ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

অপ্রিয় হলেও সত্য যে খুনের অপরাধ নিবারণের কোন কার্যকর পন্থা অপরাধ বিজ্ঞানী বা অপরাধ প্রতিরোধকারী সরকারী সংস্থাগুলোর হাতে কোন দিনই ছিল না । অদূর ভবিষ্যতেও যে খুন নিবারণী কার্যকর তত্ত্ব পুলিশের হাতে আসবে তারও নিশ্চয়তা নেই।

খুন এমন একটি অপরাধ যা কোন ভাবেই ভবিষ্যতবাণী বা গোয়েন্দাতথ্য দ্বারা নিশ্চিতভাবে অবগত হওয়া দুষ্কর। বর্তমান জগতে খুন সবচেয়ে জঘন্য সহিংস অপরাধ। জীবনের চেয়ে বড় কিছু নেই। জীবন বাঁচাতে মানুষ তার গৃহে আশ্রয় নেয়। কিন্তু অপ্রিয় বাস্তবতা হল, অধিকাংশ খুনের ঘটনা গৃহের অভ্যন্তরেই সংঘটিত হয়। নিরাপদ স্থানে অতি নিরাপদে খুনের মতো অপরাধ ঘটিয়ে অপরাধীরা পগার পার হলেই পুলিশ খবর পায়। ব্যতিক্রম ক্ষেত্র ভিন্ন খুনরত অবস্থায় ভিকটিম তো নয়ই, কোনা প্রতক্ষ্যদর্শীও পুলিশকে সাধারণত খবর দেয় না। অধিকন্তু অন্যান্য অপরাধের মতো খুনও পুলিশের উপস্থিতিতে সংঘটিত হবার কথা নয়। দাঙ্গাসহ খুন ছাড়া প্রকৃত খুন সাধারণত জুগুপ্সীত অপরাধ।

পৃথিবীতে প্রাচীন বা মধ্য যুগের রাজ-রাজড়াদের ক্ষমতা নিরুঙ্কুশ করার জন্য প্রতিদ্বন্দী ভ্রাতৃহত্যা থেকে শুরু করে প্রেমের কারণে রাজমহিষী হত্যার ঘটনা পর্যন্ত কোন প্রকার হত্যাই একক সূত্রে গ্রন্থিত নয়। হত্যা কোন ছকে বাঁধা বীজগণিত বিষয় নয়।

খুনের ঘটনা প্রচার মাধ্যমের একটি প্রিয় সংবাদ। সাধারণ পরিসি’তিতে হয়তো এক ডজন আদম সন্তানের মৃত্যুর ঘটনা পত্রিকার পাতায় স্থান পাবে না। কিন্তু বিশেষ পরিসি’তিতে একটি মাত্র খুনের ঘটনা পত্রিকার সাত কলাম জুড়ে পাঠকের সামনে আসতে পারে। তবে পত্রিকাগুলো যখন মর্মস্পর্শী খুনের ঘটনার অভাবে পত্রিকায় আকর্ষণীয় শিরোনাম দিতে ব্যর্থ হয়, তখন স্থান বা কালের মেলবন্ধন ঘটিয়ে একাধিক খুনের ঘটনা জোড়া দিয়ে একটি ওজনদার খবর তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। খবরগুলো হতে পারে এমন—-
‘দশ জেলায় বিশ খুন’
‘বিশ দিনে সারা দেশে ত্রিশ খুন’
‘গত পাঁচ বছরে পঞ্চাশ হাজার খুন’ — ইত্যাদি ইত্যাদি।

প্রচার মাধ্যম বা পত্রিকাগুলো আমাদের পাঠককুলের মনস্তত্ত্ব ভালভাবেই বোঝে। পাঠকগণ একটি খুনের ঘটনায় উৎসাহী হবেন না। তবে একাধিক খুনের ঘটনায় আতঙ্কিত হবেন। এতে পত্রিকার কাটতি বাড়বে।

সম্প্রতি একটি দৈনিক পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে যে মহাজোট সরকারের আমলে গত ৪ বছওে ১১ হাজার মানুষ খুন হয়েছে । এখানে চার বছরটা তেমন কিছু নয়। তবে ১১ হাজার খুন আতঙ্কের বিষয়। যেখানে একটি মাত্র খুনের ঘটনা নিয়ে মানুষ আতঙ্কিত হয়, সেখানে ১১ হাজার খুন কি চাট্টিখানিক কথা! হোক না ৪ বছরের হিসেব, তবুও তো ১১ হাজার খুন।

পত্রিকার এই প্রতিবেদক নিছকই একজন প্রতিবেদক। অপরাধ-বিজ্ঞানে তার জ্ঞান খুবই সীমীত। অন্যদিকে সাধারণ অপরাধ পরিসংখ্যানও সম্ভবত তার জানার বাইরে। এমতাবস্থায়, গত ৪ বছরের খুনের ঘটনাগুলোকে একত্রিত করে তিনি একটি প্রচার মাধ্যমের ক্রেজোত্তপ্ত খবর তৈরি করে পত্রিকার কাটতি বাড়াতে চেষ্টা করেছেন।

বাংলাদেশের অপরাধ পরিসংখ্যান আমলে নিলে দেখা যাবে ১৯৭২ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত গড়ে প্রতি বছর দেশে ২,৩০৫টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এই পরিসংখ্যানে দেখা যাবে দেশে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক খুনের ঘটনা ঘটেছিল ১৯৭২ সালে মোট ৫,৯৫৬টি) এবং সবচেয়ে কম সংখ্যক খুনের ঘটনা ঘটেছিল ১৯৮৪ সালে (৯৯২টি)। এই ব্যবধির যে কোন চার বছরের হিসেব নিলে দেখা যাবে মোট চার বছরের খুন হয়েছিল ৯,২২০টি। ২০০১ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত দেশে গড়ে প্রতি বছর খুন হয়েছে ৩,৭৮৪টি। এই হিসেব মতে চার বছরে মোট খুনের ঘটনা হবে ১৫,১৩৭টি। অর্থাৎ দেশে যদি খুনের ঘটনা ২০০১ থেকে ২০০৯ সালের গড় অনুপাতে বৃদ্ধি পেত তাহলে আরো অন্তত ৪,১৩৭টি খুনের ঘটনা অপরাধ পরিসংখ্যানে যোগ হত। কিন্তু বাস্তব কথা হল তা হয় নাই। এমতাবস্থায়, সিদ্ধান্ত টানা সম্ভব যে বাংলাদেশে ২০০৯ সালের পর থেকে খুনের অপরাধ কমতে শুরু করেছে এবং প্রতি ববছর গড়ে অন্তত ১,০০০ টি খুন কম হয়েছে।

অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ ছাড়া দেশের অপরাধ গতিবিধি (Crime Pattern) সম্পর্কে সঠিক মন্তব্য করা যায় না। প্রতিবেদনের খাতিরে প্রতিবেদন লিখতে গিয়ে আমাদের পত্রিকার কিছু কিছু প্রতিবেদক দেশবাসিকে যে সব তথ্য ও বিশ্লেষণ উপহার দিচ্ছেন সেগুলো আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য যথেষ্ঠ হলেও এ গুলোর বস্তুগত মূল্য নেই। এই সব প্রতিবেদনে আমজনতার পিলে চমকালেও অপরাধ-বিজ্ঞানী বা অপরাধ-বোদ্ধাদের কাছে এগুলো নিতান্তই হাস্যকর। সচেতন পাঠক হিসেবে আমরা কি পত্রিকায় হাস্যকর প্রতিবেদন পড়তে চাই?