ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

পুলিশের দুর্নীতি পারস্পরিক লাভ-ক্ষতির নয়ঃ
সরকারি কর্মচারীগণ যে সব কারণে মানুষের আলোচনার বস্তুতে পরিণত হন, তার অন্যতম কারণ হল দুর্নীতি। কিন্তু পুলিশের দুর্নীতি অন্যান্য সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি থেকে সম্পূর্ণ পৃথক প্রকৃতির। পুলিশ তার প্রাত্যহিক কর্মের মাধ্যমে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে স্পর্শ করলেও পুলিশের দুর্নীতি সাধারণ মানুষকে সরাসরি উল্লেখযোগ্য কোন আর্থিক প্রতিদান দিতে পারে না। পুলিশের আউট-পুট টাকার অংকে মাপা যায় না। যার মূল্য টাকার অংকে সহজে রূপান্তরযোগ্য নয়, তা মানুষকে তাৎক্ষণিকভাবে আকৃষ্ট করতে পারে না। বিমান বন্দরে শুল্ক ফাঁকি দিতে আমদানীকারকরা অধিক দামে আমদানী করা পণ্যের দাম কম দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সন্তুষ্ট করে তাদের পণ্য ছাড় করান । উদাহরণ স্বরূপ, গত ২০০৬ সালের আমারদেশ পত্রিকার কোন এক সংখ্যার খবর অনুযায়ী জিয়া( শাহজালাল) আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে কোন এক প্রতিষ্ঠান ভারত থেকে আমদানীকৃত বেনারশী শাড়ির প্রতিটির আমদানী মূল্য দেখিয়েছেন মাত্র ১২ টাকা। এর প্রকৃত মূল্য তিন হাজার টাকার কম নয়। এখন তিন হাজার টাকার কাস্টমস ডিউটি না দিয়ে তিনি ১২ টাকার উপর শতকরা হারে কাস্টমস ডিউটি দিচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি যদি কাস্টমস বিভাগের লোকদের শাড়ি প্রতি এক হাজার টাকা করেও ঘুষ দেন তবু বাজারে তার শাড়ি প্রতি তিন /চার হাজার টাকা লাভ থাকবে। এখানে ঘুষ দাতা ও ঘুষ গ্রহীতা উভয়েই লাভবান হচ্ছে। তাই আমদানী কারক কোন দিন বলে বেড়াবেন না যে তিনি কাস্টমস বিভাগের কর্মচারীদের ঘুষ দিয়ে থাকেন। প্রকৌশলী দশ হাজার টাকা ঘুষ নিয়ে ঠিকাদারের পাঁচ লাখ টাকার বিল পাশ করিয়ে দেন। তাই ঠিকাদার ও ইঞ্জিনিয়ার একে অপরকে দোষারোপ করেন না। যারা প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করেন, তারা প্রকল্পের কাগজপত্র ঠিকঠাক করার সময় পার-সেন্টেজ নিয়ে নেন। জনগণ জানেন না যে তাদের জন্য ব্যয়িত অর্থ অন্যের পকেটে চলে গেছে। কিš‘, পুলিশ ঘুষের বিনিময়ে মানুষকে আর্থিক সুবিধা দিতে পারে না। পথচারীকে গ্রেফতার করে থানায় নেয়া বা তার নামে মামলা দেবার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ে পুলিশ লাভবান হতে পারে। কিš‘ যিনি ঘুষ দিবেন তার কোন লাভ নেই। রাস্তায় দলিলপত্রবিহীন মোটরযান আটক করে অর্থের বিনিময়ে মামলা না দিয়ে তা ছেড়ে দিলে মোটরযান মালিক নিজেকে কখনো লাভবান মনে করেন না। আয়কর কর্মকর্তা দশ হাজার টাকা উৎকোচ নিয়ে আপনার প্রকৃত আয় পঞ্চাশ লাখের পরিবর্তে বিশ লাখ দেখিয়ে আপনাকে বিরাট অংকের আয়কর থেকে বাঁচিয়ে দিতে পারেন। এতে করদাতা দশ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে প্রকৃতপক্ষে কয়েক লক্ষ মুনাফা করেছেন। কিন্তু ফৌজদারি মামলায় গ্রেফতার না হওয়ার শর্তে আপনি পুলিশ অফিসারকে যদি পাঁচশত টাকাও দেন, তার কোন মুনাফা নেই। এ জন্য আপনি আফসোস করবেন।

