ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 
index

মাত্র কয়েক বছরের মাথায় রংপুরবাসীর দীর্ঘ দিনের দাবীর প্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠিত রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র অসন্তোষ ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। যদিও এই বিশৃঙ্খলা উন্নয়ন কাজের উপচে-পড়া উচ্ছিষ্ট সংগ্রহের অসুস্থ প্রতিযোগিতার বহিঃপ্রকাশ ভিন্ন অন্য কিছুই নয়, তবুও অন্যান্য যে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরাজমান অস্থিরতার মতো রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অস্থিরতার পিছনে রাজনৈতিক ইন্ধন না থেকে পারে না।

ভিসির পদত্যাগের দাবীতে ছাত্র-ছাত্রীগণ আন্দোলনে গেলেও এই দাবীর সাথে যোগ দিয়েছে কতিপয় শিক্ষক। বলাবাহুল্য, শিক্ষকদের স্বার্থ আর ছাত্র-ছাত্রীদের স্বার্থ অভিন্ন নয়। তবুও তাদের ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থের কোন এক স্থানে অবশ্যই একটা মিলন-বিন্দু রয়েছে। শুনেছি এই আন্দোলনের পিছনে ছাত্র-ছাত্রীদের কতিপয় যৌক্তিক কারণ রয়েছে। যেমন, আবাসিক হল, ক্যাফেটারিয়া, কেন্টিন, লাইব্রেরি চালু করা, পরিবহন ব্যবস্থা করা, শিক্ষক স্বল্পতা দূর করা ইত্যাদি। তবে শিক্ষকদের দাবীগুলো মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীন উন্নয়ন ও প্রশাসনের সাথে জড়িত। বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। এ সম্পর্কে গত ১২ জানুয়ারী/২০১৩ প্রথম আলোসহ অন্যান্য পত্রিকার প্রতিবেদনগুলো বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

আন্দোলনের এক পর্যায়ে গত ১০ জানুয়ারী/২০১৩ আন্দোলনরত শিক্ষকদের উপর কতিপয় বহিরাগত মুখোশধারী সন্ত্রাসী এসিড নিক্ষেপ করে। এই ঘটনায় থানায় মামলা হলে কতিপয় ছাত্রকে কোতয়ালী থানা পুলিশ গ্রেফতারও করেছে। অন্য দিকে বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ। তবে বন্ধ থাকলেও আন্দোলন বন্ধ নেই। ক্যাম্পাসের বাইরে শহরের বিভিন্ন স্থানে যেমন, প্রেস ক্লাবের সামনে চলছে পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন, মানব বন্ধন ইত্যাদি।

দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অস্থিরতা, আন্দোলন, অস্ত্রবাজী, চাঁদাবাজী ইত্যকার হাজারো অভিযোগ রয়েছে। শত শত ছাত্রও এগুলোর বলী হয়েছিল। কিন্তু আন্দোলনরত শিক্ষক-ছাত্রদের উপর এসিড নিক্ষেপ করার ইতিহাস সম্ভবত নেই। সেই ক্ষেত্রে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যায় অনন্য। অবশ্য কেউ কেউ বলছেন, সমাবেশ স্থলে হামলা চালিয়ে মাইক লণ্ডভণ্ড করার সময় মাইকের ব্যাটারি থেকে ছড়িয়ে পড়া এসিডে আন্দোলনকারীরা আহত হয়। পরিকল্পিতভাবে এসিড নিক্ষেপ করা হয়নি। তবে অবস্থা যাই হোক শিক্ষকগণ এসিডে আহত হয়েছেন।

গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ সময়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি চালু হলে এর কার্যক্রম অস্থায়ীভাবে শুরু হয়েছিল রংপুরের শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের স্থাপনা দখল করে। পরে ধীরে ধীরে এর সমূদয় স্থাপনা তার নিজ ক্যাম্পাসে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসটি এত ছোট যে ভবিষ্যতে এর সম্প্রসারণ তো দূরের কথা, বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ফ্যাকালটিগুলোর স্থান সংকুলান করাই মুস্কিল। এত অল্প স্থানের মধ্যে ছাত্র-শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক লোকবলের থাকার ব্যবস্থা তো নয়ই, তাদের স্বাচ্ছন্দে চলাফেরা করাই কষ্টকর হবে। এরফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস তার নিজ দোষেই সব সময় অস্বস্তিকর অবস্থায় কালাতিপাত করতে বাধ্য হবে।

রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (http://www.brur.ac.bd) ক্যাম্পাসটি তৈরি করা হয়েছে রংপুরের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কারমাইকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের নিজস্ব ভূমিতে। এই প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৭ শত একর জমি থেকে দেওয়া হয়েছে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক একর জায়গা। বলতে কি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এই স্থানটি অত্যন্ত অপরিসর। সীমিত বাজেটে একটি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করে রংপুরবাসীদের বুঝ দেওয়ার একটি গোপন মানসিকতা এখানে ছিল বলে প্রতীয়মান হয়। তবে নাই মামার চেয়ে কানা মামা অনেক ভাল। ছোট হোক, বড় হোক বিশ্ববিদ্যালয় তো? রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য রংপুরবাসী হিসেবে আমিও গর্বিত।

রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থানটি অত্যন্ত নাজুক স্থানে। প্রথমেই বলতে হয় এটি কারমাইকেল কলেজের জমি অধিগ্রহণ করে তৈরি করা হয়েছে। তারপর এর স্থান হয়েছে এমন এক জায়গায় যার পশ্চিম দিকে কারমাইকেল কলেজের ক্যাম্পাস। দক্ষিণ দিকে রংপুর ক্যাডেট কলেজ এবং উত্তর দিকে কারমাইকেল কলেজিয়েট স্কুল ও কলেজ।

রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব দিকে আসরত পুর গ্রামের বিশাল এলাকায় কারমাইকেল কলেজের ছাত্রদের থাকার মেসের অবস্থান। বলতে কী কারমাইকেল কলেজের সিংহভাগ ছাত্রই এই আশরতপুর এলাকায় বিভিন্ন মেসে অবস্থান করে। এই সব ছাত্র শুধু পড়াশোনাই করে না,তারা আসরত পুরের বাজারঘাট ও স্থানীয় রাজনীতিও নিয়ন্ত্রণ করে।

পাশাপাশি অবসি’ত দুইটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আমাদের দেশে বিভিন্ন কারণে বিরোধ লেগে থাকে। রাজনৈতিক কারণ থেকে শুরু করে, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, আঞ্চলিক এবং সাংস্কৃতিক কারণও এর সাথে অন্তর্ভূক্ত। ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তো বটেই, এমনকি একই প্রতিষ্ঠানের দুইটি ইউনিট যেমন, দুইটি আবাসিক হল বা দুইটি বিভাগের মধ্যেও মনোমানিল্য দেখা দেয়। এই সব মনোমানিল্য প্রায় ক্ষেত্রে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়।

কারমাইকেল কলেজের ছাত্রদের সাথে ভবিষ্যতে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের যে বিরোধ দেখা দিবে তা বলাই বাহুল্য। আবাসিক মেস, বাজারঘাট, পরিবহন সুবিধা ইত্যাদি কারণে এই বিরোধ শুরু হতে পারে। তাছাড়া রাজনৈতিক কারণগুলোও এখনই বেশ চাঙ্গা। কারমাইকেল কলেজে জামাত শিবিরের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। লিখিতভাবে যাই হোক, কারমাইকেল কলেজের সবগুলো ছাত্র হল যে বর্তমানে বন্ধ রয়েছে তার আসল কারণ হল এই সব হলে ছাত্রশিবির তাদের আধিপত্য বিস্তার করেছিল। তাই মাথাব্যাথার জন্য মাথা কাটার স্টাইলে কর্তৃপক্ষ সব কয়টি হল প্রায় তিন বছর থেকে সম্পূর্ণ সিলগালা করে দিয়েছে। কিন্তু কলেজের আশে পাশে ছাত্র মেসগুলোতে এখনও ছাত্রশিবির তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। অদূর ভবিষ্যতে যখন এই সব মেসে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা স্থান পেতে চাইবে তখন শুরু হবে শিবির-এন্টি-শিবির সংঘর্ষ।

