ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

বসবাসের উপযোগী একটি নিরাপদ সমাজ প্রাপ্তির জন্য আমরা সবাই উদ্বিগ্ন। কিন্তু, কিভাবে এই সমাজ নিরাপদ হবে তা হয়তো কেউই সঠিকভাবে জানি না। আর এ জন্যই সমাজে এত তর্ক, এত বিতর্ক; যুক্তি, পাল্টা যুক্তি।

একজন সংস্কারবাদী পুলিশ অফিসার হিসেবে আমি বিশ্বাস করি—– the more of the same cannot bring about any change. পুলিশিং একটি আর্ট ও একটি বিজ্ঞান। এটা চর্চা করতে হয়, অনুশীলন করতে হয়। এর উপর গবেষণা করতে হয়। কিন্তু আমাদের কি সেই গবেষণা রয়েছে? সন্ত্রাস কবলিত কাল ও স্থান থেকে দেশ ও সমাজকে মুক্ত করার জন্য গবেষণা জাতীয় কোন কিছু আমাদের দেশে কখনো হয়েছিল কী?

রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিকদের মনে নিরাপত্তাবোধ তৈরি করা। রাষ্ট্রের পক্ষে এই কাজটি করার দায়িত্ব পুলিশের উপর বর্তায়। যেহেতু নিরাপত্তাবোধ একটি মানসিক ধারণা আর ধারণা সমাজ, কাল ও স্থান ভেদে পরিবর্তিত হয়, তাই নাগরিক মানসের পরিবর্তনের সাথে সাথে পুলিশকেও পরিবর্তিত হতে হয়; পুলিশকে পরিবর্তন করতে হয়।

কিন্তু এখন পর্যন্ত আমাদের পুলিশ-ব্যবস্থায় সে সংযোজন-বিয়োজন হয়েছে, তার কোনটিই গবেষণার ফসল ছিল না। আমরা চেয়েছি শুধু তাৎক্ষণিকভাবে গুরুতর অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে। এই গুরুতর বা অস্বস্থিকর অবস্থা কেন সৃষ্টি হল, এই অবস্থার পিছনে কে, কারা বা কোন কোন নিয়ামকগুলো দায়ী তা আমরা তলিয়ে দেখিনি।

জননিরাপত্তা ও পুলিশিং নিয়ে দীর্ঘ মেয়াদী তো দূরের কথা, মধ্যমেয়াদী কোন পরিকল্পনাও আমাদের নেই। আমরা চাই সকালে গাছ লাগিয়ে, বিকালে তার ফলভোগ করতে। অবশ্য এতে গাছ আমাদের কিছু ফল দেয়, সে ফল খেতে মিষ্টিও লাগে, কিন্তু সেই ফল খেয়ে যে আমাদের আয়ু শেষ হচ্ছে, তা আমরা কি বুঝতে পারি? বস্তুত, বাংগালীরা কোন দিন মুত্যু আর অপমৃত্যুর মধ্যে তাত্ত্বিক পার্থক্য করতে পারেনি।

মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য অধিকার সীমীত করার কাজটি মোটেই সহজ নয়। যে কোন দৃষ্টিকোণ থেকেই এই কাজকে সমালোচনা করা যায়, আবার সমর্থনও করা যায়। এটা কোনভাবেই সমালোচনার ঊর্ধ্বে হতে পারে না। বলা বাহুল্য, পুলিশই একমাত্র সংস্থা যাকে জনগণ নিজেদের স্বার্থেই নিজেদের কিছু কিছু অধিকার কিছু কিছু সময়ের জন্য ক্ষু্ন্ন করার অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু এই অনুমতি যে উপায়ে দেওয়া হয়েছে, সেই উপায় বর্তমানে অচল। আমাদের সেই উপায় বদলাতে হবে।

আমাদের ঔপনিবেশিক আদলে গঠিত ও অগণতান্ত্রিক দর্শনে পরিচালিত পুলিশ বাহিনীর সনাতনী মনোভাবের মাঝখানে যা-ই ছেড়ে দিবেন, তাই তৎক্ষণাতৎ একটি কৃঞ্চগহব্বরে তলিয়ে যাবে। পুলিশের লোকবল বৃদ্ধি, ইউনিট বৃদ্ধি, লজিস্টিক বৃদ্ধি ইত্যাদির মধ্যে কোন নতুনত্ব নেই। পরিবর্তনের কোন উপাদান নেই। তাই যাই কিছু করি না কেন, সর্বপ্রথম আমাদের পুলিশিং সংস্কৃতিতে নতুনত্ব আনতে হবে; পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে আসতে হবে।

খাবারের প্লেটে শুধু ভাত দিলে বা শুধু গোস্ত দিলেই সেই খাবার সুষম হয় না। খাবার সুষম না হলে আমাদের শরীরের পুষ্টিও ঠিক মতো হয় না। খাবারকে সুষম করতে হলে আমাদের ছয়টি খাদ্যগুণের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। যে বাচ্চারা শুধু ভাত বা জিলিপি খেতে চায়, তাদের যদি আপনি শুধু ভাত বা জিলিপি দিতেই থাকেন, তাহলে সেই বাচ্চাদের বৃদ্ধি কী সুষম হবে? সে কি নিজেকে ও সমাজকে কিছু দিতে পারবে? তাই, শিশুর সুষম বৃদ্ধির জন্য তাকে একই বস্তুর অধিক পরিমাণে নয়, বরং সকল খাদ্যগুণ সম্পন্ন ভিন্ন ভিন্ন বস্তু দিতে হবে।

পুলিশের ক্ষেত্রেও তাই। যদি আমরা একটি নিরাপদ ও সুস্থ সমাজ গঠন করতে চাই, পুলিশকে আমাদের আরো অনেক কিছুই দিতে হবে। তবে সেই দেওয়া একই জিনিসের অধিক পরিমাণে দেওয়া নয়। আমাদের পুলিশকে শুধু লোকবল, অস্ত্রবল, গাড়িঘোড়া ইত্যাকার একই বস্তু সরবরাহ করলেই চলবে না। তাদের একটি নতুন, গণতান্ত্রিক তথা জনসম্পৃক্ততার সংস্কৃতি উপহার দিতে হবে যার মধ্যে কার্যকর পুলিশিং করার যাবতীয় উপাদান থাকবে এবং তা সুষম মাত্রায় থাকবে।