ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

পুলিশ ও আইনজীবীগণ পেশাজীবী হিসেবে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে। বিশেষ করে ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে পুলিশের পেশাদারিত্বের একটি বিরাট অংশ আইনজীবীদের সহায়তা নিয়ে বা সহায়তা দিয়ে পরিচালিত হয়। রাষ্ট্রের বৃহত্তর বিচার ব্যবস্থার অংশ হিসেবে পুলিশ অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রমাণ আদালত পর্যন্ত নিয়ে যায়। আইনজীবীরা তা আদালতে উপস্থাপন করে। জঘন্য প্রকৃতির, জটিল ও চাঞ্চল্যকর মামলাগুলোর তদন্তের ক্ষেত্রে জেলার সরকারি কৌশলীর পরামর্শ ছাড়া পুলিশ সাধারণত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে না। অধিকন্তু আদালতে সাক্ষ্য প্রমাণ সংগ্রহ, আসামী বা সাক্ষী উপস্থাপনের ক্ষেত্রে আইনজীবী আর পুলিশ পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতেই কাজ করে।

পেশাগত জীবনের বাইরেও পারিবারিক বা সামাজিক জীবনেও পুলিশ ও আইনজীবীদের মধ্যে একাধিক বিষয়ে অসংখ্য অলিখিত সামঞ্জস্য রয়েছে। হাজারো আইনের সময়ে অসময়ে প্রয়োগ করে পুলিশ প্রতিনিয়তই কিছু কিছু ব্যক্তির অসন্তুষ্টি উৎপাদন করে। এই সব অসন্তুষ্টির তিল তিল সমন্বয় পুলিশকে মানুষের কাছে অপ্রিয় করে তোলে। ফুরফুরে মেজাজ নিয়ে গল্পে মশগুল হতে কেউ পুলিশ অফিসে বা থানায় আসে না। পুলিশের কাছে যারা আসে, তারা সবাই হয় দৈহিক, মানসিক ও আর্থিকভবে বিপর্যস্ত। কোন সমস্যার সাধারণ সমাধানের জন্য সব কয়টি তুরুপের তাস নিঃশেষ না হওয়া পর্যন্ত পুলিশের দারস্থ কেউ হয় না।

একইভাবে আইনী সহায়তার নামে জনগণ বা মক্কেলদের শোষণের অভিযোগে আইনজীবীরা তাদের মক্কেলের কাছেই শুধু নয়, সমগ্র জনগোষ্ঠীর কাছে বিতর্কিত। পুলিশকে এদেশের সিংহভাগ মানুষ পছন্দ করে না। কিন্তু আইনজীবী বা উকিলদের শতভাগ মানুষ পছন্দ করে, এমন কথা কেউ নিশ্চয় দাবী করবেন না। পুলিশ থেকে যদি মানুষ নিরাপদে থাকার কৌশল অবলম্বন করে, তবে উকিল থেকে তারা আরো একটু বেশি নিরাপদ থাকতে চায়।

ঢাকা শহরের বাড়িওয়ালারা যেসব শ্রেণির মানুষকে বাসাভাড়া দিতে ইতস্ততবোধ করেন তাদের শীর্ষে রয়েছেন আইনজীবীরা। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে পুলিশ। উকিল আর পুলিশকে কেউ বাসাভাড়া দিতে চায় না। আমি ঢাকা শহরে বাসা ভাড়া নেওয়ার সময় রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের উত্তর দিকে শেলটেক টাওয়ারের একটি বাসা পছন্দ করি। বাসার মালিক ভাড়া দিতে রাজিও হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে অগ্রিম গ্রহণের পূর্বে আমাকে জানিয়ে দেন, তার বাসা ভাড়া হয়ে গেছে।

