ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

আধুনিক যুগের পুলিশ বিভাগগুলো প্রচার মাধ্যম কর্তৃক অতিমাত্রায় আলোড়িত হয়। পুলিশের খবর ছাড়া যেমন পত্রিকা বের হয় না, টিভিতে খবর প্রচারিত হয় না, তেমনি পত্রিকায় খবর না বের হলে অনেক ঘটনায় পুলিশও তৎপর হয় না। পত্রিকার শিরোনাম না হলে আইন-শৃঙ্খলা সমস্যা থেকে শুরু করে পুলিশ কর্মচারিদের অসদাচরণ পর্যন্ত অনেক সমস্যাই পুলিশ কর্তৃপক্ষের আশু নজরে আসে না। প্রচার মাধ্যমে প্রচারিত না হলে অনেক বড় ঘটনাও অনেক ক্ষেত্রে চাপা পড়ে যেতে পারে। অন্যদিকে, পত্রিকায় প্রকাশিত হলে অনেক তুচ্ছ ঘটনা নিয়েও খোদ পুলিশ পদবীর ঊর্ধ্বক্রমে তোলপাড় শুরু হয়। পত্রিকায় প্রকাশিত হয় না বলে অনেক ডাকাতির ঘটনায় মামলা হয় না। আবার প্রকাশিত খবরের প্রেক্ষিতে বা অন্য কোন কারণে আলোচিত হলে নিতান্ত চুরির ঘটনায় ডাকাতির মামলা বা হাতাহাতির ঘটনায় হত্যা প্রচেষ্টার মামলা রুজু করা পুলিশ বিভাগে নতুন কিছু নয়।

২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জনাব জয়নাল আবেদিন ফারুকের নোয়াখালী জেলার সেনবাগ থানার গ্রামের বাড়ি থেকে একটি মোবাইল সেট চুরি হয়। বিষয়টি স্থানীয় পুলিশ জানতে পারলেও চুরির মামলা রুজু করে নাই। কিন্তু পরবর্তীতে বিষয়টি মাননীয় চিফ হুইপ সংসদে আলোচনা করেন। পরদিন বিরাট আকারে তা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। পুলিশ তড়িঘড়ি করে এই ঘটনায় একটি ডাকাতির মামলা রুজু করে। তদন্তের এক পর্যায়ে মোবাইল সেটটি উদ্ধারও করা হয়। কিন্তু বিষয়টি ছিল শ্রেফ চুরি; ডাকাতি বা দস্যুতা নয়।

পুলিশের আচরণ নিয়ে কোন খবর পত্রিকায় না এলে বা ব্যাপকভাবে প্রচারিত না হলে শুধু আমাদের দেশে কেন, খোদ যুক্তরাষ্ট্রেও পুলিশ বা সরকারের টনক নড়ে না। গত শতাব্দির নব্বইয়ের দশকে বিখ্যাত রোডনি কিং ঘটনাটি এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

পুলিশের সিগন্যাল অমান্য করে গাড়ি চালনা করায় ১৯৯১ সালের ৩ জুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লজ এনজেলস পুলিশ বিভাগের প্রায় এক ডজন অফিসার সম্মিলিতভাবে রোডনি কিং নামে এক কৃঞ্চাঙ্গ টেক্সি ড্রাইভারকে নির্দয়ভাবে পিটুনি দেয়। কিং বেচারার শরীরের এমন কোন স্থান ছিল না যেখানে ক্ষত হয়নি। খোদ পুলিশ কমিশনারের ভাষায় তাকে ৫২টি কি ৫৩টি নাইট স্টিকের বাড়ি দেওয়া হয়েছিল।

মধ্যরাত্রে সংঘটিত এই নির্মম পুলিশি নির্যতানের পুরো ঘটনাটিই পার্শ্ববর্তী আবাসিক ভবন থেকে জর্জ হলিডে নামের একজন বেসরকারী ব্যক্তি ভিডিওতে ধারণ করেছিলেন। ঘটনার নির্মমতা দেখে হয়তো পুলিশ কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসারদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিবেন — এই প্রত্যাশায় জনাব হলিডে তার ভিডিও টেপটি নিয়ে পরদিন হাজির হন লজ এনজেলস পুলিশের সদর দফতরে।

কিন্তু লজ এনজেলস পুলিশের কমিশনার ডেরিল এফ. গেইল হলিডের ধারণকৃত ভিডিওটি তুচ্ছ জ্ঞান করে জর্জ হলিডেকে পুলিশ হেডকোয়ার্টারের গেট থেকেই বিদায় করে দিয়েছিলেন। এরপর জর্জ হলিডে তা স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে দিয়ে দেন। টেলিভিশনে এটা প্রচারিত হলে সারা দেশে, এমনকি, সারা বিশ্বে হৈচৈ পড়ে যায়। সেই সময় প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের ইরাক আক্রমণ আর সাদ্দাম হোসেনের কীর্তিকলাপ নিয়ে ব্যাস্ত প্রচার মাধ্যমগুলো মুহূর্তের মধ্যে লজ এনজেলস পুলিশের নিষ্ঠুরতার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। বলা বহুল্য, প্রচার মাধ্যমে প্রচারিত না হলে নিরপরাধ রোডনি কিং পুলিশের খাতায় একজন দাগী অপরাধী হিসেবেই চিহ্নিত হতো এবং বিশ্ববাসী আমেরিকান পুলিশের এই বর্ণবাদী চেহারা সম্পর্কে অজ্ঞই থেকে যেত।

