ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

শাস্তি হিসেবে মৃত্যু দণ্ডের বিধান বর্তমানে একটি অত্যন্ত বিতর্কিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। খোদ জাতিসংঘসহ পৃথিবীর প্রায় সকল বহুজাতিক সংগঠনই মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি রহিত করার পিছনে সোচ্চার হয়ে উঠেছে। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৬২/১৪৯ রেজুলুশনের মাধ্যমে যে সকল সদস্য রাষ্ট্র এখনও শাস্তি হিসেবে মুত্যুদণ্ডের বিধান বহাল রেখেছে তাদের ক্রমশ এই বিধান থেকে সরে আসার আহব্বান জানিয়ে প্রস্তাব পাশ করেছে।

বলাবাহুল্য, প্রাচীন কাল থেকেই পৃথিবীতে অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি বিশেষত হত্যার অপরাধের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান প্রায় সকল জাতি ও রাষ্ট্রের মধ্যই বহাল ছিল। খ্রীস্টপূর্ব ১৭৫০ সালেও পারস্যের হাম্বুরাবির আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান ছিল। খ্রীস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীতে গ্রীক সম্রাট ড্রাকোর প্রবর্তিত আইনে সকল অপরাধের জন্যই এক মাত্র শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড। বাইবেলে প্রায় ৩০টি অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধানের উল্লেখ আছে। ১৮০০ সালের মধ্যে ব্রিটেনে প্রায় ২০০টি অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান ছিল। মুসলিম শরিয়া আইনে মৃত্যুদণ্ড একটি বহুল প্রচলিত শাস্তি। অবৈধ যৌন-সম্ভোগ, হত্যা প্রভৃতি অপরাধের জন্য শিরচ্ছেদ কিংবা পাথর নিক্ষেপ করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রচলন সৌদি আরবসহ বেশ কয়েকটি মুসলিম দেশে এখনও লক্ষ্য করা যায়।

তবে ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকেই শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান নিয়ে মানবতাবাদী লেখক, দার্শনিক ও সমাজ সংস্কারকগণ প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন। মৃত্যুদণ্ডকে তারা মানবতা বিরোধী, অমানবিক ও অবমাননাকর শাস্তি বলে মনে করেন। অপরাধ বিজ্ঞানী সিজার বেকারিয়ার মতে হত্যা একটি অপরাধ। সমাজ হত্যাকে ঘৃণা করে। কিন্তু শাস্তি হিসাবে সেই হত্যাই যখন সমাজ ঠাণ্ডা মাথায় কোন মানুষের উপর আরোপ করে, তখন সেই সমাজকে সভ্য সমাজ বলা যায় না। জীবন স্রষ্টার অমূল্য দান। মানুষ কোন মানুষকে জীবন দিতে পারে না। তাই জীবন নেবার অধিকার মানুষের থাকার কথা নয়। এটা হত্যাকারীর জন্য যেমন সত্য, তেমনি হত্যার অপরাধের যিনি বিচার কামনা করেন বা বিচার পরিচালনা করেন তার ক্ষেত্রেও তেমনি সত্য। তাই মানুষের মৃত্যু ঘটনার সিদ্ধান্ত দেবার এখতিয়ার কোন মানুষের নেই।

মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে জোরালো যুক্তিগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান যু্ক্তি হল, এই শাস্তি শুধু অপরাধীকেই নয়, উদাহরণ সৃষ্টির মাধ্যমে এটা সম্ভাব্য অপরাধীদের সমজাতীয় অপরাধকর্ম থেকে বিরত রাখে। কিন্তু, এই জোরালো যুক্তির বিপক্ষে অধিকতর জোরালো পাল্টা যুক্তিও রয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা হয়, রানী প্রথম এলিজাবেথের সময় (১৫৩৩-১৬০৩) ব্রিটেনে পকেটমারের অপরাধের শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড। সেই সময় মৃত্যুদণ্ড প্রকাশ্য স্থানে জনসম্মুখে কার্যকর করা হত। এর উদ্দেশ্য ছিল জনগণকে দেখানো যে অপরাধী বা পকেট মারের অনিবার্য পরিণতি কি। কিন্তু পকেটমারের মৃত্যুদণ্ড প্রদান অনুষ্ঠানে যে জনসমাগম হতো সেই সমাগমেও অনেকের পকেট মার যেত। জীবন্ত মানুষকে ছিন্ন-ভিন্ন করার শাস্তি অপরাধীদের মনে কোন প্রতিক্রিয়াই সৃষ্টি করত না।

