ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

বাংলাদেশে স্বল্প পরিচিত হলেও লাইডিটেকটর বা পলিগ্রাফ একটি বহু পুরাতন, বহুল আলোচিত ও সমালোচিত অনুসন্ধান পদ্ধতি। লাইডিটেকটর যন্ত্র আবিষ্কৃত হয় বিংশ শতাব্দির গোড়ার দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। মার্কিন জগতে এই পদ্ধতিটি বহুল ব্যবহৃত হলেও বিশ্বব্যাপী তদন্তকাজে এটা এখনও উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করতে পারেনি।

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল পুলিশ এজেন্সিগুলো, যেমন, ফেডারেল বুরো অব ইনভেস্টিগেশন, সেন্ট্রাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি এবং রাষ্ট্রীয় পুলিশ যেমন, লজ এনজেলস পুলিশ বিভাগের তদন্তকার্য ও নতুন অফিসার নিয়োগের পূর্বে পলিগ্রাফ পরীক্ষার প্রচলন রয়েছে।

লাই ডিটেকর আবিষ্কারের কৃতিত্বের অন্যতম ভাগীদার হলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অংগ রাজ্যের বার্কলি পুলিশ বিভাগের প্রধান আগস্ট ভলমার ১৯২১ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল বিভাগের ছাত্র জন অগাস্টাস লারসনের সহায়তায় লাইডিটেকটর তৈরি করেন। ভলমারই সর্বপ্রথম তার পুলিশ বিভাগের ফৌজদারি অপরাধের তদন্ত কাজে লাই ডিটেকটর ব্যবহার করেন। দীর্ঘ দিন বার্কলি পুলিশের প্রধান থাকাকালীন ভলমার সন্দেহভাজন অপরাধীদের জিজ্ঞাসবাদের ক্ষেত্রে লাইডিটেকটর ব্যবহারকে জনপ্রিয় করার কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। তবে গত শতাধিক বছরে লাইডিটেকটর প্রযুক্তিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। অতি সরল যন্ত্র সর্বশেষ ডিজিটাল যন্ত্র ও কম্পিউটার প্রযুক্তির সাথে যুক্ত হয়েছে।

লাইডিটেকটরের সাহায্যে জিজ্ঞাসাবাদ প্রক্রিয়াটির পুরোটাই অভিযুক্তের মনো-দৈহিক অবস্থার সাথে সম্পর্কিত। তাই মেডিকেল বিজ্ঞানের ছাত্র জন অগাস্টাসের প্রচেষ্টাই আবিষ্কারের ক্ষেত্রে মূখ্য ভূমিকা পালন করেছিল। পলিগ্রাফ যন্ত্রে জিজ্ঞাসাবাদকালীন সন্দেহভাজন ব্যক্তির রক্তচাপ, নাড়ির গতি, শ্বাস-প্রশ্বাসের পরিবর্তন এবং চামড়ায় তড়িৎ প্রবাহের পরিবর্তন লক্ষ্য করা হয়। একজন স্বাভাবিক মানুষ কোন বিষয়ে বা কোন প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিলে তার মনো-দৈহিক অবস্থা যা থাকে, সে যদি মিথ্যা কথা বলে বা সত্য গোপন করে তবে তার মনো-দৈহিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে যা তার রক্তচাপ, নাড়ির গতি বা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে প্রকাশিত হবে। প্রক্রিয়াটি পরিচালনার জন্য পুলিশ অফিসারদের বিশেষ মনো-দৈহিক, কারিগরী ও প্রযুক্তি জ্ঞান অর্জন করা জরুরী।

সন্দেহ নেই, আবিষ্কার হিসেবে পলিগ্রাফ অনন্য। কিন্তু শতাব্দী কাল ধরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হলেও ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় লাইডিটেকটর তেমন কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি। অথচ মাত্র সিকি শতাব্দী আগে ( ১৯৮৭ সালে ) শুরু হওয়া ডিএনএ টাইপিং বর্তমানে ফৌজদারি অপরাধের তদন্ত ক্ষেত্রে একটি নীতিনির্ধারণী পদ্ধতিতে পরিণত হয়েছে।

