ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

দুর্নীতি সংক্রান্ত অভিযোগের একক অংশীদার পুলিশ নয়। পুলিশের দুর্নীতির একটি বিরাট অংশের সূচনা ঘটায় সাধারণ মানুষই। পুলিশি সেবার কঠিন দিকগুলোকে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করার জন্য মাঠের মুটে-মজুর বা অফিসের ছাপোষা কেরানি থেকে শুরু করে চেম্বার্স অব কমার্সের কোটিপতি ব্যবসায়ীটি পর্যন্ত মরিয়া হয়ে ওঠে। । মানুষ দুর্নীতির মাধ্যমে তাদের অবৈধ সুবিধাটুকু আদায় করতে পুলিশকে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করতে চায়।

অনেক মানুষ বিভিন্ন কায়দায় পুলিশের ঘুষগ্রহণের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে। কিন্তু তাদের যখন কোন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দিতে বলা হয়, তখন অভিযোগ দিতে কেউ রাজি হয় না। বলতে কী আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষেরই পুলিশের ক্ষমতা-অক্ষমতা সম্পর্কে বাস্তব কোন অভিজ্ঞতা নেই। টিআইবি এর একটি জরিপে দেখানো হয়েছে বাংলাদেশের শতকরা মাত্র ২৬ ভাগ মানুষ পুলিশের সেবা প্রার্থী হয়। (এই হার যদিও সন্দেহ পোষণ করার মতো বেশি। কারণ, মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্রে এটা ১৯ থেকে ২১ এর মধ্যেই উঠানামা করে।) অথচ দোষারোপ করার ব্যাপারে দেশের সবাই একাট্টা।

এ সম্পর্কে আমেরিকার মেডিসন অংগ রাজ্যের উনসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসার ও পুলিশ গবেষক হারমাইন গোল্ডস্টাইনের একটি উক্তি উল্লেখ করার মতো। তার Policing a Free Society বইটিতে পুলিশের দুর্নীতি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন,

‘Unlike other forms of wrongdoing, corruption is to a great extent initiated and sustained by the community. There is seldom a clearly identifiable victim or a complaint

[অন্যান্য অপকর্মগুলোর বিপরীতে দুর্নীতি বহুলাংশে সমাজের মানুষই শুরু করে ও অব্যহত রাখে। দুর্নীতির সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্তযোগ্য ভূক্তভোগী কদাচিৎ পাওয়া যায়]

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ও প্রাক্তন সচিব বদিউর রহমান চট্টগ্রাম বন্দরে দুর্নীতির ব্যাপারে একবার আমদানিকারকদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘দোহাই আপনাদের, অন্তত কয়েকটা দিন ঘুষ দিবেন না। ধৈর্য্য ধরুণ’। কিন্তু, আমদানীকারকগণ তার কথায় কর্ণপাত করেননি। আমদানীকারকসহ যেনতেন উপায়ে নিজের কাজটি নিজের মনের মতো করে করিয়ে নেওয়া গোষ্ঠীগুলো উৎকোচের উদ্ভট নাম দিয়েছেন speed money ‘ত্বরায় করার অর্থ’।

অর্থ-বিত্তহীন মানুষগুলোকে পিছনে ফেলে অর্থবলে নিজেরা এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে উৎকোচভোগী সরকারি কর্মচারিগণ এদের বড় প্রিয়। সৎ সরকারি কর্মচারিগণ এদের কাছে মুনাফা ধ্বংসকারী। তাদের কাছে সৎলোকজন পাগলেরও অধম–উৎকৃষ্ট শ্রেণির আহম্মক। কারণ, এরা নিজেরে ভাল বোঝে, যা বদ্ধ পাগলেও বোঝে।

আমাদের দেশের অধিকাংশ লোকই থানা পুলিশের কাছ থেকে আইনী কাজটি আইনগতভাবে নয়, তাদের মনের মতো করে আদায় করতে চান। আর এ জন্য যা হবার তাই হয়। তারা পুলিশকে ঘুষগ্রহণে অনুরোধ, উপরোধ ও প্রলুব্ধ করেন; অনেক ক্ষেত্রে বাধ্যও করেন। কিন্তু দোষ দেওয়ার ব্যাপারে তারা নিজেরা কেউ কারো চেয়ে কম নন। আর নিজেরা একদম ধোয়া তুলশির পাতা। দোষ যদি কিছু হয়েই থাকে, তা পুলিশের; তাদের নয়।

দুর্নীতি প্রতিরোধে বা নিয়ন্ত্রণের জন্য তাই শুধু পুলিশ বা সরকারি কর্মচারিদের নয়, আমাদের সমাজের সেই সব মানুষের বিরুদ্ধেও অভিযান চালানো দরকার যারা পরিকল্পিতভাবে উৎকোচ দিয়ে নিজেদের অবৈধ স্বার্থ দ্রুত উদ্ধার করতে চায়। শুদ্ধতার পাঠ শুধু সরকারকেই নিলে চলবে না, সরকারের বাইরে সাধারণ নাগরিকদেরও নিতে হবে।