ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

 

ফেইসবুকের কোন কোন পোস্টে দেখছি কিছু বালিকা লাইন ধরে বসা পুলিশ সদস্যদের হাতে গোলাপ ফুল তুলে দিচ্ছেন। দৃশ্যটি বড়ই ব্যতীক্রমধর্মী, মজাদার ও আমজনতা তো বটেই আমার মতো পুলিশ অফিসারের কাছে বড়ই বেখাপ্পা! পাঠকের স্মরণে থাকার কথা জামাত নেতা কাদের মোল্লার বিচারের রায়ের পূর্ব দিন রাজধানীর মতিঝিলে পুলিশকে জামাতীরাও ফুল দিয়েছিল। এই নিয়ে পত্রিকায় খবর বেরিয়েছিল; ছবি ছাপানো হয়েছিল। কিন্তু এর কয়েক দিন পর থেকে, বিশেষ করে জামাতনেতা দেলওয়ার হোসেন সাইয়ীদির ফাঁসির রায় হবার পর থেকে সেই ফুল দেওয়া মানুষগুলো পুলিশকে ইতর প্রাণীজ্ঞানতুল্য করে যেভাবে আক্রমণ করছে, সেই কথা মনে হলে, এই ফুল-দানের পিছনে অন্য কোন উদ্দেশ্য আছে কিনা, একজন পুলিশ সদস্য হিসেবে, সেই সন্দেহ না করে পারি না।

রাজনৈতিক কারণেই হোক আর স্বোপার্জিত দুর্বলতার কারণেই হোক, শ্রেণি-পেশা-বয়স-সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে এদেশের মানুষ পুলিশকে নিম্নশ্রেণির ইতর প্রাণী বিশেষ মনে করে। পুলিশকে ঠেঙ্গানো যায়, থাপড়ানো যায়, ধাওয়া দেওয়া যায়, পিটিয়ে তক্তা বানানো যায় এবং পথভুলে-লোকালয়ে-আসা বন্যপ্রাণীর মতো এলোপাতাড়িভাবে পিটিয়ে হত্যা করাও যায়। পুলিশ মারলে কিছু হয় না। পুলিশ মরলে বড় জোর লাশ হয়, শহীদ হয় না।

পুলিশ মারা এদেশে ক্ষমতা প্রদর্শনের অংশ বিশেষ। নেতা পুলিশকে গালাগালি করলে অনুসারীগণ নেতাকে ক্ষমতাধর মনে করে তার পিছনে আরো বেশি সংখ্যায় একত্রিত হয়। ভোট প্রার্থী নেতা কর্তৃক পুলিশ মরলে ভোটারগণ খুশি হয়। পুলিশ ঠেঙ্গানো নেতার বাক্সে অধিকহারে ভোট পড়ে। ক্ষমতাসীন হয়ে পুলিশকে চড়-থাপ্পড় মারলে পরবর্তী নির্বাচনে সহজেই জয়ী হওয়া যায়।

পাড়ার মাস্তান থেকে শুরু করে তথাকথিত শীর্ষ সন্ত্রাসীগণও পুলিশকে হেস্ত-নেস্ত বা হত্যা করেই নিজেদের অপরাধ জগতের মডেল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেন। গোটা দশেক খুন করে জেলে গিয়ে জেলের বাসিন্দাদের কাছে থেকে যে আদর-কদর, স্নেহ-সমীহ পাওয়া যায় না, একজন মাত্র পুলিশকে খুন করে জেলে গেলে, শুনেছি, জেলের অন্যান্য কয়েদিদের কাছ থেকে খুনি তার চেয়েও অনেক বেশি কদর পেয়ে থাকে।

হরতাল, বিক্ষোভ বা অন্যান্য কর্মসূচিতে দায়িত্ব পালনকালীন তো বটেই, সাধারণভাবে মানুষের মাঝে বসবাস করা পুলিশসদস্যরাও সরকার বিরোধীদের আক্রশ থেকে রেহাই পায় না। পুলিশের জান-মাল-ইজ্জত হরণ করতে পারলেই আমাদের দেশের কতিপয় মানুষ নিজেদের বড় বাহাদুর মনে করে।

