ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

ঘুষ, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, উদ্ধত আচরণ ইত্যাকার নানাবিধ অনাকাঙ্খিত আচরণের জন্য পুলিশ সৃষ্টির আদিকাল থেকেই সমালোচিত, আলোচিত এবং অনেক ক্ষেত্রে অপমানিত। যেহেতু খারাপ খবরই হল পত্রিকার জন্য ‘ভাল খবর’, তাই এই জাতীয় অসদাচরণ যে প্রত্রিকার শিরোনাম হবে তা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু কষ্ট হয়, অপমানিত বোধ করি, ক্রুদ্ধ হই, যখন কোন প্রকার বাছ বিচার ছাড়াই পুলিশের বিরুদ্ধে পত্রিকায় খবর প্রচারিত হয়।

পুলিশের বিরুদ্ধে অসত্য খবর প্রচার করে পুলিশের চরিত্র হণনেরর বিরুদ্ধে এটা আমার দ্বিতীয় নিবন্ধ। প্রথম নিবন্ধটি ছিল বাগেরহাট জেলার কচুয়া থানার এএসআই কুদ্দুসের বিরুদ্ধে একজন গর্ভবতী মহিলাকে ধর্ষণের অভিযোগ সম্পর্কে। [পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগঃ বাছবিচার ছাড়াই পত্রিকায় খবর ছাপানো যায়]

আমরা বর্তমান নিবন্ধের বিষয়বস্তু খুলনা জেলার তেরখাদা থানার সাবেক অফিসার-ইন-চার্জ জনাব মামুনুর রসীদের বিরুদ্ধে জনৈক গৃহবধুকে ধর্ষণের অভিযোগ সম্পর্কে। গত ০৭ জুন দৈনিক মানব জমিন পত্রিতিকায় ‘ধর্ষক এবার তেরখাদা থানার ওসি’ শিরোনামে লেখা হয়েছিল,

তেরখাদা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মামুন-অর-রশীদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ মঙ্গলবার বিকালে থানার পার্শ্ববর্তী সরকারি কোয়ার্টারে ওই ঘটনা ঘটে। গতকাল ওই গৃহবধূ ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থায় অভিযোগ করেন। উপজেলার কাটেংগা গ্রামের ওই গৃহবধূ তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল সংক্রান্ত একটি অভিযোগ নিয়ে মামলা করার জন্য মঙ্গলবার বিকালে থানায় যান। ওই সময় ওসি মামুন তার কক্ষের বাইরে বসেছিল। গৃহবধূর সঙ্গে কথা বলার একপর্যায়ে শহীদুল নামে এক ব্যক্তি তাকে ৩টি মাছ ও একটি মুরগি ঘুষ দিতে আসে। এ সময় ওসি ওই গৃহবধূকে ছোট বোন সম্বোধন করে মাছগুলো কেটে দিতে বলে। গৃহবধূ রুমের বাইরে বসে মাছ কাটতে চাইলেও মামুন তাকে ভিতরে যেতে অনুরোধ করে। মাছ কাটা শেষ হলে তাকে জোর করে বিছানায় নিয়ে ধর্ষণ করে। এ সময় অনেক ধস্তাধস্তি করেও তিনি রেহাই পাননি। এদিকে ওই গৃহবধূর থানায় এসে কক্ষে প্রবেশ এবং কোয়ার্টারে দীর্ঘ দু’ঘণ্টা অবস্থানের বিষয়টি থানার একাধিক স্টাফ ও বহিরাগতদের মধ্যে সন্দেহের জন্ম দেয়। পরে সন্ধ্যায় গৃহবধূ বাসা থেকে বের হয়ে বাইরে উপস্থিত অনেকের কাছে ঘটনাটি বলে কেঁদে ফেলেন।

পত্রিকার খবরের ভিত্তিতে উক্ত অফিসারকে থানা থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়। পরে একজন সিনিয়র পুলিশ অফিসার কর্তৃক বিষয়টি তদন্ত করা হয়। জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জনাব ইমামুর রসীদ সরে জমিনে অনুসন্ধান করে বিষয়টির সপক্ষে কোন সত্যতা পান নাই। বরং তিনি এই ঘটনার মূলে থানার অফিসার ও স্থানীয় কিছু স্বার্থান্বেষী মহল ও তালিকাভূক্ত সন্ত্রাসীর যোগ সাজস খুঁজে পেয়েছেন।

