ক্যাটেগরিঃ মানবাধিকার

 

জগতে জীবকুলের বংশধারা জিইয়ে রাখার কৃতিত্ব মূলত নারীদের। একথা ঠিক যে নারী-পুরুষের মিলন ভিন্ন পূর্ণাঙ্গ জীব থেকে নতুন জীবন উৎপাদান সম্ভব নয়; কিন্তু নারী-পুরুষের মিলনে নিষিক্ত জাইগোটকে ধারণ করতে পারে একমাত্র নারীই। বর্তমানের বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষের আশ্চর্য ফল ‘টেস্টটিউব বেবি’ নামে যাই হোক, বাস্তবে কিন্তু মানব ভ্রুণের বেড়ে ওঠার জন্য মাতৃ-জঠরের বিকল্প নেই। মাতৃজঠরের বিকল্প এখনও আবিষ্কৃত হয়নি এবং দূর ভবিষ্যতে তা আবিষ্কৃত হবে বলেও অনুমান করা যায় না। তাই নারী যদি সন্তান ধারণে অস্বীকৃতি জানায় তাহলে পৃথিবীতে বংশ ধারা বন্ধ হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে মনুষ্য জাতির ভাবক-অভিভাবকদের ভাবনার যথেষ্ঠ কারণ রয়েছে। নারীর জঠর থেকে সন্তান জন্ম না নিলে পৃথিবী থেকে মানব জাতি অবশ্যই বিলুপ্ত হবে।

অনেকে বিষয়টিকে খেলো বলে উড়ে দিতে পারেন। কিন্তু পৃথিবীর জনসংখ্যার পরিসংখ্যান এটাকে সত্য বলে প্রতিপাদন করে। বাংলাদেশের মতো প্রকৃতি-নির্ভর সমাজ থেকে বের হয়ে যদি আমরা বিজ্ঞান-নির্ভর সমাজগুলোর দিকে তাকাই, তাহলে বিষয়টির সত্যতা পাওয়া যাবে। ইউরোপের অধিকাংশ দেশ আজ জনসংখ্যার ঋণাত্মক হার নিয়ে চিন্তিত। জার্মানীর জনসংখ্যা হ্রাসের হার ০.২, পোল্যান্ডের ০.০৭৫, রাশিয়া ০.৪৮ ও ইটালীর ০.০৯।[1] এমন কি জাপানের মতো প্রতীচ্যের দেশেও জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ঋণাত্মক। জাপানের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হল -.২৮। [2]

বিভিন্ন কারণে পৃথিবীর কোন ভূখণ্ডে জনসংখ্যার হ্রাস-বৃদ্ধি হতে পারে। এটা হতে পারে প্রাকৃতিক বা মনুষ্য সৃষ্টি দুর্যোগের কারণে মৃত্যু, এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বিভিন্ন কারণে ব্যাপক হারে মানুষের গমনাগমন কিংবা জন্মহারের হ্রাস।

জন্মহার হ্রাসের অর্থই হল, নারীরা আগের চেয়ে কম হারে সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন। মাতৃ-জঠর খালি থাকছে। এই ক্ষেত্রে পুরুষের ভূমিকা অবশ্যই আছে। কিন্তু নারীদের ভূমিকাই হল মূল নিয়ন্ত্রক। নারীরা যদি সন্তান ধারণে অক্ষম হয় বা সন্তান ধারণে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে পুরুষের শত চেষ্টাতেও কি সন্তান উৎপাদন সম্ভব?

পৃথিবীতে মানব জাতীর বংশ ধারা টিকিয়ে রেখেছে নারীরাই। জাপান, ইটালি, জার্মানীর মতো দেশগুলো বর্তমানে তাদের দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ অস্তিত্ব নিয়েই চিন্তিত। বৃহত্তর চিন্তায় না গিয়েও তাৎক্ষণিক লাভালাভের চিন্তাও কম নয়। জনসংখ্যার ঘাটতির জন্য অনেক দেশ বা জাতির জাতীয় উৎপাদন দারুণভাবে ব্যহত হচ্ছে। সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উপর পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব। নিম্ন বা ঋণাত্বক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের দেশগুলো তাদের দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য বহুবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। এসবের মধ্যে রয়েছে নারী-পুরুষের মধ্যে বিবাহ সম্পন্ন করা, সন্তান উৎপাদন করা, তাদের লালন পালন করা ইত্যাদির জন্য বিশেষ ভাতা, বোনাস, বিনা খরচে সন্তান পালনের খরব বহন ইত্যাদি। সিংগাপুর সরকার নাগরিকদের সন্তান উৎপাদেনর জন্য উচ্চমূল্যের বোনাস দিয়ে থাকে। প্রথম সন্তান উৎপাদনের জন্য দম্পত্বিকে সাড়ে ছয় লক্ষ টাকার বোনাস দেওয়া হয়। কিন্তু তারপরও কাঙ্খিত ফল না পাওয়ায় জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে বিশেষ কার্যকরি সহায়তা ও উৎসাহদানের জন্য সিংগাপুর সরকার রীতিমত একটি পৃথক মন্ত্রণালয় খুলতে যাচ্ছে[৩]।

এই ভাবে জনসংখ্যা কমতে থাকলে হয়তো জার্মান বা জাপানী জাতির মতো বেশ কিছু উন্নত জাতিই একদিন পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হবে। এটা অনুমান করতে কষ্ট হলেও অবাস্তব নয়। পৃথিবী থেকে নানা প্রাণি ও নানা জাতির বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার নৃতাত্ত্বিক ও ধর্মতাত্ত্বিক উদাহরণ রয়েছে। কোন এক সময় পৃথিবীর মাটিতে দুর্দান্ত প্রতাপে ঘুরে বেড়ানো ডাইনোসরদের যাদু ঘরে সংরক্ষিত আস্ত কংকাল আজো মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। কিন্তু বাস্তবতা হল তাদের অস্তিত্ব বহু হাজার বছর আগেই বিলুপ্ত হয়েছে। কোন এক সময় আদ, সামুদ প্রভৃতি জাতির আধিপত্য ছিল গোটা মধ্য প্রাচ্য জুড়ে। কিন্তু তারা আজ আর নেই। তাই ঋণাত্মক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার সম্পন্ন জাপানী, জার্মান বা রুশ জাতি যদি এক দিন পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়, তাহলে আশ্চর্য হবার কিছু থাকবে না।

নারীর অস্তিত্ব শুধু নারীর নয় , সমগ্র মানবজাতির। অতএব, আসুন নারীকে ভালবাসি, নারীকে শ্রদ্ধা করি, নারীর অধিকার নিশ্চিত করি, নারীকে পুরুষের মতোই এবং পারলে এই বিবেচনায় এক ধাপ উপরের গুরুত্বসম্পন্ন মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দিই।

সূত্রঃ

[1] http://en.wikipedia.org/wiki/Population_decline ; as on 30 August 2012 at 06:00 hours
[2] http://www.indexmundi.com/g/r.aspx?c=ja&v=24 ; as on 30 August 2012 at 06:00
[৩] http://new.ittefaq.com.bd/news/view/135343/2012-09-04/4