্ষ পুলিশ সংগঠন প্রত্যাশা করে। তারা পুলিশকে মনের অজান্তেই আদর্শের বেদীতে স্থান দেয়। কিন্তু বাস্তবে তাদের আদর্শ পুলিশ তারা পায় না। মানুষ পুলিশকে সমাজের সকল অনিষ্টের নিবারক বলে মনে করে। কিন্তু তারা দেখে পুলিশ অধিকাংশ অপরাধ নিবারণ করতে পারে না; বরং কোন কোন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। সর্বক্ষণ, সর্বত্র উপস্থিতি এবং সকল বিষয়ে বৈধ হস্তক্ষেপকারী হিসেবে পুলিশ সমাজের শ্রেণি-বর্ণ-পেশা ও সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে সবাইকে স্পর্শ করে।

আদর্শ পুলিশের আকাঙ্খাঃ
অপরাধ দমন, প্রতিরোধ, অপরাধজনক ঘটনার তদন্ত ও জান-মালের নিরাপত্তাদানের জন্য দেশবাসী পেশাগত ভাবে সুদক্ষ, মজলুমদের প্রতি সহানুভূতিশীল ও অত্যাচারীদের প্রতি কঠোর, কিন্তু মানবিক গুণাবলী সম্পন্ন একটি পুলিশ সার্ভিস/বাহিনী কামনা করে। জনগণ মনে করে, পুলিশ তাদের রাত্রির নিদ্রা, দিনের কর্মযজ্ঞ ও অবসরের আনন্দকে নির্বিঘ্ন করবে। অপরাধীদের পাকড়াওয়ের জন্য পুলিশ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ধাওয়া করবে এবং দেশবাসীর নিরাপত্তার খাতিরে প্রয়োজনে আপন জীবন উৎসর্গ করবে। যেসব দোষে সমাজের অন্যান্য মানুষ কলুষিত হয়েছে বা হয়ে থাকে, পুলিশ সদস্যদের সেসব দোষ স্পর্শ করবে না।

পঙ্কিলতায় নিমজ্জিত সমাজকে কলুষমুক্ত করার দায়িত্ব জনগণ পুলিশের উপর ছেড়ে দিয়েছে। সর্ব প্রকার অপরাধ দমন, নিয়ন্ত্রণ, নিবারণ, তদন্ত, অপরাধীদের গ্রেফতার ইত্যাদি সব কিছুর জন্য মানুষ পুলিশকে দায়িত্ববান বলে মনে করে। পুলিশের সীমাবদ্ধতার কথা নাগরিকগণ শুনতে চায় না। অনেক সময় তারা পুলিশকে সমান্তরাল সরকার কিংবা স্বাধীন কোন সরকারি সংস্থা বলেও মনে করে। তারা মনে করে, গভীর রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় ডাকাত কর্তৃক আক্রান্ত হলে পুলিশ সব ডাকাতকে হাতেনাতে ধরে ফেলবে। কিংবা ডাকাতি যাওয়া মালপত্র স্বল্পতম সময়ে উদ্ধার করবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না।

মানুষ মনে করে, পুলিশ হবে বাদশা সোলাইমানের মতো জ্ঞানী, ডেভিডের মতো সাহসী, স্যামসানের মতো শক্তিশালী, মুসা (আঃ) এর মতো নেতৃত্ব দানকারী, আলেকজান্ডারের মতো রণকৌশলী, ড্যানিয়ালের মতো আত্মবিশ্বাসী এবং লিংকনের মতো কূটনৈতিক প্রজ্ঞার অধিকারী। কিন্তু জনগণের প্রত্যাশা থেকে বাংলাদেশের পুলিশ অনেক অনেক দূরে।

পুলিশকে মানুষ সকল অপরাধের নিবারক বলে মনে করেঃ
সাধারণ মানুষ মনে করে, যে কোন প্রকার অপরাধ নিবারণ করা পুলিশের দায়িত্ব। সাধারণ মানুষের সামনে বা গোচরে সংঘটিত অপরাধটি দেওয়ানী, না ফৌজদারি; কিংবা ধর্তব্য, না অধর্তব্য তা জানার কোন গরজ সাধারণ মানুষ মনে করে না। কোন জাতীয় অপরাধ নিবারণের দায়িত্ব বা তদন্তের ক্ষমতা পুলিশের আছে এবং কোন অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা পুলিশের নেই — এসব প্রশ্ন সাধারণ মানুষের নিকট অপ্রাসঙ্গিক। তারা অতি সরল মতবাদে বিশ্বাসী।