ইতিহাসে সর্বপ্রথম মৃত্যুদণ্ডের বিধান রহিত করা হয় আমেরিকার মিশিগান রাষ্ট্রে ১৮৪৬ সালে। এরপর ১৮৬৭ সালে ভেনিজুয়েলা এবং ১৮৭০ সালে নেদারল্যান্ডস সেই পথ অনুসরণ করে। ১৯৭০ এর দশকে সারা বিশ্বে শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান বিলুপ্ত করার হিড়িক পড়ে যায়। ১৯৮৬ সাল নাগাধ পৃথিবীর প্রায় ৪৬ টি দেশের বিচার ব্যবস্থা থেকে সকল প্রকার অপরাধের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধান বিলুপ্ত করা হয়। ক্রমশ এই সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং ২০১২ সালে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৭টিতে। সর্বশেষ এই দলে যোগ দেয় লাটভিয়া প্রজাতন্ত্র। এছাড়াও বিশ্বেও প্রায় ৮টি দেশে সাধারণ অপরাধের জন্য কোন মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় না। ৩৫ টি দেশে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেও তা কার্যকর করা হয় না। সেই বিবেচনায় বলা যায়, বর্তমান বিশ্বে প্রায় ১৪০ রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থায় হয় মৃত্যুদণ্ড নেই, কিংবা থাকলেও তা কার্যকর করা হয় না। এমতাবস্থায়, বিশ্বে বর্তমানে মৃত্যুদণ্ডের বিধানওয়ালা রাষ্ট্রগুলোই সংখ্যা লঘু। এদের সংখ্যা মাত্র ৫৮টি।

সাম্প্রতিক ঘটনা ও ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান দ্রুতই কার্যকরিতা হারিয়ে সেকালে হয়ে যাচ্ছে। নিবারক হিসেবে এই শাস্তির মূলত কোন ভূমিকাই নেই। যে সব দেশ এখনও মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি বহাল রেখেছে, সেই সব দেশেই হত্যাসহ অন্যান্য সহিংস অপরাধের হার বেশি। মৃত্যুদণ্ডের বিধান উঠিয়ে দিলে হত্যার মতো অপরাধ বৃদ্ধি পাবে বলে যে ধারণা পোষণ করা হয় তা নিতান্তই ভুল। এর জলন্ত উদাহরণ হল কানাডা। কানাডিয়ান বিচার ব্যবস্থা থেকে ১৯৭৬ সালে হত্যার অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি তুলে দেওয়া হয়। বর্তমানে এখানে কোন অপরাধের জন্যই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় না। অথচ ১৯৭৫ সাল থেকে বর্তমান কালের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে কানাডায় খুনের হার ৪০ শতাংশ কমেছে।

বাংলাদেশের দণ্ডবিধিতে ৮টি, বিশেষ ক্ষমতা আইনে ৫টি ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ৫টি সহ প্রায় ডজন দুয়েক অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। প্রতিবছরই নতুন নতুন অপরাধের শাস্তির বিধান করে নিত্য নতুন আইনও পাশ করা হচ্ছে। কিন্তু হত্যার মতো অপরাধ তাই বলে কোন দিনই কমে নাই। বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে ১৯৯০ সালে যেখানে সারাদেশের খুনের মামলা হয়েছিল ২২০৬টি ২০১০ সালে তা ছিল ৩৯৮৮টি। যদিও এই বৃদ্ধি আসঙ্কাজনক কিছু নয়, তবুও মৃত্যুদণ্ডের বিধান এই নিম্ন হারের জন্য দায়ী বলে মনে করার কোন কারণ নেই।

বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা থেকে মৃত্যুদণ্ডের বিধান তুলে দেওয়ার জন্য এখন পর্যন্ত সরকারি সূত্র থেকে কোন প্রতিশ্রুতি কিংবা বেসরকারি কোন প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠী থেকে দাবী তোলা হয়নি। কারণ, দেশের জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই বিধানের প্রতি একটি ঐক্যবদ্ধ জনমত রয়েছে। প্রতিনিয়তই কোন অপরাধের প্রতিবাদ করতে গিয়ে ছোটখাট অপরাধের জন্যও প্রতিবাদকারীগণ অভিযুক্তদের সরাসরি মৃত্যুদণ্ডের দাবী তোলেন। এমতাবস্থায়, দেশের বিচার ব্যবস্থা থেকে মুত্যুদণ্ডের বিধান তুলে দেওয়ার কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া তো দূরের কথা এমন মত পোষণ করাও এখানে ঝুঁকিপূর্ণ।

তবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান স্থগিত রাখার আহব্বান নিয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত প্রস্তাবের বাইরে বাংলাদেশ নয়। অন্যদিকে মৃত্যুদণ্ডের শাস্তির পরিবর্তে যাবজ্জীবন বা দীর্ঘমেয়াদের কারাবাসের শাস্তির বিধান ক্রমশই জোরদার হচ্ছে। বর্তমানে মৃত্যুদণ্ডের পক্ষের রাষ্ট্র তথা সমাজের সংখ্যাই লঘিষ্ঠ। প্রতিবছরই মৃত্যুদণ্ডহীন রাষ্ট্রের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা, যেমন, ইউরোপিয়ান কমিশন, তাদের সদস্য হওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে মৃত্যুদণ্ড রহিত করা জুড়ে দিয়েছে। মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা না রাখার বিষয়টি কোন এক সময় রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে সর্ম্পর্কের শর্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। তাই হয়তো অদূর ভবিষ্যতে এমন সময় আসবে যখন বাংলাদেশ থেকেও মৃত্যুদণ্ডের ব্যবস্থা উঠে যাবে।

সূত্রঃ
১.http://www.amnesty.org/en/death-penalty/abolitionist-and-retentionist-countries; 04/12/2012 at 23:40 hours

২. http://www.police.gov.bd/index5.php?category=48