ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

২০০৮ সাল থেকে discretion শব্দটির জন্য একটি একক বাংলা পরিভাষা খুঁজছি। কিন্তু কোনভাবেই এর জন্য একক বাংলা শব্দ খুঁজে পাচ্ছি না। Oxford Advanced Learner’s Dictionary তে discretion শব্দটির দুটি অর্থ নির্দেশ করা হয়েছো। প্রথমটি হল, good judgment আর দ্বিতীয়টি হল, the freedom to decide for oneself what should be done .Discretion শব্দটিকে বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে দুটি গুচ্ছে- প্রথমটি হল, বিচারবুদ্ধি সম্পন্নতা, বিচক্ষণতা ও সতর্কতা। দ্বিতীয়গু্চ্ছে আছে নিজস্ব বিচার বিবেচনা অনুসারে কাজ করার স্বাধীনতা। প্রথমগুচ্ছ থেকে discretion এর বিচক্ষণতা শব্দটি বেছে নেওয়া যায়। কিন্তু ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় দ্বিতীয় গুচ্ছের অর্থটি অধিকতর যুক্তিযুক্ত। কিন্তু এটা একটি ধারণাকে ব্যাখ্যার শব্দ সমষ্টি। একে পারিভাষিক শব্দে রূপ দিতে গেলে আমাদের একটি একক শব্দ দরকার।

কিন্তু কি হতে পারে সেই একক শব্দটি? আমি এখানে প্রজ্ঞা শব্দটি ব্যবহারের পক্ষপাতি। সংসদ বাংলা-ইংরেজি অভিধান থেকে পাওয়া যায় প্রজ্ঞা অর্থ হল Superior understanding or intelligence, profound wisdom, knowledge about philosophical reality.

পুলিশসহ বিচার ব্যবস্থার সাথে জড়িত প্রত্যেকরই তার কৃত কর্মের বা দায়িত্বের ফলাফল সম্পর্কে উন্নততর জ্ঞান বা উপলব্ধি থাকা দরকার। অন্যদিকে আইন প্রয়োগকারী ব্যক্তি বা আইনী প্রক্রিয়ায় কোন নাগরিককে প্রথমবারের মতো নিক্ষিপ্ত করার মতো ক্ষমতাধারী প্রত্যেক ব্যক্তিরই আইন ও তার প্রয়োগ সম্পর্কে তাত্ত্বিক জ্ঞানের বাইরেও এর ব্যবহারিক বা প্রকৃত প্রয়োগ সম্পর্কে দূরদর্শীতা থাকা দরকার। এই সবগুণকেই প্রজ্ঞা বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। তাই আমি discretion কে প্রজ্ঞা ও police discretion কে পুলিশ-প্রজ্ঞা বলে অনুবাদের চেষ্টা করেছি। অবশ্য discretion শব্দটিকে নেতিবাচক অর্থেও ব্যবহার করা যায়। সিন্ধান্ত নেবার স্বাধীনতা থাকলে মানুষ ভাল-মন্দ উভয় প্রকারের সিদ্ধান্তই নিতে পারেন। পুলিশ-প্রজ্ঞাকে আমি নিজে সংজ্ঞায়িত না করলেও এই শিরোনামে বেশ আগেই একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম যেখানে police discretion কে ইতিবাচক অর্থেই ব্যবহার করেছিলাম।

Oxford Advanced Learner’s Dictionary অনুসারে discretion একটি ইতিবাচক শব্দ হিসেবেই চালিয়ে দেওয়া যায়। ‘উত্তম সিদ্ধান্ত কিংবা ‘কোন ব্যক্তির কি করা উচিৎ আর কি করা উচিৎ নয় সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়াকে’ discretion বলে উল্লেখ করা যায়।

তবে আরো খুঁটিনাটি দিক অনুসন্ধান করে বুঝতে পারলাম police discretion কে পুলিশ-প্রজ্ঞা বলার অনেক বিড়ম্বনা রয়েছে। যেমন- পুলিশিং সাহিত্যে police discretion গিয়ে আমাদের Discretion Control সম্পর্কে পড়তে হয়। হ্যাঁ, পুলিশ অফিসারদের উপর অর্পিত দায়িত্ব আর আইন প্রয়োগের ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে তাদের আইন প্রয়োগ করা বা না করার স্বাধীন ইচ্ছার মুখে লাগাম দিতে হয়। পুলিশের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ জড়িত-বিজড়িত, আসীনতা-উদাসীনতার একটি সীমা নির্দেশ করা নিতানত্মই দরকার। যদিও এই সীমা কোন স্থায়ী আদেশ দিয়ে নির্দেশ করা হয় না, তবুও একজন পুলিশ অফিসারের একান্ত ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ ও মেজাজ- মর্জিকে কোন পুলিশ বিভাগই সম্পূর্ণ নিজেদের বা সামষ্টিক তথা সাংগঠনিক বলে সত্যায়ন করতে পারে না, প্রত্যয়নও দিতে পারে না। কারণ নিয়ত পরিবর্তনশীল মনুষ্য আচরণ নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী নির্দেশা জারী করা হলে তা পুলিশ-আমলাতন্ত্রকে নব্য-গোষ্ঠীতন্ত্রে রূপান্তরিত করতে পারে। তাই পুলিশ discretion কে অপেক্ষাকৃত অস্থায়ী আদেশ-নির্দেশ ও নিবিড় তদারকের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা পুলিশ সংগঠন তথা সরকারের জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়ায়। এক্ষেত্রে প্রজ্ঞাকে নিয়ন্ত্রণ করা হতে পারে। অবশ্য পুলিশ বিজ্ঞানে বিভিন্ন লেখকের দেয়া সংজ্ঞা ও আলোচনায় police discretion কে ব্যক্তি পর্যায়ে পুলিশ অফিসারদের নিজস্ব বিচার-বিবেচনা প্রয়োগে পেশাগত দায়িত্ব পালনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতাকেই বোঝানো হয়েছে। Kenneth Culp Davis-এর মতে