কোন অপরাধ সংঘটিত হলে পুলিশকে তার একটা বিহিত করতে হবে। অনেক সময়, কিছু ভূক্তভোগী পুলিশের কাছে এসে ফরিয়াদ করে বলে, আমি কি কোনই বিচার পাব না । আপনি আমার বিচারটি করেন। কিন্তু বিচার করার ক্ষমতা যে পুলিশকে আইন দেয়নি, তা তারা বোঝে না। মানুষ জানে না যে পুলিশ কেবল ফৌজদারি অপরাধ নিবারণের দায়িত্ব পালন করে। মানূষ জানে না যে অর্ধতব্য অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশের তদন্তের ক্ষমতা আদালতের অনুমতি সাপেক্ষ। অধিকন্তু, অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘ শিকলের পুলিশ যে একটি আংটা (লুপ) মাত্র, তা সাধারণ মানুষকে বোঝান যায় না। কোন অপরাধীর সাজা প্রদান নিশ্চিত করতে পুলিশের পরে আইনজীবী, সাধারণ সাক্ষী, বিশেষজ্ঞ সাক্ষী (ডাক্তার, রাসায়নিক পরীক্ষক, বিষ্ফোরক বিশারদ ইত্যাদি), ক্ষেত্রমতে ম্যাজিস্ট্রেট প্রমূখের যে অবিচ্ছেদ্য ভূমিকা থাকে, তা সাধারণ মানুষকে বোঝানো যায় না।

মানুষ আশা করে, অবৈধ দখলাদারকে পুলিশ তার জমি থেকে উচ্ছেদ করবে, ঘুষখোরকে পুলিশ গ্রেফতার করবে, প্রতারককে পুলিশ কোমরে রশি দিয়ে আদালতে উপস্থাপন করবে, অবৈধ সুবিধা ভোগিকে পুলিশ সায়েস্তা করবে, ক্ষমতার অপব্যবহারকারী রাজনীতিবিদদের পুলিশ গ্রেফতার করবে, কোন প্রকার সাক্ষ্য প্রমাণ না রেখেই বন্ধুবেশী প্রতারককে ধার দেয়া টাকা পুলিশ উদ্ধার করে দিবে। কিন্তু পুলিশ মানুষকে বোঝাতে সক্ষম নয় যে মানুষের প্রত্যাশিত সকল দাবী পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষমতা, প্রাধিকার ও দায়িত্ব সংসদ কর্তৃক পাশকৃত আইনে পুলিশকে প্রদান করা হয়নি।

সর্বত্র অবিরাম উপস্থিতির মাধ্যমে পুলিশ সকল স্তরের মানুষকে স্পর্শ করেঃ
পুলিশের পদচারণা সব স্থানেই। অফিস আদালত থেকে শুরু করে গভীর জংগল বা বিরান ভূমি — সব স্থানেই পুলিশের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। দিবা-রাত্র সব সময় কর্মরত থাকতে হয় বলে মানুষ ঘুম থেকে উঠেই যেমন পুলিশকে দেখে, তেমনি ঘুমাতে যাওয়ার আগেও পুলিশকে দেখে। পুলিশবিহীন কোন ক্ষণ নেই, কাল নেই; পুলিশবিহীন কোন দেশ নেই, স্থান নেই; পুলিশবিহীন কোন জনপদ নেই, জনসমাগম নেই।

আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও তাই। সংসদ কর্তৃক পাশ করা হাতে গণা কিছু আইন ছাড়া প্রায় সব আইনই পুলিশ প্রয়োগ করতে পারে। পুলিশের কর্তৃত্বের আওতায় পৃথিবীর সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তিকেও আসতে হয়। গ্রেফতার না হলেও নিরাপত্তার জন্য সবার পুলিশ দরকার পড়ে। বাদশা থেকে ফকির পর্যন্ত সবাইকে পুলিশের কাজ-কর্ম স্পর্শ করে। তাই, পুলিশের কাজ-কর্মের প্রতি যে কোন মানুষ তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখে।

গ্রামের একজন কৃষক জানেন না যে, আয়কর বিভাগ নামে সরকারের কোন বিভাগ আছে। কারণ, তিনি কখনো আয়কর দেননি। নদীর মাঝির জানার কথা নয় যে, শুল্ক বিভাগ নামের কোন সরকারি প্রতিষ্ঠান আছে। রিকসা ওয়ালার কাছে গণপূর্ত বা পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট অপরিচিত। তাই, এই সব বিভাগের ভিতরে-বাহিরে কি হচ্ছে তা এসব মানুষের কাছে জানা থাকার কথা নয়। কিন্তু পুলিশকে তারা বেশ খানিকটা জানে, পুলিশ কি করে তা তারা দেখে। পুলিশ কর্তৃক তাদের হয়রানী হতে হয় কিংবা তাদেরকে পুলিশের সাহায্য প্রার্থণা করতে হয়। (চলবে)