আমি ভিন্ন সূত্র থেকে জানতে পারি ভদ্রলোক পুলিশের পরিচয় পেয়েই মিথ্যা কথা বলে আমাকে বাসা ভাড়া দেওয়া থেকে বিরত থেকেছে। তিনি এরপর একজন ছাত্রকে বাসা ভাড়া দিতে রাজি হন। এই ছাত্রের ভাই বিদেশে থেকে তার ও তার ভাইবোনদের ঢাকা শহরের বাসাভাড়াসহ পড়াশোনার খরচ যোগায়। সেই ছাত্রটির সাথে আমার কোনভাবে হৃদ্যতা হয়েছিল। এই বাসার মালিকের কাছে বাসা ভাড়ার অগ্রিম অর্থ পরিরোধ করতে সেই ছাত্রটি যখন মালিকের অন্য একটি বাসায় যায়, আমি তখন তার সাথে মালিকের বাসা পর্যন্ত গিয়েছি। তাকে পরিচয় দিয়ে যখন বললাম, আপনি তো আপনার বাসা ভাড়া হয়ে গেছে বলে আমাকে মিথ্যা কথা বলেছিলেন। এই ছাত্রটি তো আমারও পরে আপনার সাথে যোগাযোগ করেছে। আপনি আমাকে মিথ্যা কথা বলে একে বাসা ভাড়া দিচ্ছেন কেন? আমি কি আপনাকে বাসাভাড়া পরিশোধ করতে অপরারগ না আপনার বাসাভাড়া মেরে দিব? তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেননি।

পরবর্তীতে যে বাসায় আমি উঠেছিলাম সেই বাসাতে আমার পূর্বে বসবাস করতেন এক আইনজীবী। তিনি সরকারি দলের ঘরানার আইনজীবী হলেও সেই বাসায় তার পরিচয় গোপন করে থাকতেন। তার স্ত্রী একটি স্থানীয় কলেজের প্রভাষক ছিলেন। ভদ্রলোক আইনজীবীর পরিচয় গোপন রেখে সেই বাসায় তার স্ত্রীর পরিচয়ে থাকতেন। ভদ্রলোক দুঃখ করে আমাকে বললেন, আইনজীবী আর পুলিশকে ঢাকার মানুষ বাসা ভাড়া দিতে চায় না। পুলিশ ও আইনজীবীদের বাসা ভাড়া না দেওয়ার পিছনে অভিন্ন কারণ রয়েছে। আইনজীবী ও পুলিশ উভয় শ্রেণি আইন-আদালতের কাছাকাছি থাকে। বাসাওয়ালাদের অন্যায়, অত্যাচার আর ঘনঘন বাসাভাড়া বৃদ্ধিতে এরা প্রতিবাদ করে। যাহোক, বাসাভাড়া না পাওয়ার সমদুঃখেও পুলিশ ও আইনজীবীগণ বড় কাছাকাছি বলেই মনে হয়।

পুলিশ ও আইনজীবীদের কেউই তাদের কাছে আসা সেবা প্রার্থীদের সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট করতে পারেন না। দূর থেকে টেলিফোনে বা মামলা না করার পূর্বেই কোন নাগরিক যে সেবা পেয়ে থাকেন, সেই সেবার প্রেক্ষিতে নাগরিকদের কিছুটা সন্তুষ্ট করা গেলেও যারা একবার পুলিশের কাছে বা আদালতে আইনজীবীদের মাধ্যমে মামলা করেছেন, তাদের মামলা করার পরদিন থেকেই অসন্তুষ্টির মাত্রা বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে পুলিশকে সহযোগিতা দিয়ে বা অন্য কোন উপায়ে পুলিশের বৈধ-অবৈধ চাহিদা পূরণ এবং এতদসত্ত্বেও নিজেদের মতো করে সেবা না পাওয়ায় মামলার চূড়ান্ত পর্যায়ে পুলিশের প্রতি জনগণের অসন্তুষ্টিও চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে।

ঠিক একই কথা আইনজীবীদের জন্যও প্রযোজ্য। কোন আইনজীবী তার মক্কেলকে চূড়ান্ত পর্যায়ে সন্তুষ্ট করতে সমর্থ হন না। বরং মামলা গ্রহণের পরক্ষণ থেকেই মক্কেলের সাথে আইনজীবীর দূরত্ব। এই দূরত্ব অর্থের, সময়ের ও মামলার ফলাফলের। মক্কেলগণ বলেন, একটার পর একটা তারিখ চলে যায়। মামলার নিষ্পত্তি হয় না। কখনো পক্ষের ও কখনো বিপক্ষের উকিলের সময় প্রার্থনা কিংবা অন্য কোন কারণে অনুপস্থিতি কিংবা মামলার জন্য প্রস্তুত না হওয়া, সরকারের পক্ষে-বিপক্ষের আন্দোলনে অংশগ্রহণ ইত্যাদি হাজারো কারণে মামলার বাদী আদালতের বারান্দায় হেঁটে হেঁটে জুতোর তলা ক্ষয় করেন। মক্কেলের কাছ থেকে টাকা না পাওয়া পর্যন্ত আইনজীবীরা মক্কেলের পক্ষে আদালতে ওঠেনই না। আবার এক আইনজীবীর অসমাপ্ত মামলা অন্য আইনজীবী সহজে গ্রহণও করেন না। অর্থাৎ এক বার কোন মামলায় কোন মক্কেল কোন আইনজীবী নিয়োগ করলে তাকে পরিত্যাগ করার সুযোগ খুবই সীমীত। এক সিভিল মামলার মক্কেল একবার আমাকে তার দুঃখের কথা বলতে গয়ে মন্তব্য করেন, ‘ভাইরে চাইলে বউ পরিবর্তন করা যায়, কিন্তু মামলার উকিল পরিবর্তন করা যায় না’। ভদ্রলোকের মন্তব্যে খেদ-রঞ্জিত অত্যুক্তি থাকলেও এটা সত্যতা-বর্জিত নয়।

