ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

গত ১২ আগস্ট/২০১২ তারিখে বিডিনিউজ২৪ ডটকম ব্লগে জনাব এইচ এম মহসীন তার ব্লগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ তথা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির সাথে বাংলাদেশের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেছেন।(লিংক) এ জন্য নবাগত লেখককে ধন্যবাদ। তার প্রোফাইল থেকে জানা যায় তিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরী রাজ্যের সেন্ট লুইস শহরের বসবাস করছেন।[লিংক] তিনি তার নিজ অভিজ্ঞতার সাথে অনেক তথ্য-প্রমাণ হাজির করে আমেরিকার মতো একটি স্বপ্নের দেশের কিছু দুঃস্বপ্নের চিত্র তুলে ধরেছেন। আমি এই জন্য তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।

সাধারণত বিদেশে গেলে আমাদের দেশের মানুষ নিজ দেশের সবকিছুকে তুচ্ছজ্ঞান করে বিদেশের গুণগান গাইতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। যেমন, কয়েকদিন আগে এই ব্লগেই এক লন্ডন প্রবাসী লিখেছেন, তিনি নাকি লন্ডনে কয়েক বছরের মধ্যে কোন চুরি-ডাকাতি বা বিশৃঙ্খলা দেখেননি। তার নাবালক সন্তান নাকি তাকে প্রশ্ন করে, ‘ইংলিশ পুলিশ এত ভাল, আর বাংগালী পুলিশ এত খারাপ কেন’?

ইউরোপ আমেরিকায় নাকি চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, সিঁদ কাটাকাটি নেই। যদি দৈবাৎ কোন ঘটনার সূত্রপাত হয়েই যায়, তাহলে পুলিশ ভীমের শক্তি আর আলাদীনের যাদু দিয়ে তাদের মুহূর্তের মধ্যে পাকড়াও করে। অনেকে বলেন, ঐসব দেশের পুলিশ নাকি ফেরেস্তার মতো সদগুণের অধিকারী। তারা মানুষকে বড়ই শ্রদ্ধা করেন। কারো গায়ে হাত তো দেনই না, বরং আবালবৃদ্ধবণিতাকে ‘স্যার’ বলে বলে সম্বোধন করেন। তবে তারা এটা বুঝতে অক্ষম যে পাশ্চাত্যের ‘স্যার’ আমাদের দেশের ‘ভাই’ এর সমতুল শব্দ। ঐসব দেশে ইতর-ভদ্র নির্বিশেষে সরকারি কর্মচারিগণ জনগণকে ‘স্যার’ সম্বোধন করেন। এ ক্ষেত্রে মার্কিন পুলিশের ভদ্রতার সাথে আমাদের বাংলাদেশ পুলিশের ভদ্রতার কোন ঘাটতি আছে বলে মনে হয় না। কারণ, আমাদের দেশের পুলিশ সদস্যরা বয়সভেদে নাগরিকদের ভাই, চাচা ইত্যাদি বলে সম্বোধন করেন।

আমার মনে হয়, জনাব মহসীনই একমাত্র বাংগালী যিনি আইন-শৃঙ্খলা ও অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশের সাথে আমেরিকার তুলনা করে আমাদের সিদ্ধান্ত জানালেন যে, মার্কিন পুলিশ দক্ষ হলেও ফিরিস্তা বা যাদুকর নয়। আর বাংলাদেশের পুলিশ সেই তুলনায় রাক্ষস-খোক্কস কিংবা সম্পূর্ণ ব্যর্থ নয়। তারা যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশের মতোই সাফল্য ও ব্যর্থতার অধিকারী। কিন্তু আমাদের দেশের মানুষ নদীর এপার থেকে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে শুধু ভাবতে পছন্দ করে, ‘পৃথিবীতে যত সুখ সকলই ওপারে’। কিন্তু জনাব মোহসীনের উপলব্ধি শুনুন,