অন্যদিকে বলা যায়, আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নোংরা রাজনীতি সহজেই প্রবেশ করে। রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাগ্যেও তাই জুটেছে। নাইলে ভিসির পদত্যাগের দাবীতে ছাত্ররা কেন আন্দোলন করবে? আর শিক্ষকরাই বা কেন তাতে যোগ দিবে। আর তাও বোঝা গেল। কিন’ আন্দোলনরত ছাত্র-শিক্ষকদের উপর বহিরাগতরা কেন হামলা চালাবে? যদি কোন অপরিচিত দুর্বৃত্ত হামলাই চালায় তাহলে ছাত্রলীগের নাম কেন উচ্চারিত হবে?

রংপুর রোকেয়া বিশ্ববিদ্যায়ের ভৌলিক অবস্থানটি মোটেই সন্তোষজনক নয়। অপ্রতুল জায়গার বাইরেও এই বিশ্ববিদ্যালয়টি শহরের একদম কেন্দ্রস্থলে অবস্থত। এর মাত্র কয়েকশত গজ দুরে মডার্ন মোড়টি হল রংপুর শহরে প্রবেশ করার প্রধানতম পথ। রংপুর শহরেই শুধু নয় , রংপুর বিভাগের একমাত্র গাইবান্ধা জেলা ছাড়া সব জেলায় প্রবেশদার হল এই মডার্ন মোড়। যেকোন গণ্ডগোল বা অসন্তোষে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের রাস্তা অবরোধ করা একটা নিত্য নৈমিত্তিক বিষয়। তাই রংপুরের রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীগণও অদূর ভবিষ্যতে আমাদের রংপুর বিভাগে প্রবেশের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে বলে সহজেই অনুমান করা যায়।

এমতাবস্থায়, রংপুরের রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ সমস্যা আশু সমাধান করার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়টি কারমাইকেল কলেজের স্থান তথা শহর থেকে সরিয়ে বাইরে নিয়ে যা্‌ওয়া উচিত। এই ক্ষেত্রে মহীয়ষী নারী বেগম রোকেয়ার জন্মস্থান মিঠাপুকুর থানার পায়রাবনন্দ মৌজার যে কোন স্থানে এটি স্থানান্তর করা যেতে পারে। রংপুর শহর থেকে মাত্র ১০/ ১৫ কিলোমিটার দূরে এই পায়রাবন্দ গ্রাম। বর্তমানে রংপুর সিটি কর্পোরেশনের সামান্য বাইরেই এর অবস্থান। কর্তৃপক্ষ ইচ্ছা করলে এই মুহূর্তে পায়রাবন্দকেও সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভূক্ত করতে পারে। তখন একটু দূরে হলেও পায়রাবন্দ তথা স্থানান্তরিত বিশ্ববিদ্যালয়টি রংপুর শহরের ভিতরই পড়বে।

আমার প্রস্তাবের সপক্ষে আমি নোয়াখালী বিশ্ববিদ্যালয়, যশোর বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট শাহজালাল বিশ্ববিদ্যায়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রভৃতির উদাহরণ দিব। নোয়াখালী বিশ্ববিদ্যালয় মাইজদী শহর থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, যশোর বিশ্ববিদ্যালয় তাই। আর কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা তো সবারই জানা।

একটি বিভাগীয় শহরের নিত্যদিনের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের একাডেমিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় যত দ্রুত সম্ভব পায়রাবন্দে স্থানান্তর করা যায়, ততোই মঙ্গল।