রংপুরে বসবাসকৃত আমার এক আত্মীয় ঢাকার আদালতে একই ঘটনায় কয়েকটি মামলায় জড়িয়ে পড়েন। তার এক দূরবর্তী আত্মীয়ের পরামর্শে তিনি রংপুর থেকে ঢাকায় এসে এক আইনজীবীকে ধরেন। এই আইনজীবী তার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাকে মামলাগুলোর অগ্রগতি-অবনতি সম্পর্কে এক প্রকার অন্ধকারে রেখেই তার কাছ থেকে শুধু টাকা খসাতে থাকেন। তিনি রংপুর থেকে পকেট ভর্তি করে ঢাকায় এসে শূন্য পকেটে বাড়ি ফিরেন। দেদারছে অর্থব্যয়ের কষ্ট সইতে না পেরে তিনি একদিন আমার কাছে সব খুলে বলে আমার পরামর্শ কামনা করেন। আমি তাকে আমার এক পরিচিত আইনজীবীর কাছে পাঠিয়ে দেই। এই আইনজীবী যত্নের সাথে তার মামলাগুলো দেখতে থাকেন। এক সময় তিনিটি মালার খোঁজ নিতে গিয়ে নতুন উকিল জানতে পারেন, তার বিপক্ষের তিনটি মামলার মধ্যে দুইটি ইতোমধ্যেই বাদীর অনুপস্থিতির জন্য খারিজ হয়ে গেছে। এখন একটি মাত্র মামলা অবশিষ্ট আছে।

কিন্তু পূর্ববর্তী উকিল মহোদয় সব কয়টি মামলা সচল আছে মর্মে তাকে বিভিন্ন তারিখ দিয়ে দিয়ে তার কাছ থেকে তিনটি মামলা পরিচালনার জন্য দিনের পর দিন টাকা খসিয়ে যাচ্ছেন।এই তথ্য আবিষ্কারের ফলে এই মক্কেল স্বস্তি পেলেও তার অর্থব্যয় কমল না। পূর্বের তিনটি মামলার জন্য যে খরচ হতো এই উকিল একটি মামলাতেই সে পরিমাণ অর্থ খসানোর তালে থাকলেন। আমার পরিচিত পরবর্তী উকিলও মামলায় নিমজ্জিত আমার আত্মীয়কে সন্তুষ্ট করতে পারলেন না। তার বিরুদ্ধেও সাধ্যাতিরিক্ত ফি গ্রহণ ও মামলা দীর্ঘায়িত করার অভিযোগ আনা হল।

এখানে একটি আশ্চর্যের বিষয় রয়েছে। এটা আইন পেশায় ইউনিক- তুলনাহীন। পৃথিবীর সকল পেশা বা ব্যবসার লেনদেন বা সেবা আদান প্রদানে পণ্যের বা সেবার একটি নির্দিষ্ট মূল্য-তালিকা বা হার থাকে । বাজারে চাল কিনলেও প্রত্যেক প্রকার চালের জন্য সকল ক্রেতাকে একই মূল্য পরিশোধ করতে হয়। এমন কি প্রত্যেক ডাক্তার তার রোগীদের জন্য একটি নির্দিষ্ট ফি নিয়ে থাকেন। ক্লিনিক থেকে ক্লিনিকে এবং ডাক্তার থেকে ডাক্তারে এটার হার পরিবর্তিত হতে পারে। তবে কোন ডাক্তার রোগী দেখতে কত টাকা ফি নেন তার লিখিত বা অলিখিত সুনির্দিষ্ট হার রয়েছে।

