ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

গত ২৯ মে ২০১২ তারিখে ঢাকার আদালত পাড়ায় এক তরুণীর শ্লীলতাহানীর অভিযোগ ওঠে স্থানীয় পুলিশের বিরুদ্ধে() । কোর্টে মামলার সাক্ষ্য দিতে আসা একটি পরিবারের কর্তাকে পুলিশ মোটর সার্কেল চুরির অভিযোগে গ্রেফতার করে স্থানীয় পুলিশ ক্লাবের ভিতরে নিয়ে গিয়ে মারপিট করে বলে অভিযোগ করা হয়। ভিকটিমের মেয়ে ও স্ত্রীকেও নাকি পুলিশ ক্লাবের মধ্যে নিয়ে যায়। কয়েকজন পুলিশ সদস্য ভিকটিমের মেয়েকে (সেও পরে কথিত ভিকটিম হয়) ধর্ষণের চেষ্টা করে। তাকে নাকি জোর করে ধরে গালে মুখে চুমু খাওয়ার চেষ্টা করে, তার গলার হার খুলে নেয়। এটা ছিল সেই দিনের সকালের খবর।

বিকেলে কয়েকজন আইনজীবী ও আইনজীবীর সহযোগীর কাছে মেয়েটি অভিযোগ করে। তারা এক পর্যায়ে পুলিশের সাথে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে। তারও পরে পুলিশ আইনজীবীসহ তাদের স্থানীয় থানায় নিয়ে যায়। এই সময় তরুণী ও তার মাকে জোরপূর্বক কয়েকজন নারী পুলিশ থানার গাড়িতে তোলে। আইনজীবীরা স্বেচ্ছায় গাড়িতে উঠতে না চাইলে তাদের জোর করে ওঠানো হয়। এক পর্যায়ে পুলিশ তাদের উপর দু-চার ঘা মেরেও বসে। এক আনসার সদস্য, ভিডিওতো দেখা গেছে, আইনজীবীকে গাড়িতে ওঠানোর সময় তার নীচ দিকে লাঠি দিয়ে গুতো মারছে। পরে আইন ও শালিস কেন্দ্রের পরিচালক সুলতানা কামালের মধ্যস্ততায় ঘটনার আপাতত নিষ্পত্তি ঘটে।

কিন্তু পুলিশের উপর যৌন হয়রানীর অভিযোগটি তখনও তাজা থাকে। তরুণী থানায় মামলা করে। আর মহামান্য হাইকোর্ট একটি রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে লালবাগ ডিভিশনের ডেপুটি পুলিশ কমিশনারসহ আট পুলিশ সদস্যকে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয় () । পরবর্তীতে আদালত বিষয়টির অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন প্রদানের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেয়। নির্দেশ মতো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (পুলিশ অনুবিভাগ) কাজল ইসলামকে আহ্বায়ক করে দুই সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে করা হয় । কমিটির অন্য সদস্য ছিলেন আইন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মিজানুর রহমান খান। তদন্ত কমিটির প্রদত্ত প্রতিবেদন গত ১৮ জুলাই ২০১২ তারিখে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে মহামান্য হাইকোর্টে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে() ।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন মতে, তরুণীকে পুলিশ ক্লাবের ভেতরে নেওয়া হয়নি, তিনি মায়ের সঙ্গে ফটকের বাইরে ছিলেন। সেখানে অনেক লোক জড়ো হয়। জনসমক্ষে শ্লীলতাহানির ঘটনা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তবে ওই সময় পুলিশ মা-মেয়েকে প্রহার করেছে। ওই তরুণী ও তাঁর মা ছাড়া শ্লীলতাহানির অভিযোগের বিষয়ে আর কোনো নিরপেক্ষ সাক্ষী পাওয়া যায়নি। তবে ওই তরুণী ও তাঁর মাকে মারধর, ধস্তাধস্তির ঘটনাকে পুলিশের ‘অপেশাদারমূলক’ আচরণ বলে কমিটি মন্তব্য করেছে।

উল্লেখ্য, এই তদন্ত কমিটি ছিল মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশ মতো গঠিত একটি বহির্বিভাগীয় কমিটি। এখানে থানা পুলিশ তো দূরের কথা, পুলিশ প্রধানেরও কোন ভূমিকা ছিল না। অন্যদিকে, পুলিশকে নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয়ের বাইরেও আইন মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিবও ছিলেন অন্যতম সদস্য। তাই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনকে পুলিশের প্রতি পক্ষপাতিত্বপূর্ণ বলে চালিয়ে দেওয়ার সুযোগ সীমীত।

কমিটির প্রতিবেদনে পুলিশের বিরুদ্ধে আনিত সব অভিযোগ প্রমাণিতও হয়নি, অপ্রমাণিতও হয়নি। আর আদালতে যে প্রতিবেদন গেছে তাতে হয়তো দায়েরকৃত রীটের উপর আদালতের সিদ্ধান্ত আসবে। কিন্তু নিম্ন আদালতের কাছে তরুণীর যৌন হয়রানীর অভিযোগের নিষ্পত্তি এখনো হয়নি। তাই এই সম্পর্কে শেষ কথা বলার সময় আসেনি এবং তা উচিতও নয়।

কমিটির প্রতিবেদনে যৌক্তিকভাবেই পুলিশের অপেশাদারিত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ, মহিলা, শিশু, অপ্রকৃতিস্থ, সংখ্যালঘু, রাজনৈতিক আন্দোলনের নেতা-কর্মী প্রমূখদের প্রতি দায়িত্ব পালনকালে আমাদের পুলিশ প্রত্যাশিত পেশাদারিত্ব প্রদর্শন করতে পারেনি। এজন্য পুলিশের প্রতিটি কর্মই কোন না কোনভাবে বিতর্কের সূচনা করে। আইনগত কাজটি, আইনগতভাবে এবং সঠিক কাজটি সঠিক উপায়ে করলেও বাংলাদেশ পুলিশ সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়।

আমি মনে করি, অপেশাদারিত্বের চিকিৎসা আছে। পুলিশকে প্রয়োজনীয় শিক্ষণ-প্রশিক্ষণ দিয়ে, দরকার মতো লজিস্টিকস সরবরাহ করে, প্রয়োজনীয় আইন-বিধি ও নীতির পরিবর্তন, পরিবর্ধন কিংবা প্রয়োজনমতো নতুন আইন প্রবর্তন করে পুলিশকে পেশাদার বানানো যায়। অনেক দেশই তাদের পুলিশকে পতিত অবস্থা থেকে তুলে এনে জনতার সম্মানের আসনে বসাতে পেরেছে। চেষ্টা অব্যহত রাখলে আমরাও তা পারব। কিন্তু পশুত্বের কোন চিকিৎসা নেই। পশুদের মানুষ বানানো যায় না। বাংলাদেশ পুলিশের মধ্যে অপেশাদারিত্ব আছে, কিন্তু পশুত্ব নেই। তাই বাংলাদেশ পুলিশের সংস্কার সম্ভব; তাদের পেশাদার করে গড়ে তোলা সম্ভব।

সূত্র:
১। http://www.prothom-alo.com/detail/date/2012-05-30/news/261852
২। http://www.bdnews24.com/bangla/details.php?id=195481&cid=2
৩। http://www.prothom-alo.com/detail/date/2012-07-20/news/275245