ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

বাংলাদেশ পুলিশ ঘটনাতাড়িত স্টাইল পরিত্যাগ করে স্বপ্রণোদিত স্টাইলে পুলিশিং শুরু করবে বলে আমরা অতিমাত্রায় আশাবাদি। কিন্তু আমজনতা থেকে শুরু করে অনেক ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার মনে একটি বদ্ধমূল ধারণা রয়েছে যে স্বপ্রণোদিত বা Proactive Policing করার মত জনবল বাংলাদেশ পুলিশের নেই। কিন্তু স্বপ্রণোদিত পুলিশিং স্টাইলে অতিরিক্ত জনবল অপরিহার্য বলে আমি মনে করি না। আমার মতে, এই ক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যদের মানসিকতা বা আগ্রহটাই হল আসল জিনিস। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের, বাংলাদেশ পুলিশের মধ্যে এই স্বপ্রণোদিত মানসিকতার দারুন অভাব রয়েছে।

কেউ মানুন আর নাই মানুন, এখনও বাংলাদেশ পুলিশের অনেক ইউনিট রয়েছে যেখানে স্বপ্রণোদিত পুলিশিং চর্চা করার জন্য পর্যাপ্ত জনবল রয়েছে এবং অনুকুল পরিবেশও বিরাজ করছে। কিন্তু সত্য হল, সেই সব ইউনিটেও স্বপ্রণোদিত পুলিশিং স্টাইল অনুসরণ করা হয় না।

একদিন অলস আলাপে বিরোধী দলীয় কর্মসূচিতে পুলিশের বাড়াবাড়ির প্রসঙ্গ এলে কিছু সহকর্মীর কাছে একটি প্রাসঙ্গিক প্রস্তাব করলাম। আমি বললাম, আমাদের মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচিতে ফোর্স মোতায়েনের পূর্বে ব্রিফিং ও পরে ডিব্রিফিং করা হয় না বললেই চলে। কোন জরুরী ডিউটি, বিশেষ করে, যেখানে বলপ্রয়োগের সম্ভাবনা কিংবা পুলিশের প্রতি হামলার সম্ভাবনা রয়েছে, সেই সব ক্ষেত্রে ফোর্স মোতায়েনের পূর্বে ব্রিফিং ও পরে ডিব্রিফিং কার্য পরিচালনা করা অত্যন্ত জরুরী।

অনেকে ব্রিফিং এর বিষয়টির জরুরৎ স্বীকার করলেও ডিব্রিফিং এর বিষয়টির প্রয়োজন আছে বলেই মনে করেন না। অথচ দায়িত্ব পালন কালে কোন কাজটি সঠিক ছিল এবং কোন কাজটি ভুল ছিল কিংবা ভবিষ্যতে একই জাতীয় ডিউটি করার সময় কি কি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে বা পুলিশের আচরণে কি জাতীয় পরিবর্তন আনতে হবে তা ডিব্রিফিং অনুষ্ঠানে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের অভিজ্ঞতা থেকেই বের হয়ে আসে। যাহোক, আমার ব্রিফিং-ডিব্রিফিং এর আইডিয়াটি নিছক ইউটোপিয়ান এবং আরো একটু জোরে খোঁচা দিয়ে কেউ কেউ ‘পিআরপি আইডিয়া’ বলে উড়িয়ে দিলেন। আমার অধিকাংশ সহকর্মীই আমাকে পুলিশের বাইরে থেকে ভাল ভাল কথা বলার ‘বিলাসিতা প্রদর্শনের জন্য’ দুইচার কথা শুনিয়ে আমাকে চুপ করিয়ে দিলেন। ধোৎ মিয়া, এই সবের সময় আছে নাকি?

আমার সহকর্মীরা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উদাহরণ তুলে ধরলেন। নিত্য দিনের মিছিল-মিটিং, হরতাল-অবরোধ, ভিআইপি-ভিভিআইপি ইত্যাদি জরুরী ডিউটিতে ডিএমপি এতটাই ব্যস্ত থাকে যে এই ইউনিটের ফোর্স অফিসারদের ব্রিফিং দেওয়ারও সময় নেই। এক ডিউটি থেকে এসে অন্যটাতে ছুটতে হয় তাদের। যে ফোর্সের ক্লান্ত শরীরটি বিছানায় থোয়ার ফুসরৎ নেই, তাদের নিয়ে আবার আয়োজন হবে ডিব্রিফিং অনুষ্ঠানের?

কথা সত্য বটে! কিন্তু আমি তাদের পঞ্চগড় কিংবা কুড়িগ্রামের মতো জেলাগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দিলাম। তারা বললেন, পঞ্চগড়ের ফোর্সকে ব্রিফিং আর ডিব্রিফিং দিয়ে কি হবে? এটা দরকার ডিএমপি, সিএমপি, গাজীপুর, নারায়নগঞ্জ কিংবা ঢাকার আসুলিয়াতে। আমি বললাম, এরা তো কোন একদিন ডিএমপি’র মতো ব্যস্ত ইউনিটে কাজ করবে। সহকর্মীগণ আমার কথায় পাত্তা দিলেন না। নিজেদের মতেই অটল রইলেন।

এর কয়েক দিন পর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার জনাব মোহাঃ শফিকুল ইসলাম তার সকল অফিসার ও ফোর্সকে কাউন্সিলিং করা শুরু করলেন। এই কাউন্সিলিং মূলত এক ধরণের ডিব্রিফিং। এখানে পুলিশ সদস্যদের বিগত দিনের ভুলগুলোর দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে সেগুলো থেকে মুক্ত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয, কৌশল বাতলে দেওয়া হয় এবং এই সব ভুল থেকে মুক্ত হতে না পারলে নিজেদের পেশাগত জীবন ও সমগ্র পুলিশের ভাবমূর্তিতে সেগুলো কিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে সে সম্পর্কে সতর্ক করে দেওয়া হয়।

