ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

১৯৮৫-৮৬ সেসনে আমি রংপুর কারমাইকেল কলেজের উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্র ছিলাম। যদিও সেসনের প্রথম বছরেই কতিপয় অনিবার্য কারণে শঠিবাড়ি কলেজে ট্রান্সফার নিয়েছিলাম, তবুও এই কলেজের প্রতি আমার একটি অসম্ভব টান রয়ে গেছে। পরে অনার্স পর্যায়ে এখানে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে আমি রসায়ন বিভাগে পড়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ হওয়ায় কারমাইকেল কলেজে পড়া হয়ে ওঠেনি। হয়তো এই কলেজে ভর্তি হয়েও কোন সনদপত্র সংগ্রহ করতে না পারায় আমার ভিতরে একটা অতৃপ্তি রয়েই গিয়েছিল।

তাই সুযোগ পেলেই এই কলেজের ক্যাম্পাসে চলে আসি। মনে মনে বলি, এই ক্যাম্পাস, এই শ্রেণিকক্ষ, এই বিশ্রামাগার একদিন আমারও ছিল। এই শ্রেণি কক্ষে একদা সর্ব জনাব আবু ইসহাক, নুরুন্নবী চৌধুরী, জায়েদ হোসেন, আবুয়াল চৌধুরী, মাঝহারুল মান্নান প্রমূখ সুদক্ষ শিক্ষকদের কাছ থেকে পাঠ নেওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। স্বল্পকালীন ছাত্রাবস্থার জন্য এই সব শিক্ষক আমাকে হয়তো চিনবেন না, কিন্তু আমি তাদের মনে রেখেছি। এই কলেজের উচ্চমাধ্যমিকের সহপাঠিদের অনেকেই পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সহপাঠি হয়েছে। কিন্তু অনেককেই পরে আর খুঁজে পাইনি।

বাংলার গভর্নর লর্ড ব্যারন কারমাইকেলের নাম অনুসারে ১৯১৬ সালে ৩০০ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত হয় উত্তরাঞ্চলের এককালীন সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ কারমাইকেল কলেজ। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় জমিদারদের দান-অনুদানের ফলে কারমাইকেল কলেজের মোট জমির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৭০০ একর। প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কারমাইকেল কলেজ কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীভূক্ত ছিল । ১৯৪৭ সালে ভারত ভেঙ্গে পাকিস্তান হলে প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীভূক্ত হয় এটি। অবশ্য সম্প্রতি অন্যান্য কলেজগুলোর মতো এটিও জাতীয় বিশ্বাবিদ্যালয়ের অধীভূক্ত। বর্তমানে এই কলেজে তিনটি অনুষদে সর্বমোট ১৬টি বিভাগ/বিষয় রয়েছে। মাঝখানে এই কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণি উঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০১১ সাল থেকে তা আবার চালু করা হয়েছে।

কারমাইকেল কলেজের জায়গায় তৈরি হয়েছে রংপুর ক্যাডেট কলেজ ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়। তাই এই কলেজের ঐতিহ্যবাহী ক্যাম্পাসটি ক্রমান্বয়ে ছোট হয়ে আসছে। কিন্তু এর পরেও এর সুবিশাল ক্যাম্পাস যে কাউকে মুগ্ধ করবে। কারমাইকেল কলেজের পুরো ক্যাম্পাসটি একটি সুদৃশ্য বাগানবাড়ী। নানা জাতের বৃক্ষরাজির মাঝখানে একাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবনগুলো মনোরম শোভা নিয়ে সগৌরবে দণ্ডায়মান। বাংলা বিভাগের জন্য বরাদ্ধকৃত মূল ভবনটি রীতিমত নিপুন স্থাপত্যের পুরাকীর্তি। ক্যাম্পাসের অনেক বৃক্ষ তাদের বয়সের কারণে ঐতিহাসিক ও নৃতাত্বিক গুরুত্ব বহন করে।

কারমাইকেল কলেজের বর্তমান ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা প্রায় ২৭ হাজার। বৃহত্তর রংপুর, দিনাজপুর ছাড়াও বৃহত্তর বগুড়া ও রাজশাহী জেলার ছাত্র-ছাত্রীগণ এখানে উচ্চতর শিক্ষার জন্য আসে। ছাত্র-ছাত্রীদের থাকার জন্য এখানে সাতটি ছাত্রাবাস ( মেয়েদের তিনটি ও ছেলেদের চারটি) রয়েছে। কিন্তু এই সব ছাত্রাবাসের আসন সংখ্যা সীমীত হওয়ায় অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রী আশ-পাশের আবাসিক এলাকার ছাত্র-মেসে বসবাস করে। বেসরকারি উদ্যোগে এখানে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু মান সম্মত ছাত্রীনিবাসও।

