ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

পুলিশের বিনা পরোয়ানায় সন্দেহবশত গ্রেফতারের ক্ষমতার ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারাটি একমাত্র আইনী অস্ত্র নয়। যেকোন ধর্তব্য অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশ বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের ক্ষমতা রাখে। যেখানেই আইনের অন্যান্য ধারায় কিছুটা অস্পষ্টতা থাকে সেখানে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট আইনেই পৃথক ধারার মাধ্যমে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়।

তবে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারাটি হল অত্যন্ত সাধারণধর্মী। এই ধারাটি যে কোন অবস্থায় গ্রেফতারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে।এই ধারায় মোট নয়টি ক্লস বা অনুচ্ছেদ রয়েছে। প্রত্যেক অনুচ্ছেদেই গ্রেফতারের ক্ষেত্রে কিছু না কিছু শর্ত দেওয়া হয়েছে। অনুচ্ছেদগুলোর মধ্যে ২-৯ নম্বর অনুচ্ছেদের মধ্যে কোন বিতর্ক বা অষ্পষ্টতা নেই। কিন্তু প্রথম অনুচ্ছেদটি নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে।

প্রথম ক্লসটির রয়েছে চারটি অংশ। যে কোন পুলিশ অফিসার গ্রেফতার করতে পারে-
১. ধর্তব্য অপরাধের সাথে জড়িত যে কোন ব্যক্তিকে;
২. ধর্তব্য অপরাধে জড়িত থাকার যুক্তিসংগত অভিযোগ করা হয়েছে এমন ব্যক্তিকে;
৩. ধর্তব্য অপরাধে জড়িত থাকার বিশ্বাসযোগ্য খবর পাওয়া গেছে এমন ব্যক্তিকে; এবং
৪. যার বিরুদ্ধে ধর্তব্য অপরাধে জাড়িত থাকার যৌক্তিক সন্দেহ রয়েছে।

এই সব শর্তের প্রথম তিনটিতে যথেষ্ঠ স্পষ্টতা রয়েছে। তবে চতুর্থটি বেশ অস্পষ্ট এবং এই অংশটিই মূলত বিতর্কের কেন্দ্র বিন্দুতে অবস্থান করে।

কিন্তু শত বিতর্ক সত্ত্বেও ৫৪ ধারার বিপ্লবাত্মক পরিবর্তনের সুযোগ খুবই সীমীত। কার্যকর পুলিশিং শুধু নয়, আমি বলব, আপনি যদি পুলিশের অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন, তাহলে ৫৪ ধারার মতো আইনী বিধানের অনস্বীকার্যতা আপনাকে স্বীকার করতেই হবে। যদি বলি পুলিশ ও বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার একই মূদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ, তাহলে আমি খুব বেশি ভুল বলব না।

২০০৩ সালের ৭ এপ্রিল হাইকোর্ট বিভাগের মহামান্য বিচারপতি মোঃ হামিদুল হক ও বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরীর দ্বৈত বেঞ্চ ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ও ১৬৭ ধারার বিষয়ে যে রায় দিয়েছিলেন সেখানে ৫৪ ধারার প্রথম অনুচ্ছেদ ও ৭ নম্বর শর্তে সামান্য কিছু পরিবর্তন আনাসহ একটি উপধারা সংযুক্ত করার কথা বলা হয়েছিল। তবে এই বিষয়টির এখনও সুরাহা হয়নি। ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারার কোন পরিবর্তন সম্বলিত কোন বিল মহান সংসদে পাশ হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই।

তবে যদি এই ধারায় আদালত নির্দেশিত পরিবর্তন যদি আসত, তাহলে একই বিধির অন্যান্য ধারাসহ বিশেষ আইনগুলোতে বর্ণিত পুলিশি ক্ষমতা অক্ষুন্ন রেখে পুলিশের বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের ক্ষমতার অপব্যবহার যে বন্ধ হয়ে যেত তা অনুমান করা সংগত নয় । অন্যদিকে ৫৪ ধারায় কোন ধরণের পরিবর্তন আনা হলে পুলিশের প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ডে যে ছন্দপতন ঘটবে তা দুর করার জন্য অন্যান্য আইনে স্বাভাবিক কিছু পরিবর্তন আসতে পারে, এমনকি নতুন আইনগুলোকে ৫৪ ধারার বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের ক্ষমতার পরিপুরক ক্ষমতা দিয়ে সাজানো হতে পারে। কার্যক্ষেত্রে যা ৫৪ ধারায় প্রদত্ত পুলিশি ক্ষমতার চেয়ে কম বিতর্কের হলেও নাগরিকদের অবাধ চলাফেরার স্বাধীনতার জন্য বেশি মারাত্মক হতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ আমাদের দেশে প্রচলিত মেট্রোপলিটন পুলিশ আইনগুলোর প্রত্যেকটিতেই বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের নিজস্ব ধারা সংযোজিত হয়েছে। প্রতিদিন এই সব ধারায় শত শত নাগরিক গ্রেফতার হচ্ছে। এই সব গ্রেফতারের সবগুলোতেই যে পুলিশ-প্রজ্ঞার যৌক্তিক প্রতিফলন ঘটে, তার নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারার মতো আলোচিত না হওয়ায় এই সব ধারার অপব্যবহার আমাদের অজ্ঞাতই থেকে যাচ্ছে। আলোচিত হচ্ছে না বলে অদক্ষ পুলিশের জন্য এই জাতীয় আইনের বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের ক্ষমতা প্রয়োগ করা অনেকটাই নিরাপদ হয়ে উঠছে।

ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারার যৌক্তিকতা ব্যাখ্যায় আমরা কিছু আটপৌরে উদাহরণ টানতে পারি। যেমন ধরুন, আমাদের প্রত্যেকের ঘরে মাছ-মাংস-শাক-সবজি কাটার জন্য চাকু, ছুরি বা বটি রয়েছে। এগুলো যে কোন বর্ণানায় এক একটি অস্ত্র। আমাদের কৃষকগণ যে কাস্তে দিয়ে ধান কাটেন, হাসুয়া দিয়ে পাট কাটেন এবং কোদাল দিয়ে মাটি কাটেন সেগুলোও রীতিমত অস্ত্র। মুসলমানদের ঘরে ঘরে কোরবানির ঈদের আগের রাতে যদি তল্লাসি চালাই তাহলে বাংলার তাবৎ মুসলমানকে মারাত্মক দেশি অস্ত্র বিনা লাইসেন্সে ঘরে মজুদ করার জন্য ৫৪ ধারায় নয়, অস্ত্র আইনের সুনির্দিষ্ট ধারায় গ্রেফতার করা যাবে। কিন্তু তাই বলে পুলিশের সেই কাজটি কি জনগণ অনুমোদন দিবেন? কাস্তে-কোদাল-হাসুয়া-শাবল নিষিদ্ধ করলে আমাদের অর্থনীতি কি ঠিক থাকবে? আমরা কি সুচারুরূপে যাপন করতে পারব আমাদের প্রাত্যহিক জীবন? আমার গভীর বিশ্বাসজাত উত্তর হবে, না।

তাহলে দাঁড়াল কি? আমাদের রান্না ঘরের বটি দিয়ে মানুষ খুন করা সম্ভব। এটা একটি ধারাল অস্ত্র। এটা বিশেষ পরিস্থিতিতে কাছে রাখলে অস্ত্র আইনে দণ্ডনীয় হয়। কিন্তু তাই বলে রান্না ঘরের বটিকে নিষিদ্ধ করার দাবি কেউ তোলেন না। মুসলমানের ঘরে কোরবানির গরু জবাই করার জন্য শান দেওয়া ছুরিকে কেউ অবৈধ মনে করেন না।

রান্না ঘরের বটি যাতে রান্নার সামগ্রি কাটাকাটি কিংবা কশাইয়ের দা গরু জবাই ভিন্ন অন্য কোন কাজে যাতে ব্যবহার করা না হয়, তার জন্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে হয়। এই ছুরি অবুঝ, মাতাল কিংবা পাগলের কাছে সমর্পন করতে নেই। যদি প্রয়োজন হয় শিশুকে সাবালক করে তুলতে হবে, মাতালের মদ বন্ধ করে দিতে হবে এবং পাগলের চিকিৎসা করাতে হবে। কিন্তু রান্নাঘরের বটি নিষিদ্ধ করা যাবে না। যদি করি তাহলে আমাদের পেটে ভাত জুটবে না।

ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারাটিও এমনি ধরণের। এই ধারায় পুলিশকে যে ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে তা অত্যন্ত প্রত্যাশিত। যে কোন পুলিশ সংগঠনের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য এই ক্ষমতা অভাবিত নয়। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৫ ধারা ভিন্ন অন্যান্য ধারা কিংবা বিশেষ আইন সমূহের ধারা সমূহে গ্রেফতা, উদ্ধার, তল্লাশী, তদন্ত ইত্যাদি বিষয়ে প্রায় সকল ক্ষেত্রেই পুলিশ অফিসারদের সুনির্দিষ্ট পদবীর শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ৫৪ ধারায় বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের জন্য পুলিশের কাধে র‌্যাংক-ব্যাজ থাকার জরুরৎ নেই। পুলিশ মাত্রই ৪৫ ধারায় বিনাপরোয়ানায় গ্রেফতারের ক্ষমতাপ্রাপ্ত। তাই বিপুল বিতর্কের জন্ম দিলেও এই ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতা ন্যূনতম। এই টুকু না থাকলে পুলিশ চলে না। আর হ্যাঁ, সদ্যজাত গোখরা সাপও যেমন প্রাণঘাতী বিষ বহন করে, তেমনি ৫৪ ধারায় ক্ষমতাটুকু ন্যূনতম হলেও প্রজ্ঞাহীন পুলিশ সদস্যদের হাতে পড়ে তা মারাত্মক গণ-অশান্তি ও নাগরিক-নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করতে পারে। এমতাবস্থায়, সর্বস্তরের পুলিশ সদস্যদের প্রজ্ঞাবাণ করে গড়ে তোলার বিকল্প নেই। একই সাথে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের ঘটনাগুলোর তাৎক্ষণিক পরীবিক্ষণ ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে। প্রয়োজনে যুগোপযোগী ব্যবস্থা চালু করতে হবে।