ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

অপরাধের তদন্ত তথা তল্লাশী, উদ্ধার, গ্রেফতার, প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য প্রমাণ সংগ্রহ করতঃ অভিযুক্তদের উপযুক্ত আদালতে বিচারের জন্য প্রেরণের চেয়ে অপরাধ নিবারণ বা প্রতিরোধ করাই অধিকতর লাভজনক। ডেভিড বেইলীর ভাষায়, অপরাধ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে এক সের, এক মনের চেয়ে উত্তম।

একটি নির্দিষ্ট অপরাধ একবার সংঘটিত হয়ে গেলে সেই অপরাধের ঘটনা নিয়ে সরকার বা রাষ্ট্রের নানাবিধ যন্ত্রণা পোহাতে হয়। যন্ত্রণা কেবল অর্থ ব্যয় সংক্রান্তই নয়; এর সাথে বহুবিধ বিষয় জড়িত থাকে। সংঘটিত অপরাধ উদ্ঘাটনের ক্ষেত্রে পুলিশ তথা সরকারের বিরুদ্ধে প্রায়শই অদক্ষতা বা অসামর্থ্যের অভিযোগ তোলা হয়। কিন্তু অপরাধ প্রতিরোধ করা গেলে অনেক বিষয়েই সরকার স্বস্তিতে থাকতে পারে।

কিন্তু, অপরাধ প্রতিরোধ প্রায় ক্ষেত্রেই অতি দুরূহ কাজ। অনেক অপরাধ বিজ্ঞানী মনে করেন, অপরাধ আসলে প্রতিরোধ করা যায় না। অপরাধী কিংবা সমাজের কোন একটি অংশ যখন অপরাধপ্রবণ হয়ে পড়ে, তখন অপরাধ কোন না কোন প্রকারে প্রকাশ পায় বা সংঘটিত হয়। হয়তো এক কমিউনিটি অপরাধ প্রতিরোধের জন্য কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করল। যার ফলে সেখানে অপরাধ সংঘটিত হতে পারল না। কিন্তু একই অপরাধীগণ তখন অন্য স্থানে বা অন্য কমিউনিটিতে গিয়ে অপরাধ করবে। শহরের এক বাসার দরোজা জানালা শক্ত করে বন্ধ করা হলে অপরাধীরা অপেক্ষাকৃত সহজ টার্গেট বেছে নেবে। যে বাসাবাড়ি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সিকিউরিটি গার্ড রয়েছে, অপরাধীরা সেই বাসাবাড়ি এড়িয়ে সিকিউরিটি গার্ডহীন বাসাবাড়ি বেছে নেবে। কোন নির্দিষ্ট অপরাধ প্রক্রিয়া জনগণ বা পুলিশের জানা হলে, অপরাধীরা নতুন নতুন কৌশল বা অপরাধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করবে বা আবিষ্কার করবে। তবে বিরুদ্ধবাদীরা যাই বলুন অপরাধ প্রতিরোধ করা বর্তমানে কোন অনুমাননির্ভর প্রকল্প নয়। পৃথিবীর অনেক দেশ ও সমাজ আধুনিক কলা-কৌশল প্রয়োগ করে অপরাধ প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়েছে।

তবে অপরাধ প্রতিরোধ শুধু সরকার বা পুলিশের দায়িত্ব নয়। বরং এটা প্রতিটি নাগরিকেরই দায়িত্ব। অপরাধ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে নাগরিকগণ ব্যক্তি, গোষ্ঠী, সমষ্টি ও সাংগঠনিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারে। ব্যক্তিগণ একই সাথে নানা গোষ্ঠী বা সংগঠনের সদস্য হতে পারে। যেমন, একজন নাগরিক বাসায় একজন গৃহকর্তা। কিন্তু তিনি তার কর্মক্ষেত্রে একটি সংগঠনের সদস্য। কোথাও তিনি সাধারণ সদস্য, কোথাও নেতা আবার কোথাও নীতিনির্ধারক। একজন শিক্ষক তার ছাত্র-ছাত্রীদের উপর, একজন সরকারি বা বেসরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মী তার গ্রাহকদের উপর, একজন নেতা তার অনুসারীদের উপর প্রভাব বিস্তার করে। কিন্তু অপরাধ প্রতিরোধ মনোভাব যদি সবার মধ্যে জাগ্রত থাকে তবে প্রত্যেকেই তার নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে তার অনুসারী বা সহকর্মীদের মধ্যে তা সঞ্চারিত করতে পারে।

এটা সঠিক যে অপরাধ প্রতিরোধে জনগণের সচেতনতা দরকার। কিন্তু অপরাধ সম্পর্কে শুধু সচেতন হলেই অপরাধ প্রতিরোধ হয়না। সচেতনতা পুলিশকে আরো বেশি কর্মক্ষম হওয়ার জন্য কিংবা সরকারকে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য আরো বেশি তৎপর হওয়ার জন্য তাগিদ সৃষ্টি করবে। কিন্তু সচেতনতার নামে জনগণ যদি সব কাজে পুলিশের বা রাষ্ট্রের উপর চাপিয়ে দেয়, তাহলে, পুলিশের প্রতি জনগণের শুধু সন্তুষ্টিই বৃদ্ধি পারে; অপরাধ হ্রাস পাবে না।

জন-অসন্তুষ্টিকে কাজে লাগিয়ে সরকারবিরোধী গোষ্ঠী বা দায়িত্বহীন কিছু প্রচারমাধ্যম সরকারের সমালোচনায় সোচ্চার হতে পারে। এর ফলে পুলিশ অপরাধ প্রতিরোধের চেয়ে অপরাধ গোপন করে বার্ষিক অপরাধ সূচিতে অপরাধের সংখ্যা কমানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত হতে পারে। প্রবল চাপে থাকা পুলিশ নেতৃত্ব সরকারকে অপরাধ হ্রাসের কিছু পরিসংখ্যান তুলে দিয়ে জন-সমালোচনা প্রশমনের চেষ্টা করতে পারে। এর ফলে অপরাধ বা ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা একটি অনাকাঙ্খিত দুষ্ট চক্রের মধ্যে পড়ে যেতে পারে।

তাই, অপরাধ সম্পর্কে জনগণের সচেতনতাই যথেষ্ঠ নয়। অপরাধ প্রতিরোধের জন্য জনগণকে শ্রেফ সচেতনতার বাইরেও অপরাধ প্রতিরোধ কাজে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে হবে। সমাজের প্রত্যেকটি নাগরিককে সমাজের অন্যান্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সাথে অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে, অপরাধকে সমস্যা হিসেবে দেখে সেই সমস্যা সমাধানের পথে নিজেকে অন্যতম অংশীদার ভাবতে হবে।