ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। পুলিশের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, অপহরণ, হত্যা ইত্যাকার জঘন্য অপরাধের অভিযোগ করা যায়। আমাদের দেশেই শুধু নয়, ইউরোপ, আমেরিকাসহ পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতেও পুলিশের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ করা হয়। পুলিশের বিরুদ্ধেই অহেতুক কারণে অভিযোগ করা মানুষের একটি সার্বজনিন প্রবণতা। মানুষ যাচ্ছেতাই ব্যবহার করতে পছন্দ করে। কিন্তু পুলিশ মানুষের যাচ্ছেতাই ব্যবহারের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে। এটা রাস্তা উল্টো দিকে চলাচল কিংবা নিষিদ্ধ স্থানে গমন থেকে শুরু করে নিষিদ্ধ বস্তু সেবন পর্যন্ত বিস্তৃত।

পুলিশের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগগুলোর সিংহভাগই নগণ্য প্রকৃতির। এই সব তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনা নিয়ে আদালতে দেওয়ানী মামলা রুজু করে যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি মামলাবাজ সমাজও সময় নষ্ট করতে উৎসাহী নয়। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের পুলিশের মতো আমেরিকার পুলিশও দুর্নীতির চেয়ে রুঢতা, আক্রমণাত্মক ব্যবহার, অভিযুক্তদের সাথে খারাপ আচরণ ইত্যাকার অভিযোগেই বেশিমাত্রায় অভিযুক্ত হয়(1) ।

আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ বিভাগের অফিসারদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ ফৌজদারি মামলার পাশাপাশি দেওয়ানী বা ক্ষতিপূরণের মামলাও করে থাকে। এই দেওয়ানী মামলাগুলোর একটি অংশ ফেডারেল আইন ভঙ্গের জন্য হয় এবং এগুলোর প্রতিকারের জন্য মানুষ ফেডারেল আদালতেই যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিসের এক হিসেব মতে ১৯৮৫ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে তাদের কাছে সারা দেশের পুলিশের বিরুদ্ধে মোট ১৫,২৭৯ টি দেওয়ানী অভিযোগ জমা পড়েছিল। এই সব অভিযোগ যাচাই বাচাই করে জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট মাত্র ৪২ টি অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়ে আদালতে নিয়ে যায়। আদালতে নেয়া এই সব অভিযোগের অর্ধেকেই আবার পুলিশের পক্ষে রায় দেওয়া হয়। অর্থাৎ আমেরিকার মতো একটি মামলাবাজ সমাজেও পুলিশের বিরুদ্ধে আনিত দেওয়ানী অভিযোগগুলো মাত্র ৮% আদালতের রায়ে সত্য প্রমাণিত হয়(2) ।

অস্ট্রেলিয়ার পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ উত্থাপিত হয় সেগুলোর ৮০% অভিযোগই থাকে ভিত্তিহীন, বিরক্তিকর ও হয়রানীমূলক। মাত্র ২০% অভিযোগের আনুষ্ঠানিক তদন্ত হয়। অন্যদিকে যে সব অভিযোগের আনুষ্ঠানিক তদন্ত করানো হয়, সেই সব অভিযোগের প্রায় ৬০% ক্ষেত্রে পুলিশের থাকে নির্দোষ(3) ।

ব্রিটেনের পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে একটি স্বাধীন অভিযোগ কমিশনের কাছে দরখাস্ত করা যায়।২০০৪/০৫ সালে অর্থাৎ কমিশন গঠনের প্রথম বছর পুলিশের বিরুদ্ধে সর্বমোট অভিযোগ জমা পড়েছিল ২২,৮৯৮ টি। ২০০৯/১০ সালে ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়ে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ৩৩,৮৫৪ টি। গত বছর, মানে ২০১০/১১ সালে এই সংখ্যা কিঞ্চিৎ কমে হয়েছিল ৩৩,০৯৯টি। এখানে বছরে প্রতি এক হাজার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে গড়ে ২২৫টি অভিযোগ জমা পড়ে(4)।

বাংলাদেশ পুলিশ এই ধারা থেকে ভিন্ন কিছু নয়। প্রতিনিয়তই পুলিশের বিরুদ্ধে মৌখিক, লিখিত ও মিডিয়া ভিত্তিক অভিযোগ দায়ের চলছে। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের সিকিউটি সেলে পুলিশের বিরুদ্ধে করা দরখাস্তগুলোর পরিসংখ্যান সংরক্ষিত থাকে। সিকিউটি সেলে প্রতি বছর পুলিশের বিরুদ্ধে কতগুলো অভিযোগ জমা পড়ল, এগুলোর কতগুলোর তদন্ত হল, তদন্ত শেষে কি ব্যবহস্থা নেওয়া হল এবং সর্বশেষ কতগুলোর তদন্ত মূলতবী থাকল তার একটি পরিসংখ্যান পুলিশের বার্ষিক প্রশাসনিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

২০১১ সালে পুলিশ হেডকোয়ার্টাসের সিকিউরিটি সেলে মোট ২০ হাজার ৩০৫টি অভিযোগ জমা পড়েছিল(5) । পুলিশের মাঠ পর্যায়ের ইউনিটগুলোতেও ইউনিট প্রধানদের কাছে পুলিশের বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ জমা পড়ছে। কিন্তু এগুলোর সঠিক পরিসংখ্যান কোন স্থানেই সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয় না। যদি মাঠ পর্যায়ের ইউনিটগুলোসহ সিকিউরিটি সেলে প্রাপ্ত অভিযোগের সংযোগ ঘটানো হত, তাহলে এই সংখ্যাটি যে রীতিমত বড়সড় হত তা সহজেই অনুমেয়।

রচনা সূত্র:

1. Changing Policing Theories for 21st Century Societies by Charles Edwards,p-270
2. Forces of Deviance – Understanding the Dark Side of Policing, Second Edition by Victor D. Kappeler, Ricard D. Sluder, Geoffrey P. Alpert Waveland Press, Inc ; ISBN- 978-0-88133-983-3
3. http://www.aic.gov.au/documents/F/B/5/%7BFB534766-8363-48FC-8290-
07024CDE095A%7Dti141.pdf
4. http://www.ipcc.gov.uk/en/Pages/stats.aspx
5. http://jugantor.us/enews/issue/2012/06/13/news0450.htm