ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

সান ফ্রান্সিসকো পুলিশের সাহসী, দক্ষ ও নিবেদিতপ্রাণ ইন্সপেক্টর হ্যারি কালাহান। সবচেয়ে কঠিন, ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল অভিযানগুলোর দায়িত্ব পড়ে হ্যারির উপর। তবে আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও জন-শান্তি রক্ষা করা সম্ভব নয় বলে হ্যারির বিশ্বাস।

তাই সুযোগ পেলেই আইনী প্রক্রিয়াকে নিজের মতো করে প্রয়োগ করেন ইন্সপেক্টর হ্যারি। অপরাধীদের জঘন্য কাজের মোকাবিলার জন্য হ্যারি জঘন্য উপায়ই অবলম্বন করে থাকেন। শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন, ছলনা, বিশ্বাসভঙ্গ ইত্যাদির মাধ্যমে স্বীকারোক্তি আদায়, আইন বহির্ভূতভাবে অপরাধীদের ফাঁসানোর জন্য আলামত গুঁজে দেওয়া ইত্যাকার কর্মকে তিনি জনস্বার্থে সঠিক ও অত্যাবশ্যক বলেই মনে করেন। অপরাধ দমনে আদালতের চুলচেরা বিশ্লেষণ হ্যারির কাছে উটকো ঝামেলা স্বরূপ।

তবে হ্যারির এই মনোভাব এক দিনে গড়ে ওঠেনি। পুলিশি জীবনের বিয়োগাত্মক ঘটনাগুলোর অভিজ্ঞতা, অপরাধীদের প্রতি আইনের যথাযথ প্রক্রিয়ার নামে আদালতের অন্ধত্ব এবং জঘন্য প্রকৃতির অপরাধ সংঘটন করেও আইনের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির অপরাধীর ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকার মতো হাজারো ঘটনা হ্যারির এই মানসিকতা তৈরিতে নিরবিচ্ছিন্ন ভূমিকা রেখেছে। আইনের যথাযথ প্রক্রিয়ার প্রতি ইন্সপেক্টর হ্যারির বিতৃঞ্চা সৃষ্টির পিছনে এখানে আমরা কতিপয় ঘটনা ও পরিস্থিতির বর্ণনা দিব।

স্করপিও নামে একজন বিকৃত মানসিকতার জঘন্য অপরাধী একটি সুইমিংপুলের পার্শ্ববর্তী ইমারতের ছাদ থেকে অত্যাধুনিক রাইফেলের নিশানা করে এক মহিলাকে হত্যা করে। ইন্সপেক্টর হ্যারি ঘটনার অনুসন্ধান করতে গিয়ে একটি চিরকুট আবিষ্কার করেন। চিরকুটে খুনি স্করপিও নগর প্রশাসনের কাছে লিখেছে, তাকে এক লাখ ডলার চাঁদা না দিলে তার এই খুনের ধারা চলতেই থাকবে। চাঁদা না দেওয়া পর্যন্ত সে প্রতিদিনই একজন করে মানুষ খুন করবে। তার পরবর্তী লক্ষ্য হবে যথাক্রমে একজন কৃঞ্চাঙ্গ ও একজন গির্জার ফাদার।

স্করপিও তার দাবী পূরণ না হওয়ায় একই কায়দায় দূর থেকে গুলি করে এক কৃঞ্চাঙ্গ বালককে হত্যা করে। পুলিশ বুঝতে পারে দাবী পূরণ করা না হলে স্করপিও তার খুনের ধারা অব্যহত রাখবে। তার কথা মতো সে এবার একজন গির্জার ফাদারকে হত্যা করবে। হ্যারি তার দলের একজন পুলিশ অফিসারকে ফাদার সাজিয়ে এক গির্জায় স্করপিওর জন্য ফাঁদ পাতে। ফাঁদে পা দিলেও স্করপিওকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয় না। সে গুলি করে গির্জার ফাদাররূপী পুলিশ অফিসারকে খুন করে এবং অক্ষত অবস্থায় পালিয়ে যায়।

এর পর স্করপিও এক কিশোরীকে অপহরণ করে ধর্ষণের পর জ্যান্ত কবর দেওয়ার কথা বলে পূর্বের চেয়ে দ্বিগুণ পরিমাণ মুক্তিপণ দাবী করে। সানফ্রান্সিসকো শহর কর্তৃপক্ষ এবার স্করপিওকে চাঁদা দিতে রাজি হয় এবং ইন্সপেক্টর হ্যারিকে কোন প্রকার চাতুরির আশ্রয় না নিয়েই স্করপিওকে চাঁদা পরিশোধ করে অপহৃত কিশোরীকে উদ্ধারের নির্দেশ দেয়। কিন্তু হ্যারি কর্তৃপক্ষের নিষেধ সত্ত্বেও গোপনে অস্ত্রসজ্জিত হয়ে চাঁদা পরিশোধ করতে যায়। স্করপিও হ্যারিকে বিভিন্ন টেলিফোন বুথে পাঠিয়ে একের পর এক স্থান পরিবর্তন করে নিশ্চিত হয় যে তার সাথে কেউ নেই। অবশেষে এক পার্কে তাদের যুদ্ধ হয়। স্করপিও হ্যারিকে ভীষণভাবে আহত করে। শেষ পর্যন্ত তার সহযোগী গঞ্জালেস হ্যারিকে বাঁচাতে আসে। স্করপিও মুক্তি পণের টাকা না নিয়েই আহত অবস্থায় পালিয়ে যায়।

