ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

আয়েসী পাঠ-সংক্ষেপঃ
সরকারের মাধ্যমে জনগণ কোন নাগরিককে সন্দেহবশত বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের সাধারণ ক্ষমতা শুধু পুলিশকেই দিয়েছে। গ্রেফতারের ক্ষমতা পুলিশকে তাই অন্যান্য সরকারি কর্মচারী হতে শুরু করে সাধারণ মানুষকেও পুলিশ সম্পর্কে একটি বিশেষ নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতে অভ্যস্ত করে তোলে। অন্য দিকে পুলিশ সম্পর্কে সত্য-মিথ্যা, কথা-রূপকথার সংমিশ্রণে মানুষের মনে তৈরি হয়েছে একটি পূর্বসংস্কার। এই পূর্ব সংস্কার পুলিশকে বিতর্কিত দেখতেই উৎসাহ যোগায়।

ব্রিটিশ-ঔপনিবেশিক আমল থেকেই বাংলাদেশ পুলিশের একটি ঐতিহাসিক ঋণাত্মক ভূমিকা রয়েছে। স্বাধীনতার পরবর্তীকালেও পুলিশ সেই ভূমিকা থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে তাদের নেতিবাচক ভূমিকা শানিত হয়েছে।

পুলিশের স্বয়ংসম্পূর্ণ কোন স্বাধীন স্বত্ত্বা নেই। তাদের সাফল্য-ব্যর্থতার সবটুকুই জনগণের উপর নির্ভরশীল। পুলিশ আইন-বিধি ও জন-প্রত্যাশার শৃঙ্খলে আবদ্ধ একটি সংগঠন। কিন্তু সাধারণ মানুষ পুলিশের সীমাবদ্ধতাগুলো জানেন না এবং জানলেও তা মানতে চান না। অধিকন্তু, পুলিশ সম্পর্কে বিভিন্ন প্রচার ও বিনোদন মাধ্যমে উৎসাহব্যঞ্জক বা ইতিবাচর প্রচারণা নেই। পুলিশের সাফল্য প্রচার মাধ্যমের জন্য ভাল কোন খবর নয়।

পুলিশ গ্রেফতারের ক্ষমতা রাখেঃ
পুলিশের অন্যতম কাজ ধর্তব্য অপরাধের সাথে জড়িত বা ধর্তব্য অপরাধ করতে উদ্যত ব্যক্তি, সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও আদালত কর্তৃক গ্রেফতারী পরোয়ানাধারী ব্যক্তিদের গ্রেফতার করা। গ্রেফতার হল, বৈধ নিয়মে কোন ব্যক্তির চলাফেরার স্বাধীনতা খর্ব করা। গ্রেফতারের ক্ষমতা হল, কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ব এক অনন্য ক্ষমতা। কেবল পুলিশই কোন ব্যক্তিকে পরোয়ানা মূলে বা বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের সাধারণ ক্ষমতা ভোগ বা প্রয়োগ করতে পারে। জন-শৃঙ্খলা রক্ষা, তথা জনগণের নিরপত্তার জন্যই পুলিশকে এই ক্ষমতা আইনানুসারে দেয়া হয়েছে। কিন্তু পুলিশের গ্রেফতারের ক্ষমতাকে জনগণের একটি বিরাট অংশ অপছন্দ করে। অনেকে এই জন্য পুলিশকে বিশেষভাবে ঈর্ষা করে। কোন মামলায় আসামী হলে পুলিশ আসামীকে গ্রেফতার করে। মামলার বিচারে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির সাজা হোক বা না হোক, আইনের আওতায় আসার জন্য মানুষ প্রথমতঃ পুলিশকেই দোষারোপ করে। সরকারি কর্মচারিদের মধ্যে যেহেতু কেবল পুলিশই বিনা পরোয়ানায় বা সন্দেহ বসতঃ গ্রেফতার করতে পারে, তাই বিভিন্ন স্তরের সরকারি কর্মচারিগণও পুলিশকে ঈর্ষা করে। বস্তুতঃ ঈর্ষা থেকেই অপছন্দের সূচনা হয়।

