ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

আমাদের দেশে পুলিশী জিজ্ঞাসাবাদ বরাবরই একটি বিতর্কীত বিষয়। পুলিশ-হেফাজতে কোন আসামীকে দেওয়ার প্রশ্ন উঠলেই অভিযুক্তরা আঁৎকে ওঠে, পত্রপত্রিকা সরব হয় এবং নির্যাতনের দায়ে পুলিশ প্রায়শই অভিযুক্ত হয়। দেশের সাধারণ মানুষের জানাশোনার মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদের একটিই মাত্র মাত্রা আছে। তাহল তৃতীয় মাত্রা। বলাবাহুল্য বিশ্বব্যাপী ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় থার্ড ডিগ্রি বা তৃতীয় মাত্রা বরাবরই প্রকাশ্য অস্বীকৃত অথচ গোপনে অনুসৃত জিজ্ঞাসাবাদ কৌশল।

সাধারণত থার্ড ডিগ্রি বলতে পুলিশী জিজ্ঞাসাবাদে নির্যাতনমূলক পদ্ধতি অবলম্বন করাকেই বোঝায়। কিন্তু থার্ড ডিগ্রি কী তা জানলেও আমাদের পুলিশ সদস্যদের অনেকেই ফার্স্ট ডিগ্রি ও সেকেন্ড ডিগ্রি কী তা জানেন না।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ উদ্ঘাটনের ক্ষেত্রে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ বিভাগগুলো তিন ধরণের পদ্ধতি অবলম্বন করত। কালক্রমে এই পদ্ধতিগুলোকে তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়। এই শ্রেণিবিভাগ তৈরিতে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেছিলেন আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াসিনটন ডিসির পুলিশ-প্রধান রিচার্ড এইচ. সিলভাস্টার। ইনি ১৮৯৮ থেকে ১৯১৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৭ বছর ওয়াসিনটন ডিসির পুলিশ প্রধান ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তিনিই থার্ড ডিগ্রি শব্দটির প্রচলন করেন।

সিলভাস্টারের মতে গ্রেফতার হল প্রথম ডিগ্রি, জেলখানায় আটক বা দ্বীপান্তর হল দ্বিতীয় ডিগ্রি এবং জিজ্ঞাসাবাদ হল তৃতীয় ডিগ্রি। এই অর্থে পুলিশী হেফাজতে যে কোন জিজ্ঞাসাবাদকেই থার্ড ডিগ্রি বলা হয়।

আমাদের দেশে তৃতীয়মাত্রার জিজ্ঞাসাবাদ বড়ই পরিচিত, বড়ই বিতর্কিত। পুলিশের আইন-বিধি বা নির্দেশাবলীতে জিজ্ঞাসাবাদের সময় নির্যাতনমূলক পদ্ধতি অবলম্বনের উপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ তো নয়ই, পৃথিবীর কোন দেশেই গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে কোন পর্যায়েই নির্যাতনের সপক্ষে আইন নেই। কিন্তু এতদসত্ত্বেও সারা বিশ্বের পুলিশ প্রতিনিয়তই এই অভিযোগে অভিযুক্ত হচ্ছে।

অনেকে পুলিশ হেফাজতে আসামীকে কঠিন নির্যাতনের মাধ্যমে স্বীকারোক্তি আদায় করাকে সমর্থন করেন। এক শ্রেণির পুলিশ অফিসার এটাকে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য অপরিহার্য বলেও মনে করে। জনগোষ্ঠীর এক বিরাট অংশ প্রকাশ্যে না হলেও অপ্রকাশ্যে, অবচেতনে থার্ড ডিগ্রিকে সমর্থন করেন। অনেক সময় গ্রেফতারকৃত আসামীর সাথে মানবিক আচরণে প্রত্র পত্রিকাগুলোও বিরূপ প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রকাশ করে। বলা হয়, ‘পুলিশ আসামীকে জামাই আদোরে রেখেছে’।

তবে অবস্থা যাই হোক, থার্ড ডিগ্রির জিজ্ঞাসাবাদ কখনই কাম্য হতে পারে না। নির্যাতন করে আদায়কৃত স্বীকারোক্তির মাধ্যমে একটি মামলার জোড়াতালিমার্কা তদন্ত সম্পন্ন করা যায়। তবে স্বীকারোক্তির সপক্ষে বস্তুগত আলামত উদ্ধার বা অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা না হলে সেই স্বীকারোক্তি আদালতে কোন কাজই আসে না। এই জাতীয় মামলার চূড়ান্ত পর্যায়ে আসামীদের সাজা হয় না।

স্বীকারোক্তির মাধ্যমে কোন মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হলে, সেই মামলায় আসামীদের যদি সাজা হয়, তাহলে বুঝতে হবে সেই স্বীকারোক্তি ছিল স্বেচ্ছাপ্রণোদিত। স্বেচ্ছাপ্রণোদিত স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য কোন আসামীকে নির্যাতন করতে হয় না। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পেশাদারিত্বপূর্ণ মনোভাব নিয়ে অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বেচ্ছাপ্রণোদিত স্বীকারোক্তি আদায় করা সম্ভব। (২০/০৭/২০১২)