দীর্ঘদিন ছুটি কাটাতে রংপুরে এসে আমি প্রায়সই কারমাইকেল কলেজের ক্যাম্পসে বৈকালিক ভ্রমণে যাই। ছাত্র হলগুলোর সামনে দিয়ে হাঁটার সময় ক্যাম্পাসের নিস্তব্ধতা আমাকে বড়ই কষ্ট দেয়। যদিও রমজান মাস। কলেজের ক্লাস বন্ধ। কিন্তু হলে অবস্থানরত ছাত্রগণ এত তাড়াতাড়ি হল ছেড়ে যাবার কথা নয়। কারো সামনে পরীক্ষা, কারো অতিরিক্ত পড়ার চাপ ইত্যাদি কারণে ক্লাস বন্ধ থাকলেও হল সরগম থাকে। বস্তুত কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে খালি করা না হলে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র হোস্টেল কখনই নিস্তব্ধ থাকে না।

এই অস্বাভাবিক নিস্তব্ধতার কারণ খুঁজতে গিয়ে যা অবগত হলাম তা রীতিমত পীড়াদায়ক। প্রায় বছর দেড়েক আগে কলেজে ছাত্র শিবির ও ছাত্র লীগের মধ্যে বড় ধরণের একটি মারামারির ঘটনা ঘটে। ছাত্র অসন্তোষের পর কলেজের হলগুলো থেকে ছাত্রদের চলে যেতে বলা হয়। কিন্তু অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরবর্তী সময়ে খোলার পূর্বেই হলগুলো খুলে দেওয়া হলেও কারমাইকেল কলেজের ছাত্রদের চারটি হল সেই মারামারির ঘটনার পর আর খুলে দেওয়া হয়নি।

হলগুলো বছর ধরে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নাকি ক্যাম্পাসে শান্তিরক্ষার একটি কৌশল। ক্যাম্পসে থাকতে না দিলে ঝগড়া-ফ্যাসাদ হবে না। তবে নিন্দকেরা বলে ঐতিহ্যগতভাবে এই প্রতিষ্ঠানে জামাতপন্থি ছাত্র শিবিরের কর্তৃত্ব রয়েছে। ক্যাম্পসে ও হলে ছাত্র শিবিরের কর্তৃত্বকে খর্ব করার জন্যই এই হল বন্ধের কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। হল বন্ধ থাকার কারণে ক্যাম্পাসে এখন আর নাকি ছাত্র শিবির নাই। কলেজ প্রশাসনের এই কৌশলটি বড়ই অদ্ভূত বলে আমার কাছে প্রতীয়মান হল।

প্রয়োজনের তুলনায় কর্তৃপক্ষ খুব কম সংখ্যক ছাত্রকেই হলে থাকার সুযোগ দিতে পারে। কিন্তু হলের ধারণ ক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ছাত্র-ছাত্রী বিভিন্নভাবে হলে বসবাস করে। গ্রাম থেকে আসা দরিদ্র কৃষকের ছেলেমেয়েরা হলে থাকলে মেসে থাকার চেয়ে অনেক কম খরচে পড়াশোনা চালাতে পারে। অথচ কল্পিত অপশক্তি শিবির তাড়াতে গিয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষ হাজার দেড়েক হলবাসী ছাত্রকে হলছাড়া করেছে। বলাবাহুল্য, এই সব ছাত্র গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে আশেপাশের ছাত্র মেসে। তারা যদি প্রকৃতই শিবির হয়ে থাকে, তাহলে স্থানীয় মেসগুলোতে তাদের কার্যক্রম জোরদার করবে। এর ফলে শিবিরের কর্মকাণ্ড আরো বিস্তৃত হবে। তাহলে ভবিষ্যতে কী ছাত্র মেসগুলোও বন্ধ রাখার সরকারি সিদ্ধান্ত আসবে?

হলগুলোতে এখন ইঁদুর, বিড়াল, চামচিকা, ছারপোকা, বাদুড়-আদুড়ের বসবাস শুরু হয়েছে। হয়তো আর কয়েক মাস গেলে এসব হল বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই সব ছাত্র হল কারমাইকেল কলেজের ছাত্রদের আর ধারণ করতে পারছে না। এই সব হলের জন্য নিয়োজিত কর্মচারিগণ এখন অলস সময় কাটিয়ে সরকারের কাছ থেকে বেতন-ভাতা নিচ্ছেন। মাথা ব্যাথার জন্য এভাবে মাথা কেটে ফেলার নজির খুব বেশি নাই।

তবু্‌ও আমি খুশী। আমার শান্তনা পাবার অনেক কিছু রয়েছে। সিলেটের এমসি কলেজের প্রাক্তন ছাত্র শিক্ষামন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও অন্যরা সাম্প্রতিক ঘটনার প্রেক্ষিতে তাদের এক কালের পদচারণায় মুখরিত কলেজ ক্যাম্পাস থেকে অশ্রুপাত করতে করতে বের হয়েছেন। কিন্তু কারমাইকেল কলেজের হল বন্ধ দেখেও আমাকে কাঁদতে হয়নি। কারণ হলগুলো পুড়িয়ে দেওয়া হয়নি। এগুলো নিস্তব্ধ ও ছাত্রশূন্য হলেও অক্ষত রয়েছে।১৫/০৮/২০১২