তারপরও দেখুন, রোডনি কিং এর নির্যাতনকারীগণ লজ এনজেলস রাজ্য কোর্ট থেকে কিন্তু খালাস পেয়েছিল। এই খালাসের পর পুরো শহরব্যাপী শ্বেতাঙ্গ-কৃঞ্চাঙ্গ দাঙ্গা শুরু হয়। এই দাঙ্গা স্থায়ী হয় ৫ দিন। মারা যায় ৪০ জন, আহত হয় ২,৩৮২ জন, গ্রেফতার করা হয় ৫,৬৩৩ জনকে এবং ধ্বংস করা হয় ৫,২০০টি বাড়িঘর/ইমারত কর্মহীন হয়ে পড়ে ৪০ হাজার মানুষ্ । আর আর্থিক ক্ষতি হয় প্রায় ১০০ কোটি টাকার বেশি [1]।

এত কিছু ঘটে যাওয়ার পরেও লজ এনজেলস পুলিশের সেই কর্মকর্তাদের ফেডারেল আইনের আওতায় বিচার করে কোন রকমে মাত্র দুইজনকে মাত্র আড়াই বছরের জেলের সাজা দেওয়া হয়। বলাবাহুল্য, এই সাজা ফেডারেল আইনে নির্দেশিত সাজার চেয়ে অনেক কম ছিল।

একই ভাবে বাংলাদেশের বিগত দিনের আলোচিত পুলিশী ঘটনাগুলো দিকে নজর দিন। আলোচিত হয়েছিল বলেই এই সব ঘটনার প্রতি পুলিশ, রাষ্ট্র বা আদালত সমধিক গুরুত্ব আরোপ করেছিল। আদালত বহু পুলিশ অফিসারকে মৃত্যুদণ্ডের মতো শাস্তির আদেশও দিয়েছিল। ইয়াসমিন হত্যা, সীমা হত্যা, রুবেল হত্যা, আব্দুল কাদেরের বিরুদ্ধে নির্যাতন ইত্যাদি আলোচিত পুলিশি অসদাচরণের তদন্ত পুলিশই করেছে। ওসি রফিক, ওসি হেলাল, এসি আকরামসহ কত বাঘা বাঘা পুলিশ অফিসার তাদেরই সহকর্মী পুলিশ অফিসারের তদন্ত সাপেক্ষেই কুপোকাত হয়েছে। প্রত্যেকটি ঘটনার পিছনে প্রচার মাধ্যমের বিশেষ গুরুত্ব না থাকলে এই সব ঘটনার দিকে কর্তৃপক্ষের কাঙ্খিত মাত্রায় দৃষ্টি পড়তো বলে মনে হয় না।

কোন অনাকাঙ্খিত ঘটনায় পুলিশ যদি তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে তাহলে গোটা পুলিশ বিভাগ একটি বড় ধরণের সমালোচনার কবল থেকে উদ্ধার পায়। কিন্তু এই ব্যাপারে সামান্যতম অবহেলা বড় বিব্রতকর পরিস্থিতি ডেকে আনে। এই ব্যাপারে আমার একটি ব্যক্তিগত অবিজ্ঞতার বিরবণ তুলে ধরছি।

২০১০ সালের ১০ মে নোয়াখালীর চাটখিল থানায় রবিউল ইসলাম খোকন (২৩) নামের একজন আসামীকে একটি ডাকাতি মামলায় [2] এই থানার সাব-ইন্সপেক্টর আব্দুল মান্নান রিমান্ডে নিয়ে আসেন। এসআই মান্নান রিমান্ডের আসামীদের উপর অকথ্য নির্যাতন করতেন বলে জনশ্রুতি ছিল। বরাবরের মতো তিনি আসামী রবিউলকেও জিজ্ঞাসাবাদকালীন নির্যাতন করেন। গভীর রাতে আসামী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে প্রথমে স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্ কেন্দ্রে, তারপর মাইজদি জেনারেল হাসপাতালে এবং সর্বশেষে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। আসামী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যায়।