বলাবাহুল্য, সিএমপি এর কমিশনার মহোদয় একজন চৌকশ ও বোদ্ধা পুলিশ অফিসার। সূচারুরূপে দায়িত্ব পালনের জন্য তার সততা ও সদিচ্ছা দুটোই রয়েছে। দেশের অন্যস্থানে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের প্রাত্যহিক ভুল বা অসদাচরণ সমূহ পুলিশের ভাবমূর্তির উপর কী প্রভাব ফেলছে সে সম্পর্কে তিনি পূর্ণ সচেতন। আর একই জাতীয় সমালোচনা তার ইউনিটের অফিসারদের নিয়ে হোক তা তিনি কামনা করতে পারেন না। যাহোক, সিএমপি এর অফিসারদের কাউন্সিলিং করার খবর শুনে আমার আলোচিত সহকর্মীরা বললেন, এতে কিছু হবে না। শুধু শুধু সময় নষ্ট; ফোর্সের কষ্ট!

বান্দরবান জেলার এসপি জনাব কামরুল আহসান গত বছর বান্দরবান জেলার প্রায় সকল গাড়ি চালককে ( অটো চালকসহ) ট্রাফিক আইন ও বিধি শিক্ষা দিয়েছেন। প্রতিদিন ২ ঘন্টা করে ১০ দিন ধরে বেশ কিছু ব্যাচে প্রায় ৩০০ গাড়ি চালককে এই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। তিনি প্রায় ৭০ টি স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে সড়ক নিরাপত্তার উপর বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছেন। এই খবর শুনে ঢাকার কাছাকাছি এক জেলার এসপি সাহেব বললেন, এটা অপ্রয়োজনীয়। বান্দরবানে কোথায় সড়ক যে গাড়ি চলবে? এখানে কয়টা গাড়ি আছে যে বাচ্চাদের সড়ক নিরাপত্তার পাঠ দিতে হবে। পাহাড়ে কাজ নেই তো, এসপি সাহেব পাহাড়ের ঘাস পরিষ্কারে নেমেছেন!

কী আশ্চর্য আমাদের পুলিশ নেতৃত্বের মানসিকতা! ঢাকায় থাকলে সময় নেই, আর পাহাড়ে বা পঞ্চগড়ে থাকলে দরকার নেই। তবে আমাদের সেই পেশাদার পুলিশ কর্তাদের দিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে বান্দরবান ও পঞ্চগড় উভয় জেলার বর্তমান এসপিরা কিন্তু স্বপ্রণোদিত স্টাইলে পুলিশিং করছেন। সাধারণ মানুষকে তারা বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করছেন, পুলিশ তাদের নিয়ন্ত্রণকারী বা প্রভূ নয়; পুলিশ তাদের সাহয্যকারী, বন্ধু ও পরামর্শক।

যাহোক, স্বপ্রণোদিত পুলিশিং প্রয়োগযোগ্য কোন ফৌজদারি আইন নয; এটি একটি পুলিশিং স্টাইল বা ধরণ। কোন স্টাইল জনবলের স্বল্পতার জন্য হয়তো পূর্ণতা পাবে না। কিন্তু যে অফিসার এই স্টাইল আত্মস্থ করেছেন, তিনি তা কোন অবস্থাতেই সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করবেন না। এটা তার মূদ্রাদোষও বলতে পারেন।

আমাদের অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) জনাব মোঃ শহীদুল হক-বিপিএম-পিপিএম এর দিকে তাকান। জনাব হক তার চাকরির প্রথম দিন থেকে যেখানেই গিয়েছেন সেখাই কমিউনিটি পুলিশিং স্টাইল অব্যহত রেখেছিলেন। তিনি চাঁদপুর জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও পুলিশ সুপার ছিলেন; ছিলেন রাজশাহী রেঞ্জ ও চট্টগ্রাম রেঞ্জ এর ডিআইজি। ডিএমপি এর কমিশনার ছিলেন তিনি। তার দায়িত্ব পালনের অধীক্ষেত্রসমূহ যেমন স্বল্প ব্যস্ততার ছিল, তেমনি ছিল রাজধানীর মতো চূড়ান্ত মাত্রার ব্যস্ত মহানগর। কিন্তু কোন ইউনিটেই তিনি তার কমিউনিটি পুলিশিং স্টাইলকে এক মুহূর্তের জন্যও স্থগিত রাখেননি।

তাই প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিক, কমিউনিটি পুলিশিং বা স্বপ্রণোদিত পুলিশিং ব্যক্তি নির্ভর, না স্থান নির্ভর? যদি এটা স্থান নির্ভর হবে তাহলে পুলিশ নেতৃত্বের পরিবর্তনের সাথে সাথেই এই স্টাইলে পরিবর্তন আসবে কেন? এটা গবেষণালব্ধ সত্য যে ব্যক্তি মানসিকতাই পুলিশিং স্টাইল নির্ধারণে মূখ্য ভূমিকা পালন করে। তাই আমরা আসা করব আমাদের পুলিশ অফিসারদের মধ্যে স্বপ্রণোদিত ব্যক্তি-মানসিকতা দ্রুত তৈরি হবে। ঘটনা পুলিশকে নয়, বরং পুলিশ অফিসারগণই ঘটনাকে নিয়ন্ত্রণ করবেন।