কিন্তু আইন পেশাই পৃথিবীর এক মাত্র পেশা যেখানে সেবা গ্রহণ বা প্রদানের ক্ষেত্রে কোন নির্দিষ্ট ও দৃশ্যমান মূল্য তালিকা বা হার নেই। একজন আইনজীবী তার মক্কেলের কাছ থেকে কোন শ্রেণির মামলার জন্য সর্বোচ্চ কত টাকা ফি নিতে পারবেন তার নির্দিষ্ট হার বা সীমা নেই। আরো বেশি দূর গিয়ে খোঁজ নিলে দেখা যাবে বাংলাদেশের বৈধ ব্যবসা বা সেবাদানের পাশাপাশি অবৈধ লেনদেনেরও অলিখিত হার রয়েছে। যেমন, ঘুষের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন অফিসে বিভিন্ন রেট আছে বলে বাতাসে খবর ওড়ে। কিন্তু উকিলের ফি এর রেট কি তা মক্কেলও জানতে পারেন না।

সেবা ক্রয়-বিক্রয়ের নির্দিষ্ট হার নেই বলেই কোন আইনজীবী বছরে কত টাকা রোজগার করেন তা কেউই জানতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে সরকারের কর বিভাগের মাতাব্বরির কোন সুযোগ নেই। এমতাবস্থায়, কর ফাঁকিতে অভ্যস্ত নয়, এমন আইনজীবীর সন্ধান হয়তো পাওয়া যাবে না।

প্রত্যেক সমাজেই আইনজীবীদের একটা আলোচিত অবস্থান থাকলেও মানুষ অন্তঃকরণ থেকে কোন আইনজীবীকে ভালবেসেছেন বলে নজির নেই। রাজনীতিবিদ, সমাজ সংস্কারক, মানবাধিকার রক্ষা ইত্যাদি ক্ষেত্রে আইনজীবীদের যতই অবদান থাকুক না কেন এবং এই জন্য কোন আইনজীবী ব্যক্তিগতভাবে যতই সম্মানিত হোক না কেন, আইনজীবী হিসেবে কেউ তাদের প্রশংসা করেন না। এটা আমাদের দেশেই শুধু নয়; যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশেও একই রকম অবস্থা। সেখানে সকল পেশার মধ্যে আইনজীবীদের অবস্থান দুঃখজনকভাবে অনেক নিচে। আন্তর্জাতিক জনমত জরীপ সংস্থা ‘গ্যালাপ পোলের’ সর্বশেষ ‘পেশাগত সততা ও নৈতিকতার’ যে পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে তাতে দেখা যায় পুলিশকে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ সাংবাদিক, ব্যাংকার, একাউন্ট্যান্ট, এমনকি ধর্মযাজকদের উপরে স্থান দিয়েছে। এক্ষেত্রে পুলিশ শতকরা ৫৩ জন নাগরিকের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা লাভ করেছে।

কিন্তু আইনজীবীদের তারা অত্যন্ত নিম্ন সততা ও নৈতিকতার পেশাজীবী বলে মনে করেছেন। এক্ষেত্রে আইনজীবীদের অবস্থান আবাসন-ব্যবসার দালালদেরও এক ধাপ নিচে। যুক্তরাষ্ট্রের শতকরা মাত্র ১৯ জন নাগরিক আইনজীবীদের সততা ও নৈতিকতার প্রশংসা করেছেন[1]। বাংলাদেশে এই জাতীয় জরীপের তেমন কোন ব্যবস্থা নেই। যদি থাকত, তাহলে, পুলিশ অবশ্যই নিম্নস্তরে বিবেচিত হত। কিন্তু আইনজীবীদের অবস্থান যে পুলিশের চেয়ে কোন অংশেই ভাল হত না, তা সহজেই অনুমান করা যায়।

কিন্তু এত কিছুর পরেও পুলিশ ও আইনজীবীদের মধ্যে এক বিরোধীতার আবহ রয়েছে। সুযোগ পেলেই আইনজীবীরা পুলিশকে এক হাত দেখে নেয়। অন্যদিকে পুলিশও হাতের কাছে পেলে আইনজীবীদের ছেড়ে দেয় না। পেশাগত জীবনের হাজারো সাদৃশ্যকে ছাপিয়ে পুলিশ ও আইনজীবীদের এই নিত্য দিনের বৈরিতার অবসান হওয়া উচিৎ।

সূত্রঃ

[1]http://www.gallup.com/poll/1654/Honesty-Ethics-Professions.aspx as on 31 August 2012 at 11:30