পুলিশের কাজে কেউ না কেউ অসন্তুষ্ট হবেইঃ
পুলিশের সেবাদানের বাস্তব ক্ষেত্র তার অর্পিত দায়িত্বের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত। যে দায়িত্ব আইন পুলিশকে অর্পণ করেনি সাধারণ মানুষ সেই জাতীয় সেবাও পুলিশের কাছ থেকে আশা করে। সমাজের যে সমস্যার সমাধান কেউ করতে পারে নি, কিংবা যে সব সমস্যার সমাধান করতে সমাজ অস্বীকৃতি জানায়, সেই সব সমস্যাও পুলিশকে সমাধান করতে হয়। স্বাভাবিক ভাইে পুলিশের সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পাল্লাটাও ভারী থাকে। অন্যদিকে, পুলিশের কাজ ধন্যবাদ বর্জিত। ইংরেজিতে যাকে বলে Thankless Job। বিবদমান দুটো পক্ষের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পুলিশকে কাজ করতে হয়। দুই পক্ষের কেউ হয়তো পুলিশকে পছন্দ করবে না। অথবা একটি পক্ষ পছন্দ করলেও অন্য পক্ষ পছন্দ করবে না।

মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা হল নিয়ম ভঙ্গ করা। আইন হল মানুষের অনিয়ন্ত্রিত প্রবৃত্তির মুখে পরানোর জন্য এক প্রকার অদৃশ্য লাগাম। পুলিশকে সেই লাগাম পরানোর দায়িত্ব পালন করতে হয়। মানে, তাদের সংসদ কর্তৃক পাশকৃত আইনগুলোকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে হয়। মানুষ চায় সব সময় আইন ভঙ্গ করে নিজের মতো করে চলতে। কিন্তু পুলিশ মানুষকে আইনের অনুশাসনে রাখার মতো অপ্রীতিকর দায়িত্ব পালন করে।

আপনি গাড়ি নিয়ে রাস্তার উল্টো দিকে গিয়ে আপনার কাজটি তাড়াতাড়ি করতে চান? পুলিশ আপনাকে বলবে, রাস্তার উল্টো সমান্তরালে গাড়ি চালাবেন না। আপনি প্রেক্ষা গৃহে ধূমপান করলে স্বস্তি বোধ করেন? পুলিশ বলবে, আইনে নিষেধ আছে। আপনি গভীর রাতে খোলা রাস্তায় হাওয়া খেতে পছন্দ করেন? পুলিশ বলবে, কোন ভদ্রলোক গভীর রাতে রাস্তায় থাকে না। আপনাকে মেট্রোপলিটন পুলিশ আইনে গ্রেফতার করা হবে। ফুটপাথ থেকে পুরাতন কাপড় কিনতে পারলে আপনার কিছু টাকা বেঁচে যায়। পুলিশ হকারকে তাড়া করে ফুটপাথ পরিষ্কারের চেষ্টা করবে। থার্টিফার্সট নাইটে আপনি দু-চার ক্যান বিয়ার খেয়ে রাস্তায় হই-হুল্লা করে সময় কাটাবেন? পুলিশ বলবে, না । এতে জন-শান্তি বিঘ্নিত হয়। এভাবে সারা সমাজে সবাই যখন সিদ্ধ, অসিদ্ধ, আধা-সিদ্ধ কাজের জন্য হাঁ বলতে থাকে, তখন সমাজের এক শ্রেণির জীব আছে যারা বলবে, না। আর এরা হল, পুলিশ। মনুষ্য প্রবৃত্তির উল্টো ধারায় কাজ করতে করতে পুলিশ মাত্রই মানুষের বিতৃঞ্চার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পুলিশ যদি সঠিক কাজটি সঠিকভাবেও পালন করে, তবু তাকে অপছন্দ করা হয়। কারণ, সে সব সময় ‘না’ বলে।