অন্যদিকে পুলিশ সদস্যরাও তাদের উপর জনগণ কর্তৃক প্রদত্ব এই পবিত্র আমানতের অহরহই খেয়ানত করে। যে ক্ষমতা দিয়ে তাদের জনগণকে রক্ষা করার কথা, সেই ক্ষমতা দিয়েই তারা জনগণকে হয়রানী করে। সংকীর্ণ স্বার্থ উদ্ধারের জন্য তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে।


পুলিশ সম্পর্কে পূর্বসংস্কারঃ

বাংলাদেশ পুলিশ ব্রিটিশ বাংলার অত্যাচারী ইংরেজ শাসকদের নির্মম শাসন ও শোষণের ঐতিহ্যের অধিকারী। এ দেশে ব্রিটিশ শাসন টিকিয়ে রাখার জন্য শাসক ও তাদের দোসর জমিদারদের স্বার্থ সিদ্ধ করাই ছিল তৎকালীন পুলিশের প্রাথমিক উদ্দেশ্য। ব্রিটিশ বাংলার পুলিশ বাহিনীতে এ দেশের যুবকগণ কাজ করলেও পুলিশের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল ব্রিটিশদের হাতে। তাই ব্রিটিশ পুলিশ সাধারণ মানুষের কাছে অত্যাচার আর নির্যাতনের মূর্ত প্রতীক ছিল। পুলিশ আর জনগণ ছিল একে অপরের প্রতিপক্ষ। সেই ব্রিটিশ বাংলায় পুলিশের যে মূর্তি মানুষের মনে স্থান করে নিয়েছিল, স্বাধীন দেশের মানুষের মন থেকে তা আজও দূর হয়নি। সেই আইন, সেই বিধি, সেই নির্দেশ-নিয়ন্ত্রণ এবং সেই ঐতিহ্য লালন করেই বাংলাদেশ পুলিশের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তাছাড়া পূর্বসংস্কার বসতঃ বাংলার মানুষ এখনও পুলিশকে একটি বিজাতীয় সংগঠন বলেই মনে করেন। মানুষের মনে পুলিশের অতীত প্রতিমূর্তি এমনই যে অবচেতন মনে বাংলার মানুষ এখনও পুলিশের কাছ থেকে উগ্র আচরণই প্রত্যাশা করে; পুলিশের বিনয়ী আচরণে মানুষের মনে অবিশ্বাস ও সন্দেহের সৃষ্টি হয়। সডক দুর্ঘটনায় আহত কোন ব্যক্তিকে টহলরত পুলিশ গভীর রাতে হাইওয়ে হতে উদ্ধার করে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়ে তার সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করে সুস্থ করে তোলার পর হাসপাতাল ত্যাগ করার পরক্ষণই কেউ যদি তাকে প্রশ্ন করে, ‘পুলিশ কেমন’? তিনি, নির্দিধায় উত্তর দিবেন, ‘পুলিশ জন্মের খারাপ’?

আমাদের দেশের মানুষ গর্ব করে বলেন, তাকে কোন দিন পুলিশের কাছে যেতে হয়নি। এ দেশে তিন শ্রেণির মানুষ আছে —- যারা পুলিশের কাছে গিয়েছেন এবং উপকার পেয়েছেন, যারা পুলিশের কাছে গিয়েছেন কিন্তু সেবা পাননি, দুর্ব্যবহার পেয়েছেন এবং সর্ব শেষ শ্রেণির মানুষ কোন দিন পুলিশের কাছে কোন ভাবেই যাননি বা যেতে হয়নি। প্রথম শ্রেণীর মানুষ পুলিশের প্রতি সহানুভূতিশীল, দ্বিতীয় শ্রেণীর মানুষ পুলিশকে দারুণ অপছন্দ করবেন। কিন্তু, তৃতীয় প্রকার মানুষ পুলিশকে কোন দিনই ভাল বলেন না। যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশেও পুলিশের সংস্পর্শে আসা মানুষের শতকরা হার হল মাত্র ১৩। সে দেশেরও ৮৭% নাগরিক কোন দিন পুলিশের দ্বারস্থ হয় না। কিন্তু সে দেশের সাথে আমাদের দেশের পার্থক্য হল, সেখানে পুলিশের সংস্পর্শে না আসা লোকরা পুলিশের প্রতি বিরূপ ধারণা পোষণ করেন না। কিন্তু বাংলাদেশে যারা কোন দিনই কোন কারণে পুলিশের সংস্পর্শে আসেননি এবং যাদের সংখ্যা তারাই পুলিশকে বেশি মাত্রায় অপছন্দ করেন। সম্ভবতঃ পুলিশ সম্পর্কে আমাদের যত বেশি পূর্ব-সংস্কার আছে, অন্য কোন সরকারি কর্মচারী সম্পর্কে ততোটা নেই।