‘শিকাগোতে আমাদের গাড়ি ভেঙে চুরি না হলে আমি হয়ত কখনোই যুক্তরাষ্ট্রে অপরাধের এই ব্যাপকতা সমন্ধে জানতাম না এবং এক ভুল নিরাপত্তাবোধ নিয়ে সন্তষ্ট থাকতাম। আমরা প্রায়ই ধরে নেই যে, যুক্তরাষ্ট্র বা উন্নত বিশ্বের অন্যান্য দেশ বাংলাদেশের চেয়ে সবদিক দিয়েই ভালো। প্রকৃতপক্ষে, বস্তুনির্ভর বিশ্লেষণ করলেই শুধু সত্যিকার অবস্থা জানা যায়’।

যাহোক, আমার এই নিবন্ধে আমি জনাব মহসীনের অভিজ্ঞতার সাথে আমার কিছু পর্যবেক্ষণ বা পড়াশোনায় প্রাপ্ত তথ্য যোগ করব।

হয়তো অনেকেই জানেন না পৃথিবীর সবচেয়ে বেয়াড়া বা সহিংস (ভায়োলেন্ট) জাতি হল মার্কিনীরা। এই দেশের বিচার ব্যবস্থা তাই বেশ কঠিন করে সাজানো হয়েছে। দেশের নাগরিকদের হাজতবাসের সংখ্যার দিক দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সবার শীর্ষে। এই দেশের প্রতি এক লক্ষ লোকের মধ্যে ৭৪৩ জন জেলখানায় বসবাস করে। গণপ্রজাতন্ত্রী চীনে এই হার মাত্র ১২০। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার মাত্র ৫% বাস করে যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু সারা বিশ্বের জেলাখানায় বসবাসকারী ব্যক্তিদের এক-চতুর্থাংশের বসবাস মার্কিন জেলাখানায়। আজ আপনি আমেরিকায় আইন-শৃঙ্খলার উন্নতী দেখতে পাচ্ছেন তা ক্রয় করা হয়েছে প্রতিবছর জাতীয় বাজেটের মোট ৬০ বিলিয়ন ডলার খরচ করে প্রায় ২.৩ মিলিয়ন আদম সন্তানকে জেলে রেখে ।[১]

অপরাধ উদ্ঘাটনের হারের দিকে যদি তাকান, তাহলে, আপনি যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের দরবারে খুব বেশি উপরে স্থান দিতে পারবেন না। আমেরিকার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পুলিশ বিভাগগুলোর তদন্ত ও অপরাধ উদ্ঘাটন হার তথৈবচ। তবে সে দেশের ফেডারেল বুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে সারা বিশ্বে তদন্তক্ষেত্রে প্রবাদতুল্য মনে করা হয়। কিন্তু আমেরিকার এফবিআই তদন্তকর্মে দক্ষ হলেও তারা রূপকথার যাদুকর নন। তারা সব ঘটনারই রহস্য উদ্ঘটান করতে পারেন, এমন দাবী নিজেরাও করেন না। আর যা পারেন তাও রাতারাতি সম্পন্ন করতে পারেন না। এ জন্য তারা পর্যাপ্ত সহায়, সম্পদ ও সময় দাবী করেন। আমেরিকায় প্রতিদিন যে সব অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে তাদের মধ্যে কতগুলোর রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারে সেদেশের পুলিশ?