পরে হ্যারি স্করপিওর বাসায় হানা দিয়ে তার ক্ষত পায়ে গুলি করে। কিন্তু অপহৃত কিশোরীর অবস্থান সম্পর্কে স্করপিও কোন তথ্য দিতে অস্বীকার করে। সে আইন অনুসারে একজন আইনজীবীর সহায়তার জন্য দাবী করে। কিন্তু আইনের যথাযথ প্রক্রিয়ায় কর্ণপাত করার মতো মানসিকতা ও পর্যাপ্ত সময় ইন্সপেক্টর হ্যারির কাছে ছিল না। হ্যারি স্করপিও এর ক্ষতিগ্রস্ত ও গুলিতে ভেঙ্গে যাওয়া পায়ের উপর নির্দয়ভাবে দাঁড়িয়ে তাকে নির্যাতনের মাধ্যমে স্বীকারোক্তি আদায় করে। কিন্তু স্করপিও নির্যাতনের এক পর্যায়ে স্বীকার করে যে সে অপরহৃত কিশোরীকে ধর্ষণের পর ইতোমধ্যেই হত্যা করেছে।

স্করপিও এর বিচার চলে। কিন্তু স্করপিওকে আটক, তার বাসা তল্লাশী, অস্ত্র ও আলামত উদ্ধার ইত্যাদি ক্ষেত্রে ইনসপেক্টর হ্যারি কালাহান ও তার দল আইনে নির্দেশিত পদ্ধতিসমূহ অনুসরণ করে নাই। তাই স্করপিওর বিরুদ্ধে সংগ্রহীত আলামত ও সাক্ষ্য আদালত আমলে নিতে অস্বীকার করে। বিচারের রায় স্করপিও এর পক্ষে যায়। স্করপিও বেকসুর খালাস পায়।

নিরলস অধ্যবসায় ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে আটকৃত স্করপিওর আদালতে সাজা না হওয়ার জন্য ইন্সপেক্টর হ্যারি অত্যন্ত মনঃকষ্টে ভুগতে থাকেন। তিনি স্করপিওকে অনুসরণ করতে থাকেন। ধূর্ত স্করপিও হ্যারিকে নিবৃত করার জন্য একজন গুণ্ডাকে ভাড়া করে নিজেকে নির্দয়ভাবে কিন্তু নিয়ন্ত্রিত উপায়ে মারপিট করিয়ে নেয় এবং এর জন্য হ্যারিকে দোষারোপ করে। কর্তৃপক্ষ স্করপিও এর ধূর্ততা বুঝতে না পেরে স্করপিওকে বিরক্ত না করার জন্য হ্যারির প্রতি নির্দেশ জারি করে।

সর্বশেষ স্করপিও একটি ছাত্রভর্তি স্কুল বাস হাইজ্যাক করতঃ বিরাট অংকের মুক্তিপণ দাবী করে। নগধ অর্থ ছাড়াও সে একটি বিমান দাবী করে যাতে করে সে দেশত্যাগ করবে। এবার পুলিশ ও সানফ্রান্সিসকোর মেয়র কাল বিলম্ব না করে মুক্তিপণ দিতে রাজি হয়। অনড় মানসিকতার জন্য ইন্সপেক্টর হ্যারি কালাহানকে এবারে কোন দায়িত্ব দেওয়া হয় না। কিন্তু হ্যারি জানে ও বোঝে যে স্করপিও এর মতো জঘন্য সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কিরূপ আচরণ শোভনীয়। তিনি কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই হাইজ্যাককৃত বাসকে অনুসরণ করেন। রেল ক্রসিং এর গেটের উপর থেকে তিনি বাসের ছাদে উঠে পড়ে কৌশলে স্কুল ছাত্রদের মুক্ত করেন। অপহরণকারী স্করপিও নিকটবর্তী পাহাড়ে পালিয়ে যায়। ইন্সপেক্টর হ্যারি তাকে অনুসরণ করেন। এক পর্যায়ে স্করপিও একটি বালককে অপহরণ করে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। হ্যারি আত্ম সমর্পণের ভান করে স্করপিওকে গুলি করেন। বালকটি মুক্ত হয়। হ্যারি স্করপিওর বুকের উপর উঠে পড়ে। তার হাতের পিস্তলটি পড়ে যায়। সে হাতড়িয়ে তা নেওয়ার চেষ্টা করে। হ্যারি স্করপিও এর বুকের মধ্যে গুলি করেন। এর পর তার লাশটি ঘোরাতে ঘোরাতে লেকের পানিতে নিক্ষেপ করেন। স্করপিও এর লাশ পানিতে ভাসতে থাকে। ইন্সপেক্টর হ্যারি কালাহান তার পুলিশের নাম-পদবির ব্যাজগুলো ছিঁড়ে পুকুরের পানিতে ছুড়ে ফেলে দিয়ে হাঁটতে থাকে।