যে গৃহবধুকে ধর্ষণের অভিযোগ করা হয়েছে তার নাম নারগিছ সুলতানা(২৫), স্বামীর নাম- রহমত বিশ্বাস। বাড়ি হল তেরখাদা থানার কুশলা গ্রামে। তার স্বামী পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে হাজতে ছিল। এই সময় তার দোকানে চুরির ঘটনা ঘটে। তিনি স্থানীয় ইউপি সদস্য জনাব শহিদুল ইসলামকে( ৪৫)[ মোবাইল নং-০১৩৯৯৯০৩০৭] নিয়ে থানায় যান মামলা করতে। এই সময় তার সাথে রাজা মিয়া শেখ[ মোবাইল নং-০১৭৩৯৬৪৫১০২] নামে অন্য এক ব্যক্তিও উপস্থিত ছিলেন। থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) মানুন-অর-রশিদ এই সময় অফিসার-ইন-চার্জের দায়িত্ব পালন করছিলেন।

থানা কোন গোপন প্রতিষ্ঠান নয়। থানা একটি উন্মুক্ত স্থান বা পাবলিক প্লেস। থানার কখনো একা থাকতে পারে না। নীরব থানা আমাদের কাম্য নয়। থানা থাকবে সরব। যদি মারামারি, কাটাকাটি বা জঘন্য ফৌজদারি অপরাধ থানা অধীক্ষেত্রে ঘটে, তবুও জনগণ থানায় আইনী পরামর্শ নিতে আসবেন এটাই কাম্য।

যাহোক এই সময় থানায় যারা উপস্থিত ছিলেন তাদের মধ্যে সরদার আব্দুল মান্নান (৫২),[ মোবাইল নং-০১৭১৮৮৬৯২০২] ফকির মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম (২৫) শেখ রাজা মিয়া (৪৫) অন্যতম ছিলেন। এদের উপস্থিতিতেই ভিকটিম নারগিছ সুলতানা থানার অফিসার-ইন-চার্জের নিকট তার দোকান চুরির অভিযোগ নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু, মামলার বাদী কে হবেন? ভিকটিম বললেন, তার স্বামী হাজতে আছে। কয়েকদিন পর জামিন পাবেন। তিনিই মামলার বাদী হবেন। এমতাবস্থায়, তিনি মামলা না করেই শহিদুল মেম্বারের সাথে তার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। পত্রিকার প্রতিবেদনে বর্ণিত ওসির কোয়ার্টারে যাওয়া বা মাছ কাটার ছলে ধর্ষণ তো দূরের কথা ঐ দিন নার্গিছ শহিদুল মেম্বার কিংবা রাজা শেখের জানার বাইরে থানা ক্যাম্পাসের কোন স্থানেই যাননি।

পথিমধ্যে জনৈক জাহিদ, পিতা-ভনু মোল্লা, সাং- ইখড়ি, থানা-তেরখাদা এবং তার সহযোগী খুলনা ডিএসবি এর তালিকায় ১০ নম্বরে থাকা সন্ত্রাসী মশিকুল নারগিছকে ব্লাকমেইল করে বসে। এরা তার স্বামীকে প্রাণে মারাসহ অন্যান হুমকী দিয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরু্ধে তাকে ধর্ষণ করেছে মর্মে মিথ্যা অভিযোগ করতে বাধ্য করে। তারা তাকে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে ওসির বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ সম্বলিত অভিযোগ মোবাইলে রেকর্ড করে রাথে।

পরে মহিলা তার স্বামীর জামিনের জন্য খুলনায় গেলে উক্ত জাহিদুল ও মশিকুল মহিলাকে কয়েকজন সাংবাদিকের কাছে নিয়ে যায় এবং ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগের কাহিনী বর্ণনা করতে বাধ্য করে। পরে তাকে একটি মানবাধিকার অফিসে নিয়ে গিয়ে একটি কাগজে সই করিয়ে নেওয়া হয়।

