ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

২০১২ সালের ১৬ এপ্রিল এর হিসাব মতে বাংলাদেশ পুলিশের বর্তমান মঞ্জুরিকৃত সদস্য সংখ্যা সর্বমোট ১,৪৮,২৭৩ জন। তবে মোট মঞ্জুরিকৃত পদের বিপরীতে বহু সংখ্যক পদ সব সময় খালি থাকে। চলতি বছরের মার্চ মাসের হিসেব মতো প্রায় বিভিন্ন কারণে প্রায় ১৪% পদ শূন্য রয়েছে।

এই মোট জনবলের মধ্যে মাত্র ১,৯১৮ জন হল সিনিয়র অফিসার। এদের পদবী এএসপি থেকে ঊর্ধ্বে। এরা বিসিএস ক্যাডার অফিসার। এরা হল পুলিশ সংগঠনের ব্যবস্থাপনা, তদারকী ও শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের নিয়ামক।

অন্যদিকে মোট নন-ক্যাডার পদের সংখ্যা হল ১,৪৬,৩৫৫ জন। এদের মধ্যে ১,০৪,২৩৮ জনই হল কনস্টেবল। কনস্টেবলদের নিজস্ব কোন দায়িত্ব নেই।সনাতনী পুলিশিং তত্ত্বে হল ফোর্স। গাণিতিক তত্ত্বমতে এরা অংকের ডানে শূন্যের ভূমিকা পালন করে। এরা হল ফোর্স। এরা আছে তো অফিসার শক্তিশালী; এরা নেই অফিসার বড় দুর্বল।

কিন্তু, আধুনিক পুলিশিং ধারণায় পুলিশ আর ফোর্স নির্ভর থাকতে পারে না।। পুলিশকে হতে হবে সেবা নির্ভর; সমস্যার সমাধানকারী। কিন্তু, কনস্টেবলের নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও দায়িত্বের ধরণের জন্য এরা তো সমস্যার সমাধানকারী হতে পারে না।

ক্যাডার অফিসারগণ হল কোন পুলিশ বাহিনীর চালিকা শক্তি। পুলিশ প্রশাসন বা ব্যবস্থাপনার সবটাই ক্যাডার অফিসারদের হাতে নিহিত। এরা শুধু ফোর্স বা বাহিনীর ব্যবস্থাপনা, প্রশাসন ও শৃঙ্খলাই দেখেন না, তাদের উপর বর্তায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের চূড়ান্ত দায়িত্ব। তাই ক্যাডার অফিসারের সংখ্যা পর্যাপ্ত না হলে গোটা পুলিশ সার্ভিসই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলে।

আমরা আমাদের সার্কভূক্ত দেশ নেপালের কথাই ধরি। আমাদের দেশের মতোই নেপালে একটি জাতীয় পুলিশ সার্ভিস রয়েছে। আমাদের দেশের পুলিশ বাহিনীর মতোই নেপালীজ পুলিশ একজন ইন্সপেক্টর জেলারেলের অধীনে দায়িত্ব পালন করে। এই বাহিনীতে পুলিশের সদস্য সংখ্যা মোট ৬০,০৬৭ জন। এই বাহিনীতে ক্যাড়ার অফিসার শুরু হয় পুলিশ ইন্সপেক্টর থেকে। এখানে মোট ক্যাডার অফিসারের সংখ্যা হল ১,৬৯৫ জন যা মোট জনবলের ২.৮২%। এই বাহিনীতে অতিরিক্ত আইজিপির সংখ্যা হল ৮ জন এবং ডিআইজি এর সংখ্যা ২৩ জন। অপর দিকে বাংলাদেশ পুলিশের মোট সদস্য সংখ্যা ১,৪৮,২৭৩ জন। এখানে ক্যাডার পদ শুরু হয় এএসপি থেকে। এখানে মোট ক্যাডার পদের সংখ্যা ১,৮১৯ জন যা মোট পদ সংখ্যা মাত্র ১.২২%। এখানে অতিরিক্ত আইজিপি হল ১১ জন এবং ডিআইজির সংখ্যা হল ৪৬ জন। যদি নেপালিজ পুলিশের সাথে তুলনা করি, তাহলে বাংলাদেশ পুলিশের অন্যান্য পদের জনবল স্থির রেখে অতিরিক্ত আইজিপি পদে ২০ জন এবং ডিআইজি পদের সংখ্যা হওয়া উচিত ছিল ৫৭ জন।

উন্নত বিশ্বের পুলিশ বিভাগগুলোতে যেমন, যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, অস্ট্রেলিয়ায়, নিউজিল্যান্ড পুলিশে সিনিয়র অফিসারের হার মোট পুলিশ সদস্য সংখ্যার প্রায় ৫%। আমরা হয়তো উন্নত বিশ্বের মতো বেশি অফিসার আশা করব না। কিন্তু অন্তত এটা ২% তো হতে পারে। ২% হলেও ক্যাডার পোস্টের সংখ্যা হতে হবে (বর্তমানে নন-ক্যাডার সংখ্যা স্থির রেখে) মোট ৩০০০।

পৃথিবীর অনেক দেশের ক্যাডার বা সুপারভাইজিং অফিসার শুরু হয় ইন্সপেক্টর থেকে। যেসব দেশে পুলিশের এই জাতীয় পদ নেই সেখানে সিনিয়র অফিসার হল লেফটেনেন্ট থেকে উপরে (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র)। কিন্তু, আমাদের দেশে সিনিয়র অফিসার বা সুপারভাইজিং অফিসার শুরু হয় এএসপি থেকে। এরা বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন কর্তৃক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে পুলিশে যোগদান করে।

পুলিশ বাহিনী হল একটি বড় আমলাতন্ত্র। এর নিজস্ব জনবলের শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক চাহিদাগুলো পূরণের জন্য ব্যবস্থাপনা স্তরে অধীক সংখ্যক অফিসার স্বাভাবিক কারণেই প্রয়োজন। এটা একটা শ্রমঘন কারখানার মতো। এর লোকবলের ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে সম্পন্ন করা না হলে কাঙ্খিত উৎপাদন আশা করা যায় না।

অন্যদিকে, পুলিশ হল একটি অস্ত্রধারী বাহিনী। এর আইনী ক্ষমতাও প্রবল। সংগঠনের শীর্ষ ব্যক্তিটি থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন কর্মচারীটি পর্যন্ত এমন সব আইনী ক্ষমতা ভোগ করে যা অন্য কোন সরকারী কর্মচারী করতে পারে না। এই সব ক্ষমতার মধ্যে অন্যতম হল, বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার, বল প্রয়োগ করা এমন কি ক্ষেত্র মতে গুলি চালানোর ক্ষমতা। তাই এই বাহিনীর কর্মচারীদের নিয়ন্ত্রণ হওয়া দরকার অত্যন্ত নিবিড়, কঠোর ও নিরবিচ্ছিন্ন। কিন্তু সুপারভাইজিং অফিসার পর্যাপ্ত না থাকলে, অধিক সংখ্যক জুনিয়র অফিসার বা কনস্টেবলকে নিয়ন্ত্রণে রাখতেই তো সময় যায়। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ পুলিশ অপরাধ প্রতিরোধ তথা জনগণের সেবাদান নিশ্চিত করবে কিভাবে?

সূত্রঃসূত্রঃ
১। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স
২। Changing Policing Theories for 21st Century Societies by Charles Edwards, p-126-127
৩। http://en.wikipedia.org/wiki/Minister_of_Police_%28New_Zealand%29#cite_note-NZ_Police_Insignia-17 as on 07/07/2012 at 12:00 hours.