ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

সদ্য মৌলিক প্রশিক্ষণ শেষ করে মাঠের ন্যূনতম অভিজ্ঞতা ছাড়াই একজন নবীন এএসপিকে পুলিশ সার্কেল বা জোনে পদায়ন করার বিপক্ষে আমি বরাবরই মত পোষণ করে এসেছি। কারণ, আমি মনে করি, পুলিশি জীবনে তদন্তের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ইন্সপেক্টরদেরই সার্কেলে পদায়নের যে প্রত্যক্ষ তাগিত বৃটিশ, পাকিস্তান এমনকি বাংলাদেশের ১৯৯০ সালের পূর্ব পর্যন্ত ছিল, তার আবেদন এখনও হাওয়া হয়ে যায়নি। বরং বাংলাদেশের সামাজিক জীবনের ক্রমবর্ধমান জটিলতা, ধ্রুপদি অপরাধসমূহ সংঘটনে আধুনিক কৌশল প্রয়োগ ও নিত্য নতুন অপরাধ সূচিত হওয়ার ফলে এই তাগিদ ক্রমশ বেড়েছে।

পুলিশি কাজের সবচেয়ে কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল ফৌজদারি অপরাধ/মামলার তদন্ত পরিচালনা করা। এই তদন্তের প্রাধিকার ও সক্ষমতাই পুলিশকে দেশের অন্যান্য উদিধারী বাহিনীগুলো থেকে পৃথক করে। একমাত্র তদন্ত ভিন্ন পুলিশের অন্যান্য দায়িত্ব সমূহ সামান্যতম প্রশিক্ষণ প্রদান করে যে কাউকে দিয়ে পালন করানো যেতে পারে। কিন্তু তদন্ত করতে হলে আপনাকে শুধু ইউনিফর্ম পরিধান, টহল, গ্রেফতার, উদ্ধার ইত্যাদি বিষয়ে পারঙ্গমতার অনেক ঊর্ধ্বে উঠতে হবে; পেশাদারিত্বেও একটি ন্যূনতম পর্যায়ে উন্নীত হতে হবে।

ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হল পুলিশের তদন্ত। পুলিশের তদন্তের মানের উপর ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার সাফল্য অনেকাংশে নির্ভরশীল। এ কথা সঠিক যে, আদালতের বিচার কার্য কেবল পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনের উপর নির্ভরশীল নয়। পুলিশ কর্তৃক তদন্তের বাইরে গিয়েও আদালত সরাসরি কোন ফৌজদারি অপরাধের বিচার কার্য সম্পন্ন করতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হল, শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা পৃথিবীতে পুলিশের তদন্ত বা পুলিশ প্রতিবেদনের বাইরে গিয়ে আদালত যে সব ফৌজদারি অপরাধের বিচার করেছে সেগুলো হাতের পাঁচ আঙ্গুলের দাগ দিয়েই গুণে শেষ করার মতো।

কিন্তু ফৌজদারি মামলার মান সম্মত তদন্ত করা যতটা সক্ষমতা ও অভিজ্ঞার ব্যাপার, তদন্তগুলোর তদারকি করা তার চেয়েও বেশি ওস্তাদী বা পেশাদারিত্বের ব্যাপার। আমাদেরও পুলিশ বা তদন্ত ব্যবস্থায় সাধারণত মাঠ পর্যায়ে ফৌজদারি মামলার তদন্তকার্য তদারকি করেন সার্কেল এএসপি (মেট্রোপলিটন পুলিশের জোনাল এসি) গণ। বলা বাহুল্য, আশির দশকের গোড়ার দিকেও পুলিশ সার্কেলের দায়িত্ব পালন করতেন পুলিশ-জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন সার্কেল ইন্সপেক্টরগণ। নিজেরা তদন্ত করতে করতে হাত পাকিয়ে চাকরি জীবনের শেষ পর্যায়ে তারা তদন্ত তদারকির দায়িত্বপূর্ণ ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি পেতেন। তদন্ত তদারকি সম্পর্কে পিআরবি এর ১৮৯ প্রবিধানে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে এভাবে-

He should also render all assistance possible to investigating officers by suggestions and advice, culled from the storehouse of his greater experience.