১৯৮৯-৯০ সালের দিকে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পলাশীমোড়ে বাজার করতে আসা দুই পুলিশ সদস্যকে আন্দোলনরত ছাত্রগণ গ্রেফতার করে বসে। পেটের দায়ে পুলিশে চাকরি করার বাইরে তাদের আর কোন অপরাধ ছিল না। কিন্তু তবু ছাত্রগণ তাদের ধরে উল্টা-পাল্টা পেটাতে থাকে। শুধু পেটানোই নয়, ক্রমান্বয়ে চলতে থাকে তাদের পরণের বস্ত্র হরণকার্য । পলাশী মোড় থেকে এই দুই পুলিশ সদস্যকে ধীরে ধীরে মধুর কেন্টিনের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। যতই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসের দিকে তাদের নিয়ে যাওয়া হতে থাকে তাদের পরণের কাপড় ততো কমতে থাকে। মধুর কেন্টিন পর্যন্ত এদের যখন নেওয়া হয়, তখন এই দুই আদম সন্তানের একটিমাত্র বস্তুগত সম্পদ ছিল, আর তাহল, একটি চামড়ার বেল্ট। দুই মধ্য বয়সী পুলিশ সদস্যকে একটি চামড়ার বেল্ট দিয়ে একত্রে বেঁধে রাখা হয়েছিল। জন্ম দিনের পোষাকে সজ্জিত এই পুলিশ সদস্যগণ তখন অবশ্যই জান হারায়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রগণ পুলিশ হত্যা করেছিল বলে এখন পর্যন্ত শুনিনি। তবে তাদের মান-ইজ্জত বলতে কিছুই ছিলনা। আমার মতো শত শত ছাত্র-ছাত্রী এই ঘটনাটি তখন উল্লাসপূর্ণ দৃষ্টিতে দেখেছে।

এরশাদের পতনের পরেও পুলিশের ইজ্জত হরণের উল্লাসকর্ম থেমে থাকেনি। আইন প্রনেতা কর্তৃক আইন হাতে তুলে পুলিশের গালে থাপ্পড় মারার কাহিনীর জন্ম এই দেশে হয়েছে। প্রকাশ্য রাজপথে মহিলা পুলিশের ইজ্জতহানী থেকে শুরু করে পুরুষ পুলিশের প্যান্ট খুলে নেওয়ার রেকর্ডও রয়েছে। আসামী ধরতে গেলে পুলিশের উপর এসিড নিক্ষেপ করার ঘটনা আছে। পুলিশকে মসজিদের ভিতর নিয়ে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে মারার ইতিহাস রয়েছে। পুলিশকে টুকরো টুকরো করে কেটে পানা পুকুরে লুকিয়ে রাখার ইতিহাসও রয়েছে।

এই দেশে পুলিশ পণ্যতুল্য। এদের পণ্য বানানো যায়, এদের দিয়ে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় করা যায়। পুলিশকে দিয়ে ভাল-মন্দ অনেক কিছুই করা যায়। আবার পুলিশ কর্তৃক সম্পাদিত কাজের ভালটুকু গ্রহণ করে, মন্দটুকুর জন্য পুলিশকে অবলিলায় বিশ্বাসযোগ্য কৌশলে দায়বদ্ধ করা যায়। পুলিশ এদেশে আঁধার রাতের সৈন্ধ্রিনী। দিনের বেলায় পুলিশের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করে রাতের বেলা পুলিশের বহিরাঙ্গণ পাহারায় অন্তরাঙ্গণের নিদ্রাটুকু নিশ্চিত করত করা যায়। তবে রাতের নিদ আর দিনের স্বস্তির জন্য পুলিশের অবদানটুকু স্বীকার করার মানুষ এই দেশে খুঁজে পাওয়া ভার।

সাহিত্যের পাতায় পাতায় পুলিশকে ঘুষখোর, নির্যাতনকারী বলেই চিত্রিত করা হয়েছে। বাংলা চলচ্চিত্রের পুলিশ সংশ্লিষ্ট প্রতিটি দৃশ্যে পুলিশকে লম্পট, নচ্চছার, অত্যাচারী, ঘুষখোর রূপেই দেখা যায়। অধুনা চলচিত্রের পুলিশ ভাঁড়ের চরিত্রটি স্থায়ীরূপে পেয়েছে।

পুলিশ নায়ক হয় না; খলনায়ক হয়। উপকারী হয় না , অত্যাচারী হয়। পুলিশ সুহৃদ হয় না, পুলিশ মানেই নচ্ছার-নির্দয়। যদিও বলিউডের কিছু কিছু ফিল্মে পুলিশের ইতিবাচক মূর্তি তুলে ধরা হয়, তবে সেটাও হয় পুলিশের বেআইনী কর্মকাণ্ডকে মহান করে তোলার মাধ্যমে। এই সব সিনেমায় দেখা যায়, পুলিশ অফিসার নেতাকে তার অফিসে নিয়ে গিয়ে আচ্ছাতারে মার দিচ্ছে। রাজনীতিবিদ লজ্জায় কিছু বলতে পারছে না। কোন ক্ষমতাশালীকে পুলিশের ডিআইজি-আইজি সবাই মিলে গিয়ে গ্রেফতার করছে। পুলিশকে এই সব চলচ্চিত্রে লাগামহীন ক্ষমতার অধিকারীরূপে চিত্রায়িত করা হয় যা সম্পূর্ণ বাস্তবতাবর্জিত।

সুকুমার রায় রায় তার ছড়ার মাধ্যমে কোমলমতিদের কাছে পুলিশ-ভীতি তোয়াক্কা করার সাহস তুলে ধরেছেন:

পুলিশ দেখে ডরাইনে আর পালাইনে আর ভয়ে
আরশুলা কি ফড়িং এলে থাকতে পারি সয়ে।

তিনি পুলিশের দারোগা আর মুৎসুদ্দি মহাজনদের মধ্যে কোন পার্থক্য দেখতে পান নি:

এই হল খাওয়া শুরু, শোন বলি আরো খায়
সুদ খায় মহাজনে ঘুষ খায় দারোগায়।

নজরুল বলেছেন, পুলিশ শুধু করছে পরখ কার কতটা চামড়া পুরু।

রবীন্দ্রনাথ বলেন, উহাদের লালায় বিষ রহিয়াছে।

আমাদের সাহিত্য পুলিশের হিংস্রতায় পরিপূর্ণ। ১৯৭১ সালের প্রথম প্রতিরোধকারী রাজারবাগের পুলিশ কর্মচারীরা হলেও পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ করেছে এমন ইতিহাস বড়ই অনুজ্বল। কোথাও কোথাও বিচ্ছিন্নভাবে এই ইতিহাসের চিহ্ণ থাকলেও তার বন্দনা কেউ করেন না। সম্প্রতি একজন পুলিশ কর্মকর্তা নক্ষত্রের রাজারবাগ নামে একটি উপন্যাস লিখে সাহিত্যে রাজারবাগের বীর শহীদদের স্বীকৃতি দিলেও, হয়তো পুলিশ না হলে তিনিও তা লিখতেন না। পুলিশ বলে পুলিশের মহত্ব লেখকের চোখে ধরা পড়েছে।

যাহোক, রাস্তার পুলিশকে কতিপয় যুবক-যুবতী কর্তৃক ফুল উপহার দেওয়ার মতোই একটি অনলাইন পত্রিকায় (Dhaka Times24.com) লিখিত একটি কলামে একাত্তর টিভির নিউজ ডিরেক্টর জনাব সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা প্রতিবেদনে পুলিশকে দেশপ্রেমিক বলে উল্লেখ করেছেন:

সরকার এমন যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কি করবে তা সরকারই বলতে পারবে। তবে এখন পর্যন্ত পুলিশই মনে হচ্ছে প্রধান ভরসা। আর সেই ভরসার জায়গায় নিজেদের প্রমাণ করেছে এদেশের প্রধান এই আইন-শৃংখলা বাহিনী। তাই আজ দলমত নির্বিশেষে মানুষ হৃদয় থেকে সালাম জানায় দেশপ্রমিক পুলিশ বাহিনীকে।

পুলিশ হল দেশ প্রেমিক। এটা একটা নতুন কথা। নুতন বিশ্লেষণ ও নবতর উপলব্ধি। পুলিশকে কেউ দেশ প্রেমিক বলে না। দেশ প্রেমিক হয় রাজনীতিবিদ বা অন্যরা। পুলিশ শুধুই পুলিশ।

পুলিশকে কবি, সাহিত্যক, রাজনীতিবিদ, ঐতিহাসিক প্রাবন্ধিক-লেখকগণ দেশপ্রেমিক বলেননা। এখন পর্যন্ত বিখ্যাত-অখ্যাত কোন লেখক নিবন্ধ-প্রবন্ধ বা সাহিত্য কাব্যে পুলিশকে দেশ্রপ্রমিক বলেছেন, এমন কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। তাই কোন প্রতিবেদক যখন পুলিশকে দেশপ্রেমিক আখ্যা দিয়ে ‘হৃদয় থেকে সালাম জানায়’ তখন আবেগাপ্লুত হওয়ার চেয়ে সন্দিহান হই। এই হৃদয় আবার কোন হৃদয়। এই হৃদয়ে কিভাবে স্থান পেল পুলিশের সুখ-দুঃখ?

পরিশেষে সন্দেহ আর অবিশ্বাসের পরও বলব, পুলিশের প্রতি বারংবার আক্রমণের প্রেক্ষিতে সাংবাদিকগণ যদি পুলিশকে বুঝতে শুরু করেন, তরুণ-তরুণীগণ যদি পুলিশের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে এবং রাস্তায় যারা মিছিল করেন কিংবা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন, তারা যদি পুলিশের নাজুক অবস্থা অনুধাবন করতে পারেন, তাহলে, জনগণের প্রতি পুলিশ আরো বেশি কৃতজ্ঞতাসহকারে সেবা প্রদানে উৎসাহিত হবে।প্রাত্যহিক দায়িত্ব পালনে পুলিশের যে যুদ্ধ, তা ন্যায়ের জন্য যুদ্ধ, মানুষের রাতের নিদ্রা ও দিনের স্বস্তিকে নিশ্চিত করার যুদ্ধ। এই যুদ্ধ মানবতার ইতিহাসে নিরবিচ্ছিন্ন মহত্তম যুদ্ধ।