খোদ এফবিআইয়ের দেওয়া পরিসংখ্যানই বলে তারা ১০০ টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে মাত্র ৬৩ টি ঘটনার কুল কিনারা করতে পারেন[২] । বাকী ৩৭ টি হত্যা ঘটনার ক্ষেত্রে তাদের অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি, অর্থ-সম্পদ কোন কাজেই আসে না। সে দেশের অপরাধ উদ্ঘাটনের সামগ্রিক হার মাত্র ১২%-১৪% । আর মোটর গাড়ির কথা বলছেন? ১০০টা গাড়ি চুরি হলে ওরা বড় জোর ১৩টা গাড়ির কুলকিনারা করতে পারেন। অন্যদিকে সিঁধেল চুরির কুলকিনারা করার মুরোদ আরো কম। শতকরা মাত্র ১২.৯ টি ঘটনায় তারা সাফল্য দেখাতে পারেন[৩] । অথচ তাদের সহায় সম্পদের বাহার দেখুন।

আমেরিকা যুক্ত রাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা এফবিআই পৃথিবীর বৃহত্তম ডিএনএ নমুনার ডাটাবেইজ সংরক্ষিত রয়েছে। ২০১২ সালের জানুয়ারী মাসের পরিসংখ্যান অনুসারে তাদের জাতীয় ডিএনএ সূচিতে (এনডিআইএস) প্রায় ১,০৪,৮৪,৪০০ জন অপরাধীর ডিএনএ প্রোফাইল ও ৪,১২,৫০০ টি ফরেনসিক নমুনা সংরক্ষিত রয়েছে[৪] ।

২০১২ সালের জানুয়ারী মাস পর্যন্ত এফবিআইয়ের সমন্বিত অঙ্গুলাংক গবেষণাগারে সংরক্ষিত অঙ্গুলাঙ্ক নমুনার সংখ্যা প্রায় ০৭ কোটি যাদের মধ্যে প্রায় ৭৩ হাজার নমুনা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং বহির্বিশ্বের চিহ্নিত সন্ত্রাসবাদীদের। কোন ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কোন পুলিশ বিভাগ ইলেকট্রনিক মাধ্যমে এই গবেষণাগারে কোন সন্দেহজনক ব্যক্তির ফিংগার প্রিন্টের নমুনা প্রেরণ করলে মাত্র ২৭ মিনিটের মধ্যেই তার ফলাফল পাওয়া যায়। কিন্তু দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে এই সময় এক ঘন্টা ১২ মিনিট লাগে। ২০১০ সালে সারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে এফবিআইয়ের এই ফিংগার প্রিন্ট গবেষণাগারে প্রায় ৬ কোটি ১০ লাখ ফিংগারপ্রিন্টের নমুনা শনাক্তকরণের জন্য প্রেরণ করা হয়েছিল [৫]।

বাংলাদেশ পুলিশের কাছে এই সব প্রযুক্তিগত সুবিধা স্বপ্নের মতো। বাংলাদেশ পুলিশ হাতুড়ে-মার্কা তদন্ত চালিয়ে যে হারে অপরাধ উদ্ঘাটন করে তা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেক্ষাপটে খুব খারাপ বলে মনে হয় না। অন্যদিকে ১৫ কোটি জনসংখ্যা অধ্যূসিত একটি জনবহুল দেশের সামান্য সংখ্যক পুলিশ সদস্য তাদের সামর্থ্যের সবটুকু বিলিয়ে দিয়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে স্থিতিতাবস্থা বজায় রেখেছেন তাও কম কিসে? এত বেশি নিরাপত্তা থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে ব্যাংক ডাকাতির ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশে ব্যাংক ডাকাতি কালেভদ্রে ঘটে। এখনো শুধু গ্রাম নয়, মফসাল শহরগুলোর মানুষ ততোটা অপরাধ-ভীতিতে ভোগে না, যতটা যুক্তরাষ্ট্রের অনেক শহরের বাসিন্দারা ভোগে।

সূত্রঃ
১।http://en.wikipedia.org/wiki/United_States_incarceration_rate
২। http://www.fbi.gov/news/stories/2009/september/crimestats_091409 /on 21/02/2012 at 10 am.
৩। http://en.wikipedia.org/wiki/Clearance_rate
৪। http://www.fbi.gov/about-us/cjis/fingerprints_biometrics/iafis/iafis
৫।http://www.fbi.gov/about-us/cjis/fingerprints_biometrics/iafis/iafis