কিন্তু এই তদন্তের তদারকি যখন সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতাহীন কোন পুলিশ কর্মকর্তার হাতে গিয়ে পড়ে তখন তদন্তের মান নিয়েই প্রশ্ন তোলা সমীচীন হয়ে পড়ে। অবশ্য আমার এই লেখা থেকে পাঠকদের অনুরোধ করছি, তারা যেন এই অনুসিদ্ধান্ত না টানেন যে, শুধুমাত্র পদোন্নতি প্রাপ্ত বিভাগীয় এএসপিগণই অভিজ্ঞ; সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত এএসপিগণ চিরকালই অনভিজ্ঞ। আমার মতে, তদন্ত তদারকি কাজে হাতে কলমে তদন্তের পাশাপাশি তদন্ত সংক্রান্ত তাত্ত্বিক জ্ঞান, তদন্ত তদারককারী কর্মকর্ততার নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা, তদন্তাধীন ঘটনা পরম্পরার গভীরে প্রবেশ করার বিশেষ ঝোঁক ইত্যাকার বিষয় সমধিক গুরুত্বপূর্ণ। একজন মেধাবী পুলিশ কর্মকর্তার তদন্তকাজে ব্যুৎপত্তি অর্জন করতে যুগাধিক কাল তদন্তকার্য পরিচালনার প্রয়োজন পড়ে না। বিশেষ ঝোঁক নিয়ে প্রত্যেক শ্রেণির বিভিন্ন অপরাধের কয়েকটি ঘটনার তদন্তকার্য বা তদারকিতে প্রবেশ করলেই সমজাতীয় ঘটনা সম্পর্কে সঠিক অনুসিদ্ধান্ত টানা যায়।

যাহোক, আমাদের পুলিশ সার্কেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত এএসপিগণ বর্তমানে একটি নতুন সমস্যায় পড়েছেন, কিংবা এই সমস্যা তারা নিজেদের জন্য তৈরি করে নিয়েছেন। এই সমস্যার সূত্রপাত হলো পুলিশ প্রবিধান নির্দেশিত তাদের আটপৌরে কাজের মধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুপ্রবেশ। বিষয়টি হল, যে কাজ একজন সার্কেল এএসপি প্রাত্যহিকভাবে করেন, সেই কাজের দায়িত্ব তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার হাতে বিশেষ সার্কুলারের মাধ্যমে বিশেষভাবে তুলে দেওয়া।

যেমন ‘বিশেষ প্রতিবেদন মামলা’ বা সিআর কেইসগুলোর বাইরেও নারী নির্যাতনসহ বেশ কিছু মামলার তদন্ত তদারকির ভার প্রজ্ঞাপন বা আইজি-অর্ডারের মাধ্যমে তুলে দেওয়া হয়েছে জেলার পুলিশ সুপারদের উপর। পুলিশ সুপারগণ এই সব মামলার তদন্ত তদারকির ভার প্রায় ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত পুলিশ সুপারদের কাছে অর্পণ করেন। সে ক্ষেত্রে ঘটনাস্থলে সরেজমিনে তদন্তের জন্য এসপিগণ বা অতিরিক্ত পুলিশ সুপরগণ গিয়ে থাকেন। সাধারণত এই সব মামলার এজাহারের কপি হাতে পেয়ে এসপিগণ তাতে লিখেন, ‘মামলটি আমিই তদারকি করব’, কিংবা ‘অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তদন্ত তদারকি করবেন’।

পুলিশ সুপার সাহবের কলমের এই খোঁচার এতই ধার যে পুলিশ সার্কেলের সকল মামলার তদন্ত তদারকির প্রত্যক্ষ দায়িত্বে থাকা অনেক সার্কেল এএসপি আদেশটি হাতে পাওয়ার সাথে সাথেই আলোচিত মামলার তদন্ত তদারকির বিষয়ে আর কোন পদক্ষেপ নেওয়া খান্ত দেন। অনেক সময় সার্কেল এএসপিগণ ঘটনার অব্যবহিত পরে ঘটনাস্থলে যাবার সুযোগটুকু গ্রহণ না করে অপেক্ষা করেন, কখন পুলিশ সুপার বা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ঘটনাস্থলে আসবেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ তার অধীক্ষেত্রে এলেই তিনি ঘটনাস্থলে তাদের সহগামী হবেন; তার আগে নয়। তিনি মামলা তদন্তকারী কর্মকর্তাকে এই মামলা তদন্তের জন্য পরামর্শ দেওয়া তো দূরে থাকুক, মামলার তদন্ত তদারককারী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যদি সরে জমিনে ঘটনাস্থলে না যান, তাহলে, প্রায় ক্ষেত্রে তিনি এই জাতীয় মামলার ঘটনাস্থলও পরিদর্শন করেন না। অন্যদিকে, মামলার সিডিসমূহে হয়তো সই করেন, কিন’ কোন দিন পড়েও দেখেন না।