ঘটনাটির অনুসন্ধান করে সংশ্লিষ্ট অফিসারদের দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ পূর্বক প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করার জন্য পুলিশ সুপার আমার নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি অনুসন্ধান কমিটি তৈরী করে দেন [3] । আমার কমিটি আসামীকে নির্দয়ভাবে নির্যাতন করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার সপক্ষে এসআইন মান্নানের বিরুদ্ধে অকাট্য সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া যায়। কমিটি এস আই মান্নানের বিরুদ্ধে সরাসরি হত্যা মামলা গ্রহণের সুপারিশ করে। সেই অনুসারে হত্যামামলা গ্রহণ করা হয়। এসআই মান্নানকে ঢাকা থেকে লাশ নিয়ে আসার পথে গ্রেফতার করে সোনাইমুড়ি থানা হাজতে রাখা হয়।

এই বিষয়ে পরদিন পত্র-পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়। কিন্তু ঘটনার প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা গ্রহণ এবং তাকে গ্রেফতার করায় প্রচার মাধ্যমসমূহ বিরূপ প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারেনি। পরবর্তীতে বাদী কর্তৃক মামলা সমঝোতার খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হলে মহামান্য হাইকোর্ট পুলিশ সুপারকে সরাসরি হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন। পুলিশ সুপার জনাব হারুন-উর-রশিদ হাযারী আদালতে উপস্থিত হয়ে তার গৃহিত সকল পদক্ষেপ তথ্য প্রমাণসহ উপস্থাপন করলে আদালত সন্তুষ্ট হন এবং পুলিশ সুপারের প্রশংসা করেন।

এই ঘটনায় যদি তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো না নেওয়া হত, তাহলে এই নিয়ে বহু দিন ধরে প্রচার মাধ্যমে ঝড় উঠত, বিভাগীয়, বহির্বিভাগীয় এমন কি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি পর্যন্ত গঠিত হত। যে পদক্ষেপটি পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে গ্রহণ করেছিল, শেষ পর্যন্ত সেই পদক্ষেপই গ্রহণ করতে হত। কিন্তু মাঝখান থেকে গোটা পুলিশ বিভাগ সমালোচিত হত।

আমাদের বর্তমান পুলিশিং দর্শন ও কৌশল হল ঘটনাতাড়িত। কোন ঘটনা না ঘটলে পুলিশ সাধারণত তৎপর হয় না। কোন গ্রামে বা মহল্লা থেকে কোন অভিযোগ থানা-পুলিশের কাছে না আসলে পুলিশ ধরে নেয় সেই গ্রামে কোন অপরাধ হয় না বা সেখানে কোন বিশৃঙ্খলা নেই। কিন্তু কোন কমিউনিটিতে সংঘটিত অপরাধের মাত্র এক-পঞ্চমাংশ পুলিশের কাছে আসে বা থানায় মামলা রুজু হয় বলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হয়েছে।

আমি মনে করি আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এই হার আরো বেশি প্রতিকূল। এখানে মানুষ পারতপক্ষে পুলিশ থেকে দুরে থাকে। তাই ঘটনার পরিপূর্ণ অবণতি না ঘটলে মানুষ পুলিশের কাছে যায় না। অন্যদিকে পুলিশের কাছে স্বীকৃত চ্যানেলে কোন খবর না এলে পুলিশও তৎপর হয় না। এ জন্য অপরাধ ও বিশৃঙ্খলার ঘটনাগুলো পত্রিকায় ফলাও করে প্রকাশিত হয় এবং পুলিশ বেসামাল পরিস্থিতিতে ঘটনার হাল টেনে ধরার চেষ্টা করে। বলা বাহুল্য এই প্রচেষ্টা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সফল হয় না এবং পুলিশ চূড়ান্তভাবে সমালোচিত হয়।

এমতাবস্থায়, পুলিশকে শুধু ঘটনাতাড়িত হয়েই নয়; বরং স্বতঃপ্রণোদিত মনোভাব নিয়েই দায়িত্বপালন করতে হবে। সম্ভব হলে ঘটনা ঘটার পূর্বেই এবং তাও যদি সম্ভব না হয়, অন্ততপক্ষে ঘটনা পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত বা অন্যকোন ভাবে আলোচিত-সমালোচিত হওয়ার আগেই তা সমাধানের জন্য সর্বপ্রকার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

_____________________
সূত্রঃ
[1] Forces of Deviance – Understanding the Dark Side of Policing; Second Edition
by Victor D. Kappeler et al; Waveland Press, Inc ISBN- 978-0-88133-983-3
[2] নোয়াখালী জেলার চাটখিল থানার মামলা নং-০৮ তারিখ-২৮/১০/২০০৯ ধারা-৩৯৫/০৯৭ দণ্ড বিধি
[3] পুলিশ সুপার নোয়াখালী এর অফিস আদেশ নং-১৭/২০১০/গোশা; তারিখ ১৩ মে/২০১০
[4] http://www.youtube.com/watch?v=s1sR8gl4Frg&feature=related
[5] http://en.wikipedia.org/wiki/Rodney_Kinghttp://www.youtube.com/watch?v=s1sR8gl4Frg&feature=related