আইন-বিধি ও রাজনৈতিক কারণে পুলিশ একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সংগঠন নয়ঃ
পুলিশের প্রতি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ প্রতিরোধ, অপরাধ দমন ও অপরাধের তদন্তের মতো গুরু দায়িত্ব অর্পিত হলেও একটি সংগঠন হিসেবে পুলিশ অত্যন্ত দুর্বল। ১৮৬১ সালের পাঁচ নং আইন দ্বারা পুলিশ এখনও নিয়ন্ত্রিত হয়। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু সংস্কার হলেও, যেমন, মেট্রোপলিটন পুলিশ আইনসমূহে পুলিশ প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হলেও পুলিশ সাধারণভাবে দ্বৈত নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। পুলিশ আইন অনুসারে জেলা মেজিস্ট্রেট (জেলা প্রশাসক বলে ভুল করা হয়) এর সাধারণ নিয়ন্ত্রণে দায়িত্ব পালন করে। জেলা পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে পুলিশকে জেলা মেজিস্ট্রেটের উপর নির্ভর করতে হয়। দাঙ্গা দমন বা শান্তি রক্ষার জন্য বহুল পরিচিত ১৪৪ ধারা জারি করা, বিশেষ ক্ষমতা আইনে ক্ষতিকারক কাজ থেকে নিবারণের জন্য কোন ব্যক্তিকে ডিটেনশনের আদেশ দেয়া, বেসামরিক কাজে সহায়তার জন্য সশস্ত্র বাহিনী তলব করা ইত্যাদি জরুরী কাজগুলো সম্পাদনের জন্য পুলিশ নেতৃত্বকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা জেলা প্রসাশকের উপর নির্ভর করতে হয়। আধুনিক যুগের চাহিদামত তড়িৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণে পুলিশের নিয়ন্ত্রণে এই দ্বৈত কর্তৃত্ব উন্নত দেশে অচল। এমনকি আমাদের পার্শবর্তী পাকিস্তানের মতো দেশেও পুলিশের উপর থেকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কর্তৃত্ব বিলোপ করা হয়েছে। ভারতের কেরালা রাজ্যের পুলিশ আইনে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আর জেলার পুলিশ সুপারকে পরষ্পরের পরিপূরক হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। অথচ, বাংলাদেশে পুলিশকে অনেক ছোট-খাট ক্ষেত্রেও অন্যান্যদের উপর নির্ভর করতে হয়। এমন কি অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে পুলিশ অফিসারগণ হাসপাতালের মর্গে যে লাশ প্রেরণ করেন, তার খরচ টুকুর জন্যও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের উপর নির্ভর করতে হয়। জেলার কোন পুলিশ সুপারের নিয়োগ, বদলী বা শাস্তিদানের ক্ষেত্রে পুলিশ প্রধানের মতামত কার্যতঃ মূল্যহীন। কোন জেলার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য পুলিশ প্রধানকে জবাবদিহি করতে হয়। অথচ, সেই জেলায় কোন পুলিশ সুপারকে বাংলাদেশের পুলিশ প্রধান (আইজিপি) পোস্টিং দিতেও পারেন না, কিংবা একবার কোন পুলিশ সুপার পোস্টিং পেলে তাকে সরাতেও পারেন না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তথা কোন সচিবের পরামর্শ মতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী পুলিশ সুপার ও তার ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়োগ-বদলী নিয়ন্ত্রণ করেন(চলবে)।