এর পরদিন পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হলে মহিলা হতভম্ব হয়ে যান এবং এর প্রতিবাদ করেন। তার লিখিত প্রতিবাদ ০৮-০৬-২০১২ তারিখে দৈনিক ডেস্টিনি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

কেন এই মিথ্যা খবর? কেনই বা ইন্সপেক্টর মামুনর রশীদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী জাহিদুল ও মশিকুল লেখেছিল? মাশিকুল,পিং- নূরুল ইসলাম চৌধুরী,সাং-ইখড়ি,থানা-তেরখাদা ,জেলা-খুলনা ডিএসবি‘র তালিকাভূক্ত একজন সন্ত্রাসী যার নং- ১০ এবং তার বিরুদ্ধে তেরখাদা থানার ১৫ টি মামলা বর্তমানে বিজ্ঞ আদালতে বিচারাধীন আছে। সম্প্রতি মাশিকুলের বিরুদ্ধে তেরখাদা থানার মামলা নং-১৩ তাং-১৫-০৯-১১ সংক্রানে- অভিযোগ পত্র নং-৬৬ তাং-৩০-০৫-১২ ধারা ৩৪১/৩৯২/৪৬৯ দঃ বিঃ দাখিল করা হয়েছে।

সন্ত্রাসী মশিকুলের রাজনৈতিক সংযোগ রয়েছে যা হয়তো কেউই অবিশ্বাস করবেন না। মশিকুল তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য থানায় চাপ প্রয়োগ করেছিল। কিন্তু একজন তালিকাভূক্ত সন্ত্রাসীকে মামলা থেকে ওসি অব্যহিত দিতে চায়নি। এটাই ছিল, ওসির চরিত্র হণনের পক্ষে তার বড় কারণ। অন্য দিকে থানার অফিসারদের মধ্যেও ছিল বেশ গ্রুপিং। একটি পক্ষ চাইছিল ইন্সপেক্টর মামুনুলকে থানা থেকে সরাতে।

পুলিশের বিরুদ্ধে সংবাদ পত্রে যাচ্ছে তাই লেখা যায়। কারণ, এতে কিছুই হয় না। পুলিশের কোন পর্যায়েই প্রত্রিকার প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে না। অন্যদিকে সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের কোন জবাবদিহিতা নেই। মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর খবর প্রচারিত হলে কোন সাংবাদিক বা পত্রিকাকে প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে জবাবদিহিতার মধ্যে নিয়ে আসা যেতে পারে। প্রেস কাউন্সিলের সর্বোচ্চ শাস্তি হল পত্রিকা কর্তৃক বিজ্ঞপ্তি বা ফিরতি প্রতিবেদনের মাধ্যমে ক্ষমা চাওয়া। কিন্তু মিথ্যা বা অসত্য-অর্ধসত্য খবর প্রচারের ফলে কোন ব্যক্তির মান-সম্মান ও জীবন-জীবীকার যে ক্ষতি হয়, তা পূরণ করার কোন সুযোগ প্রেস কাউন্সিল আইনে নেই।

সাংবাদিকদের প্রতি দুর্ব্যবহার, তাদের গায়ে হাত তোলা বা মারপিট করার কারণে অনেক পুলিশ অফিসারের শাস্তি হয়েছে, অনেকের চাকরি চলে গেছে। কিন্তু মিথ্যা খবর প্রচারের দায়ে কোন সাংবাদিকের শাস্তি হয়েছে কিংবা কোন পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেছে, এমন কোন সংবাদ আমাদের জানা নেই। ‘জবাবদিহিতা’ নামক শব্দটি সম্ভবত সাংবাদিকতার ভূবনে অপ্রাসঙ্গিক।

পুলিশ যেন সমাজের উন্মুক্ত ডাস্টবিন। এখানে যে কেউ, যে কোন সময় ময়লা-আবর্জনা ফেলতে পারে। তবে ডাস্টবিনের সাথে পুলিশের পার্থক্য হল, শহরের ডাস্টবিন খালি করে ময়লা আবর্জনা ভাগাড়ে নেওয়ার লোক থাকে। কিন্তু পুলিশকে আবর্জনামুক্ত করার কেউ নেই।

ছবি সূত্র- ইন্টার্নেট