এর কারণ হল, লাইডিটেকটর পরীক্ষার ফলাফল বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ভরযোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। ১৯৯৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ৪২১ জন মনোবিজ্ঞানীর পরিচালিত এক জরিপে নির্ধারিত হয়েছে যে জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষেত্রে পলিগ্রাফের সঠিকতা হচ্ছে ৬১%। কিন্তু এই হার দৈবচয়নের হারের চেয়ে সামান্য বেশি। (দৈবচয়নে কোন প্রশ্নের উত্তর সত্য ও মিথ্যা হওয়ার সম্ভাবনা শতরকা ৫০-৫০)। ২০০৩ সালে আমেরিকার জাতীয় বিজ্ঞান একাডেমি (এনএএস) কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে পলিগ্রাফের অধিকাংশ পরীক্ষাই অনির্ভরযোগ্য, অবৈজ্ঞানিক ও পক্ষপাতদুষ্ট বলে মত প্রকাশ করা হয়েছে।

পলিগ্রাফ বা লাইডিটেকটরের মাধ্যমে আদায়কৃত তথ্য সাক্ষ্য হিসেবে আদালতে এখনও সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক রাজ্যে চাকুরিতে প্রবেশের সময় পলিগ্রাফি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়ার শর্ত দিলেও খোদ যুক্তরাষ্ট্রের অনেক রাষ্ট্র চাকুরিতে নিয়োগের শর্ত হিসেবে পলিগ্রাফি পরীক্ষাকে আইন করে নিষিদ্ধ করেছে।

ইউরোপের দেশগুলোতেও পলিগ্রাফের ব্যবহার অনির্ভরযোগ্য বলে বিবেচিত হয়। জার্মানীর ফেডারেল কোর্ট পলিগ্রাফ পরীক্ষার ফলাফল আদালতে অগ্রহণযোগ্য বলে রায় দিয়েছে। কানাডায় পলিগ্রাফ তদন্ত ও কিছু কিছু ক্ষেত্রে কর্মস্থলে নিয়োগের জন্য ব্যবহৃত হয়। কিন্তু কাডার সুপ্রিম কোর্ট পলিগ্রাফের ফলাফল আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও লাইডিটেকটরের ফলাফল আদালতে গ্রহণযোগ্য নয়।

বাংলাদেশে দেশে পলিগ্রাফের ব্যবহার এখনো শুরু হয়নি। র‌্যাপিড একশন ব্যাটালিয়নস ও সিআইডির কাছে লাইডিটেকটর যন্ত্র আছে বলে শোনা গেলেও অদ্যাবধি এর কোন উল্লেখযোগ্য ব্যবহার প্রচার মাধ্যমে আসেনি। অন্যদিকে, বাংলাদেশের সাক্ষ্য আইন পাশ্চাত্যের সাক্ষ্য আইনের চেয়ে অনেক বেশি অনমনীয় ও রক্ষণশীল। তাছাড়া লাইডিটেকটরের মাধ্যমে সংগৃহীত সাক্ষ্য-প্রমাণ এখন পর্যন্ত আদালতের হাজির করা হয়নি। তাই এই ব্যাপারে আদালতের মনোভাব জানার সুযোগ আসেনি।

তবে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দুর্বল হওয়ায় লাইডিটেকটরের ব্যবহার বাংলাদেশে শুরু করার ক্ষেত্রে সব দিক ভালভাবে বিবেচনা করা দরকার। হস্তরেখা বা ডিএনএ টাইপিং এর মতো যেহেতু আদালতে পলিগ্রাফ গ্রহণযোগ্য নয়, তাই সাধারণ পুলিশ অফিসারদের জন্য একটি অতি জটিল মনো-দৈহিক পরীক্ষার প্রচলন করা বাংলাদেশের জন্য সহজসাধ্য ও অর্থসাশ্রয়ী হবে কিনা তাও ভেবে দেখা দরকার।

সূত্র- উইকিপিডিয়া