ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

২০০৬ সাল। চাকরি করি মাগুরা জেলায়। মাগুরা শহরের ভায়ানা মোড়ের একটি স্মৃতি সৌধে খোদাই করা হয়েছে সেই জেলার শহীদ-গাজী সকল মুক্তিযোদ্ধাদের নাম। এই নামগুলোর মধ্যে একটি নামের উপর কালি লেপন করে মুছে দেওয়া হল।

কারণ হল, শহীদ মুক্তিযোদ্ধার খাতায় নাম ওঠা এই ভদ্রলোক ছিলেন আসলে রাজাকার। একবার মুক্তিযোদ্ধাগণ এই রাজাকারকে পাকড়াও করে তাকে নিয়ে অভিযানে বের হয়। তাদের লক্ষ ছিল অন্যান্য রাজাকার ও খান সেনাদের অবস্থান শনাক্ত করা। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধার দলটি পাল্টা আক্রমণে পড়ে। তাদের অনেকেই শহীদ হন। একই সাথে নিহত হয় সেই রাজাকারও। মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পরে সেই রাজাকারেরও লাশ উদ্ধার করা হয়। দয়ার শরীর বাঙালির। রাজাকার হলেও মুসলামান অচ্ছুত নয়। তারও জানাজা হল। তাকেও দাফন করা হয়।

বাংলাদেশ স্বাধীন হল। আত্মসমর্পণ করল জেনারেল নিয়াজী। রাজাকারদের সায়েস্তা করার কাজটিও চলল। মুক্তিযোদ্ধাদের নামের সরকারি নথিকরণ চলল। তালিকাভূক্ত করা হল শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদেরও। আর এই প্রক্রিয়ায় পড়ে সরকারি নথিপত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে সাথে সেই রাজাকারও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেল।

১৯৭১ থেকে ২০০৫ সাল । নিহত রাজাকারের আত্মীয়-স্বজনগণ বছরের পর বছর শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য হবার গৌরব ভোগ করে। তারা ভাতা পায়, উপঢৌকন ও সংবর্ধনা পায়। কিন্তু বাদ সাধে কতিপয় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। বহুদিনের প্রচেষ্টায় তারা ২০০৫/০৬ সালে এই রাজাকারকে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার আসন থেকে নামিয়ে আনে। সরকারি নথিপত্রের খবর সঠিক জানি না। তবে শহীদ মিনার থেকে তাকে বিদায় করা হয়।

মাগুরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারকে সংবর্ধনা দেওয়ার অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সেই রাজাকারের স্ত্রী (মনে নাই, মেয়েও হতে পারে)। সবাইকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। বাদ পড়েন শহীদের আসনচ্যূত সেই রাজাকারের আত্মীয়া। তিনি নিরবে বসে থাকেন। প্রতি বছরের মতো এবারও তিনি কিছু ফুল পাবেন, কিছু উপঢৌকন পাবেন। কিন্তু একে একে সবাইকে দেওয়া হল ফুল ও উপঢৌকন। তিনি বসে থাকেন । তাকে কেউ ডাকে না। অনুষ্ঠান শেষ হয়। এই মহিলা প্রতিবারের মতো এবার তাকে কিছু দেওয়া হল না কেন, তা জানতে চায়। সরকারি পদের লোকজন সঠিকভাবে তাকে কিছুই বলতে পারেন না।

একটি তথ্য বিভ্রাটে এক রাজাকার হয়ে গিয়েছিল শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। একই ভাবে অনেক মুক্তিযোদ্ধাও হয়ে গিয়েছে বা যেতে পারেন রাজাকার। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের হাজারো ঘটনার মধ্যে এই জাতীয় ছোট ছোট ঘটনাগুলোর খবর কেউ রাখে না। তবে বিশাল সমুদ্রের অগণিত বালুকারাশির মতো মুক্তিযুদ্ধের এই সব ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ঘটনা অবহেলার বস্তু নয়। এই সব ঘটনায় আছে সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য বানানোর প্রচেষ্টা। এই সব ঘটনায় আছে মনুষ্য চরিত্রের অতি স্বাভাবিক অথচ অবিশ্বাস্য বৈচিত্র্য।