কিন্তু মামলা তদন্তের শেষ পর্যায়ে তার কাছে এম.ই. ( মামলার ঘটনা, তদন্ত ও তদন্তের প্রেক্ষিতে গৃহীত সিদ্ধান্তসহ মামলার তদন্ত সমাপ্ত করার একটি লিখিত প্রস্তাব) আসে সার্কেল এএসপি সেই এম.ই.তে চোখ বন্ধ করে দস্তখত করেন। কিন্তু পুলিশের বাইবেল বলে কথিত পুলিশ প্রবিধান কি বলে?

He shall see that each case is fully and properly investigated and that all possible steps are taken to ensure detection

পিআরবি এর ১৮৯ নম্বর প্রবিধানের এই নির্দেশনা অনুসারে, তাহলে, কোন সার্কেল এএসপিকে কি এমন কোন মামলার তদন্ত তদারকি থেকে খালাস দেওয়া হয়েছে, যে মামলার তদারকির ভার পুলিশ সুপার গ্রহণ করেছেন।

পুলিশ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে ক্রমাগত লোকবল বৃদ্ধি পাচ্ছে[1]। কিন্তু এই লোকবল বৃদ্ধির ফলাফল যদি এই হয় যে ঊর্ধ্বতন পদের অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পণের ফলে অধঃস্তন কর্মকর্তারা অকার্যকর হয়ে পড়ছেন বা তাদের পেশাগত দক্ষতা কমতে শুরু করেছে তাহলে, এক সময় পুরো পুলিশ সংগঠনটিই পেশাদারিত্ব হারাবে। এক্ষেত্রে পুলিশের সকল পর্যায়ের অফিসারদের বিদ্যমান আইন-বিধি ও প্রবিধিগুলোর মর্ম-তাগিদ উপলব্ধি করে নিজ নিজ পদের দায়িত্বটুকু পালনে সচেষ্ট থাকতে হবে।

প্রশাসনে একই বিষয়ের উপর দ্বিত্ব অধীক্ষেত্র (overlapping jurisdiction/authority) বা দায়িত্ব অর্পণের বিষয়টি নতুন কিছু নয়। এই দায়িত্ব-দ্বিত্বতাকে(overlapping responsibility) অধিকতর নিবিড় তদারকি নিশ্চিত করার কৌশল হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বাংলাদেশে না থাকলেও পৃথিবীর অনেক দেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় একাধিক পুলিশ সদস্যদের নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করার নজির রয়েছে। মামলার তদন্ত, তদন্ত তদারকি এবং তদন্ত সমাপ্ত করার পূর্বে দাখিলকৃত এম.ই এর উপর বিভিন্ন পদবীর পুলিশ অফিসার (এমনকি সরকারি কৌশলীর) মন্তব্যসহ মতামত প্রদান প্রক্রিয়াকে একটি তদন্ত কমিটির কার্যক্রমের সাথে তুলনা করা যায়। সার্কেল এএসপিগণ এই কমিটির সদস্য সচিবের মতোই গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন। তাই তাদের কোন ক্রমেই অদক্ষ হলে চলবে না।

পাদটীকা:
একটু গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে গত ৪০ বছরে পুলিশ পদ-সোপানের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের চেয়ে অনেক বেশি হারে লোকবল বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৭২ সাল(৪৬,২৪৯ জন) থেকে শুরু করে ২০১২ সাল(১,৪৮,২৭৩ জন) পর্যন্ত কালে পুলিশের মোট লোকবল বৃদ্ধির শতকরা হার ২২০.৫৯। অধঃস্তন পদে এই জনবল বৃদ্ধিও হার ২১৮.১৬% এর বিপরীতে ঊর্ধ্বতন পদে এই জনবল বৃদ্ধিও হার হল ৪৯৭.৬৩%। সূত্র- বাংলাদেশ পুলিশ প্রশাসনিক প্রতিবেদন ও পুলিশ হেডকোয়ার্টাস, ঢাকা