পুলিশের ঐতিহাসিক নেতিবাচক ভূমিকাঃ
বাংলাদেশ পুলিশ ব্রিটিশ-বাংলা পুলিশের উত্তরাধিকার বহন করে। আমাদের পুলিশ যে আইনের অধিনে পুলিশি দায়িত্ব পালন করে তা ১৮৬১ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট কর্তৃক পাশ করা। এই আইনের কোথাও পুলিশকে বাংলাদেশ পুলিশ বলা হয়নি। সবচেয়ে বড় কথা হল, ব্রিটিশরা এদেশের মানুষকে সেবা দেয়ার জন্য পুলিশ তৈরি করে নাই। তারা পুলিশ তৈরি করেছিল এদশের মানুষকে শাসন ও শোষণ করার জন্য। এ দেশে ব্রিটিশ-শাসনের মূখ্য উদ্যেশ্যই ছিল খাজনা আদায় করা। যারা খাজনা দিতে পারত না, তাদের গরু-বাছুর এমন কি যুবতী মেয়েদেরও জোর করে তুলে নেয়ার কাজটা তারা পুলিশকে দিয়েই করত। এই লক্ষ্যে তারা পুলিশের জন্য প্রয়োজনীয় আইনও তৈরি করেছিল যাতে পুলিশ তাদের কথা মত চলতে বাধ্য হয়। আমাদের পুলিশ এখনও মূলতঃ সেই আইনেই পরিচালিত হয়। সেই ঔপনিবেশিক আমলের পুলিশের চেহারা মানুষের চোখের সামনে ভেসে উঠলে তারা ভুলে যায় যে তাদের পাড়ার ছেলেটিই একজন পুলিশ অফিসার এবং সে তাদের সুখে-দুঃখে সাথী হতে চায়। ব্রিটিশ পুলিশের অত্যাচারে জর্জরিত বৃদ্ধ বিশ্বাস করতে পারে না যে তার আপন ছেলেটি পুলিশ; অথচ অত্যাচারী নয়। তাকে ছেলে বলে পছন্দ করলেও তিনি তাকে পুলিশ বলে অপছন্দ করতে থাকেন। আর যাকে পছন্দ করি না তার ছোট-খাট ভুলগুলিও বড় হয়ে দেখা দেয়। তার উপর নিজের অজান্তেই মানুষ অপবাদ দিতে শুরু করে।