‘The term discretion refers to the autonomy on freedom an officer has in choosing an appropriate course of action. A public officer has discretion whenever the effective limits of the officers power leave him or her free to make a choice among possible courses of actions –

অর্থাৎ কোন সরকারি কর্মচারীর কর্তব্য পালনকালীন একটি যথাযথ কর্মধারা বেছে নেবার বিদ্যমান স্বকীয়তা বা স্বাধীনতাই হল discretion বা পেশাগত প্রজ্ঞা। কোন বিশেষ পরিসি’তিতে সম্ভাব্য কর্মধারায় কোন কাজে প্রদত্ত হওয়া না হওয়ার ক্ষেত্রে কোন সরকারি কর্মচারী যখন তার আইনে প্রদত্ত ক্ষমতার কার্যকরী সীমা স্পর্শ করেন তখনই তিনি তার discretion বা স্বকীয় বিবেচনা প্রয়োগ করতে হয়।

কার্যকরী সীমার সর্বশেষ/ প্রান্তবিন্দু বলতে কোন দায়িত্ব পালনে আইনের প্রান্তিক প্রয়োগ কিংবা আইন বহির্ভূত কর্মকেও অন্তর্ভুক্ত করে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, অনেক পরিস্থিতিতে কোন পুলিশ অফিসার আইনের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও কোন ব্যক্তিকে কোন নির্দিষ্ট সময়ে গ্রেফতার না করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। বিপরীত পক্ষে, অনেক সময় নিতান্তই সামান্য অপরাধের ঘটনার প্রেক্ষিতেও আপাত নিরপরাধ ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হতে পারে। রাস্তায় টহলরত পুলিশ দলের সামনে দ্বন্দ্বরত দুই যুবককে পুলিশ আইনগতভাবেই গ্রেফতার করতে পারে। কিন্তু যুবক বয়সের উত্তেজনাকে আমলে নিয়ে পুলিশ অফিসার যদি তাদের গ্রেফতার না করে তাদের সতর্ক করে, পরামর্শ দিয়ে স্ব-স্ব পরিবারের কাছে পৌঁছে দেয় তবে সেটা তার পুলিশ-প্রজ্ঞার উত্তম প্রয়োগ বলেই ধরে নেওয়া হবে।

২০০৮ সাল থেকে আমি বাংলা ভাষায় পুলিশ-বিজ্ঞানের কিছু সাহিত্য সৃষ্টি করার চেষ্টা করছি। এ জন্য পাশ্চাত্য তথা ইংরেজি ভাষায় ইতোপূর্বৈই প্রচলিত বিষয়গুলোর বাংলা প্রতিশব্দ খুঁজে বের করা কিংবা প্রয়োজনীয় পরিভাষা সৃষ্টি করা। বাংলা ভাষায় বিশুদ্ধ বিজ্ঞানসহ অনেক ফলিত বিজ্ঞানের বই পাওয়া যায়। যারা প্রথম দিকে এই সব বই রচনা করেছিলেন, তাদের নিজ ভাষার প্রতিশব্দ খুঁজতে অবশ্যই গলদঘর্ম হতে হয়েছিল। বিদ্যমান শব্দভাণ্ডার অপ্রতুল হওয়ায় তারা নিশ্চয় অনেক পারিভাষিক শব্দের জন্ম দিয়েছেন। প্রথম দিকে তাদের তৈরি করা পারিভাষিক শব্দগুলো অনেকের কাছে বড়ই বিদঘুটে লাগত। কেউ কেউ বিজ্ঞানকে বাংলা ভাষায় আমদানী করে কঠিন করে তোলার জন্য পথসূচনাকারী এ সব লেখকদের কঠিন সমালোচনাও করেছিলেন। উদাহরণ স্বরূপ গণিতের বাংলা বইগুলোর কথা ধরা যায়।উচ্চতর গণিতের বাংলা বইয়ে variable কে চলক, integration কে অন্তরীকরণ, differentiation কে সমাকলন ইত্যাদি বলে অনুবাদ করা হয়েছে। গণিতের ছাত্র হিসেবে আমারও এ সব পারিভাষিক শব্দ বেখাপ্পা ঠেকত।কিন্তু ক্রমান্বয়ে বেখাপ্পা ভাব দূর হয়ে গেছে। সমাকলন, অন্তরীকরণ ইত্যাদি শব্দ এখন আমার কাছে শ্রুতিমধুরই ঠেকে।

এমনিভাবে পুলিশ-বিজ্ঞানের অনেক শব্দই অনেকের কাছে বেখাপ্পা ঠেকবে। অনেকেই এর ইতিবাচক-নেতিবাচক অর্থ নিয়ে বিষোদ্গার করতে পারেন। কিন্তু ব্যবহার করতে করতে বা পড়তে পড়তে এ সব পরিভাষা একদিন আমাদের নিজস্ব শব্দ ভাণ্ডারের আটপৌরে শব্দতে পরিণত হবে। আমি police discretion কে পুলিশ-প্রজ্ঞা বলেই চালিয়ে দিলাম। হয়তো একদিন আমাদের পাঠককুল বা পুলিশ-বিজ্ঞানী ও পুলিশ-বিদ্যা চর্চাকারীগণ এটাকে নির্দিধায় মেনে নিবেন।