সন্ত্রাসী স্করপিও এর জীবনের সাথে সাথে হ্যারি তার পুলিশি জীবনেরও পরিসমাপ্তি ঘটান। যথাযথ আইনী প্রক্রিয়ার শৃঙ্খলে বন্দি পুলিশি জীবনকে তিনি আর মেনে নিতে পারেন না। হাজার হাজার নিরীহ মানুষের জীবন ও সম্পত্তির প্রতি অমানুষিকভাবে আঘাত হেনে যে অপরাধীগণ তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অবলিলায় চালিয়ে যাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে আইনই প্রধানতম বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। সন্ত্রাসীগণ যখন শত শত মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে তখন আইন থাকে নিশ্চুপ। অথচ শত শত আদম সন্তানের হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে গ্রেফতার বা তল্লাশী অভিযান পরিচালনা করতে আইনের সামান্যতম বিচ্যূতি বিচার-ব্যবস্থায় সহ্য করা হয় না। জঘন্য খুনি বা সন্ত্রাসীকেও গ্রেফতার কিংবা, জিজ্ঞাসাবাদের সময়, স্বীকারোক্তি আদায়কালে আইনজীবীর সহায়তা দিতে হয়। নারী, শিশু, বৃদ্ধ, যুবা যখন স্করপিও এর মতো জঘন্য অপরাধীদের দ্বারা নিহত হয়, তখন কোথায় থাকে আইন? কোথায় থাকে মানবতা?

পুলিশ ইন্সপেক্টর হ্যারি কালাহান কোন বাস্তবের চরিত্র নয়। বিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশকে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা পৃথিবীতে সাড়া জাগানো একাধিক চলচ্চিত্রের কাল্পনিক চরিত্র হ্যারি কালাহান। কিন্তু ছায়াছবির ছায়া চরিত্র হলেও ইন্সপেক্টর হ্যারি কালাহানের এই সব প্রশ্ন ফৌজদারি বিচার-ব্যবস্থায় একটি জটিলতম ধাঁ ধাঁ। এক দিকে বিকৃত মানসিকতার অপরাধীদের প্রতিনিয়ত আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শনের মাধ্যমে নির্বিঘ্নে অপরাধ চালিয়ে যাওয়া, অন্য দিকে যথাযথ আইনী প্রক্রিয়ার শক্ত জালে আবদ্ধ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী; এক দিকে অপরাধীদের গ্রেফতার করে সাজা দেওয়ার জন্য জনগণের প্রবল দাবী অন্য দিকে অপরাধীর মানবাধিকার অঙ্ঘণের অভিযোগ; এক দিকে পুলিশকে অপরাধীদের বিরুদ্ধে অকার্যকর বলে জাহির করা, অন্য দিকে পুলিশকে হাজার হাজার আইনী নির্দেশনায় জাড়িয়ে তাদের মনোবল নষ্ট করা ইত্যাকার হাজারো হেঁয়ালীতে ভরা পুলিশের কর্মজীবন।

পুলিশ-জগতে এই সমস্যাকে অপরাধ বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন ‘ডার্টি হ্যারি’ বা ‘নোংরা হ্যারি সমস্যা’। শুধু আমাদের দেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতেই নয়, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশগুলোতেও পুলিশ ‘নোংরা হ্যারি সমস্যার’ ভারে জর্জরিত। জনগণ প্রাত্যহিক জীবনে পুলিশের আইনগত প্রক্রিয়ার খুঁটিনাটি বুঝতে চায় না। তারা চায় জঘন্য অপরাধীদের গ্রেফতার, বিচার ও শাস্তি। কিন্তু যথাযথ আইনী প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এই সব জঘন্য প্রকৃতির বুদ্ধিমান সন্ত্রাসীদের ঘায়েল করা অত্যন্ত দূরুহ এবং অনেক ক্ষেত্রে অসম্ভবও বটে। যথাযথ আইনী প্রক্রিয়া অবলম্বন করে অপরাধীদের বিচার করা হল রাষ্ট্রের নীতি, মানবিক নৈতিকতা। অন্য দিকে, আইনের খুঁটিনাটি পুলিশের কার্যকারিতাকে খর্ব করে। অবলিলায় আইন ভঙ্গকারীদের জন্য সযত্নে আইন রক্ষার ‘নোংরা হ্যারি’ হেঁয়ালীতে আক্রান্ত আজ গোটা বিশ্বের পুলিশ ব্যবস্থা।

রচনা সূত্রঃ
1. http://www.ewritegigs.com/essay-on-dirty-harry-problem/
2. http://en.wikipedia.org/wiki/Dirty_harry
3. http://www.kyoolee.net/Dirty_Harry_Problem__the_-_Klockars.pdf