পুলিশের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে অস্বচ্ছ ধারণাঃ
মানুষ ঘুম থেকে উঠে যে সরকারি কর্মচারিটিকে প্রথম দেখে এবং ঘুমাতে যাওয়ার পূর্বে যে সরকারি কর্মচারিটিকে দেখে, সে আর কেউ নয়, পুলিশ। কিন্তু এই পুলিশের সুখ-দুঃখ, সুবিধা-অসুবিধা, কর্তব্য-কর্মের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের স্বচ্ছ ধারণা নেই। রাস্তায় টহলরত পুলিশ অফিসারটিকে এলাকার মানুষ প্রতিদিন দেখলেও তার কাজের ধরণ বা কাজের ধারার সাথে তারা প্রায় অপরিচিত। হাতে রেডিও সেট ও কোমরে পিস্তল ঝোলান পুলিশের একজন সাব-ইন্সপেক্টরকে দেখে সাধারণ মানুষ তাকে বড়ই ক্ষমতাবান বলে মনে করে। কিন্তু তার বাহ্যিক চাক-চিক্যের অন্তরালে অক্ষমতাটুকু কেউ তলিয়ে দেখেন না। শত বছরের জঞ্জাল মাথায় নিয়ে হাজারো সরকারি সীমাবদ্ধতা ও ব্যক্তিগত অভাব-অনটনের মধ্যে যে পুলিশ সরকারি দায়িত্ব পালন করে, সে তার কষ্টের কথা কাউকে জানাতে পারে না। পুলিশ কোন বিক্ষোভ করতে পারে না। কর্মবিরতি বা ধর্মঘট পুলিশের জন্য হারাম । সরকারের সকল বেসামরিক কর্মচারী তাদের দাবী-দাওয়া, চাওয়া-পাওয়া, সুযোগ-সুবিধা আন্দোলন করে সরকারের কাছ থেকে আদায় করতে পারে। অন্যদের দাবী-দাওয়া আদায়ের আন্দোলন ঠেকাতে পুলিশ সরকারের পক্ষে কঠোর একশনে যায়। কিন্তু নিজের দাবী-দাওয়া সরকার বা সমাজকে জানানোর মতো উপায় পুলিশের জানা নেই। বিচার ব্যবস্থা নামক শিকলের একটি আংটা বা লুপ হল পুলিশ। কিন্তু অন্য অংশ বা চেইনের অন্য লুপ যেমন, পাবলিক সাক্ষি, ডাক্তার, মামলা পরিচালনাকারি আইনজীবী, আদালত ইত্যাদি সম্পর্কে মানুষ তেমন কোন ধারণা পোষণ করে না । তাই, যে দায়িত্ব পুলিশের নয়, সেই দায়িত্বও পুলিশকে বহন করতে হয়। যে কর্মের জন্য পুলিশ আদৌ দায়ী নয়, তা সম্পন্ন না হবার ব্যর্থতাও পুলিশকে মাথা পেতে নিতে হয়।

নাটক, নভেল, সিনেমা ও বিনোদন মাধ্যমে পুলিশকে ঘুষ খোর ও ক্ষমতার অপব্যবহারকারী হিসেবে চিত্রায়নঃ

পুলিশ ছাড়া কোন চলচ্চিত্র নির্মিত হয় না। পুলিশের খবর ছাড়া কোন পত্রিকা প্রকাশিত হয় না। কোন বড় সড় উপন্যাসও পুলিশের চরিত্র ছাড়া লেখা হয় না। কিন্তু এ সবের কোথাও পুলিশের সুখকর ভাবমূর্তি তুলে ধরা হয় না। অনেক সময় নাটক সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্রে কোন পুলিশ অফিসার থাকেন। তাকে হয়ত মহান করে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু আমাদের চলচ্চিত্রকারগণ এই চরিত্রের মধ্যে এমন সব অসংগতি রেখে দেন যাতে এই চরিত্রটি মানুষের কাছে বাস্তব বলে মনে হয় না। একজন সৎ পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টরের বিলাশ বহুল বাড়ি, গাড়ি ইত্যাদি বাস্তবতা বর্জিত। কোন ফোর্স সাথে না নিয়ে ভীমের শক্তিতে আসামী পাকড়াও বা একা ত্রিশ/চল্লিশ জন লোকের সাথে মারা-মারি করে জয়লাভ করা—-এ সবের কোনটিই বাস্তবের পুলিশ চরিত্র নয়। অন্য দিকে প্রাসঙ্গিকভাবে যত পুলিশ চরিত্রই চলচ্চিত্রে আসে তার সবই হয় ঘুষ খোরের; নয়তো ভাঁড়ের। সুকুমার রায়ের ছড়ার মধ্যেও পুলিশকে এভাবে চিত্রায়িত করা হয়েছে-

-সবে হল খাওয়া শুরু, শোন শোন আরো খায়
সুধ খায় মহাজনে, ঘুষ খায় দারোগায়।

ছড়ার পাঠক কচি-কাঁচারা এই ছড়ার মাধ্যমে আর কিছু না শিখুক,দারোগা যে ঘুষ খায় তা সে শিখবেই।

(চলবে)