ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

দক্ষিণ সুদানের ওয়াউ রাজ্যের উপকণ্ঠে গবাদী পশুর ক্যাম্প স্থাপন করেছিল একদল দারফুরিয়ান ব্যবসায়ী। এরা একাধারে পশু পালক ও পশু ব্যবসায়ী। এরা অনেকটাই যাযাবর। পশুর পাল নিয়ে গোটা মধ্য আফ্রিকার এক প্রান্ত থেকে অন্য পান্তে ছুটে চলে। নিজেদের পশুগুলো গোচাণভূমিতে লালন পালন করে ও স্থানীয় বাজারে বিক্রয় করে।

এই ব্যবসায়ীদের মধ্যে হাসান নামে একজনের সাথে আমার বেশ সখ্য গড়ে ওঠে। হাসান আরবী ভিন্ন অন্য কোন ভাষা জানে না। আমি আরবী জানি না। কিন্তু প্রতি সপ্তাহেই আমাদের দেখা হত। হাসান গল্প বলতো, আমি শুনতাম। আমাদের গল্প বলা চলত অনেকটাই ইশারায়, আকারে ও ইঙ্গিতে। তবে, মাঝে মধ্যে আমাদের আরব সহকর্মীগণ সাথে থাকলে হাসানের সাথে আলাপে বেশ মজা হত। এক্ষেত্রে জর্ডানের মোস্তফা, মিশরের গাফফার প্রমূখ আমাকে প্রায়শই সাহায্য করতো। তা ছাড়া আমাদের সাথে থাকতো দোভাষীগণ যাদের ইউএন নিযুক্তি ছিল ‘ল্যাংগুয়েজ এসিসটেন্ট’ বা ‘ভাষা সহকারী’।

হাসান ছিল মূলত ভেড়া ব্যবসায়ী। ভেড়া জাতীয় সকল প্রাণিকেই আরব অঞ্চলে খারুফ বা খারু বলে। সুদানে থাকাকালীন আমি তিন প্রকারের খারুফ দেখেছিলাম। প্রথম প্রকার আমাদের দেশের ভেড়াগুলোর মতো। দ্বিতীয় প্রকার খারুফের লেজ বেশ লম্বা। দূর থেকে পিছনের অংশে তাকালে মনে হবে একটি খেকশিয়াল বা নেকড়ে। লেজের উপর লম্বা লম্বা লোম। অন্যপ্রকার খারুফের লেজও লম্বা। তবে লেজের এক অংশ গোল। ছোটকালে গল্প শুনতাম, এই লেজের গোল অংশটি নাকি দুম্বার জ্যান্ত অবস্থাতেই কেটে খাওয়া যায়। পরে এটা আবার আগের মতো পূরণ হয়। কিন্তু, এটা আদৌ সঠিক নয়। তা ছাড়া কোন জ্যান্ত পশুর কোন অংশ বিচ্ছিন্নভাবে কেটে ভক্ষণ করা হালালও নয়।

একদিন হাসানের দুম্বা বা খারুফের খোয়াড়ে গেলাম তার পশুগুলো দেখতে। প্রায় শতাধিক দুম্বা নিয়ে তার এক বিরাট দুম্বার পাল। প্রতিদিনই কোন না কোন দুম্বা বাচ্চা দিচ্ছে। আমি যেদিন সেখানে গেলাম, সেই সময় তার খোয়াড়ে কমপক্ষে ১০টি দুম্বাকে ছোট ছোট বাচ্চাসহ দেখেছিলাম।

হাসানের ভেড়ার পালের মধ্যে বেশি কিছু পাঠা ভেড়া রয়েছে। এদের বয়সও উল্লেখ করার মতো। মর্দা ভেড়ার মাথায় প্রায় দুই গজ লম্বা লম্বা বাঁকানো, পেছানো বাহারী শিং। বিশালদেহী খারুফ বাবার অন্ডকোষ দুটো লক্ষণীয়। একটি বয়স্ক মর্দা খারুফকে দূর থেকে দেখলে হিংস্র বলে ভয় লাগতে পারে। কিন্তু এরা অত্যন্ত নিরীহ প্রাণী। খারুফের বাচ্চাগুলো দেখতে খুবই সুন্দর।

খারুফকে দেখলে মনে হবে এরা বড়ই অস্তিচর্মসার। কিন্তু এদের শারীরিক গঠনেই এমন। জবাই করা খারুফের উপর থেকে চামড়া সরালে চর্বি ছাড়া আর কিছুই দেখা যাবে না। মরুভূমির প্রাণি বলে এদের শরীরে অল্প খাবারেই চর্বি জমতে পারে।

খারুফের মাংস দক্ষিণ সুদানে বেশ দামী। মাত্র ৬/৭ সুদানিজ পাউন্ডে এক কেজি গরুর মাংস মিললেও এক কেজি খারুফের মাংস কিনতে ১৫-২০ পাউন্ড লাগত। ভেড়া বা ছাগলের মাংসে বিশেষ গণ্ধ আছে। কিন্তু খারুফের মাংস অত্যধিক গন্ধযুক্ত। অন্যদিকে বেশি পরিমাণ চর্বির থাকায় আমরা খারুফের মাংস সাধারণত এড়িয়ে চলতাম। সুদান থেকে দেশে ফিরেছি আজ প্রায় চার বছর হল। কিন্তু দারফুরিয়ান দুম্বা ব্যবসায়ী হাসান ও তার খোয়াড়ের দুম্বাগুলোর কথা আমার এখনও মনে পড়ে।