ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

সম্প্রতি একজন নিরপরাধ দম্পতিকে যাবজ্জীবন সাজার হাত থেকে বাঁচানোর সফল চেষ্টায় জামালপুর জেলার পুলিশ সুপার জনাব নজরুল ইসলাম দেশবাসীর ভূয়সী প্রশংসা কুড়িয়েছেন। এই নিয়ে প্রচার মাধ্যমগুলোতে বেশ ঘেলু সঞ্চালনও চলছে। তবে আমাদের দেশে অনেক মানুষ আছেন, যারা যে কোন অনিষ্টের জন্য পুলিশকেই নন্দঘোষরূপে উপস্থাপন করেন। এ্ক্ষেত্রেও হয়েছে তাই। তারা বলছেন, বুঝলাম, এসপি সাহেব যাবজ্জীবন সাজা প্রাপ্ত নির্দোষ শাহীন দম্পতিকে উদ্ধার করেছেন। কিন্তু ইতোপূর্বৈ তো অন্য পুলিশরাই তাকে যাবজ্জীবন সাজা দেবার ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু যখন তাদের বলা হল, এ মামলার তদন্ত পুলিশ করেনি, অর্থাৎ পুলিশের তদন্ত ছাড়াই ট্রাইবুনাল বিচারকাজ শুরু করেছেন, তখনও তাদের ঝোলার বেকায়দা সওয়াল শেষ হয় না। তারা বলছেন, বুঝলাম, পুলিশ তদন্ত করেনি। কিন্তু সাক্ষীদের তো আদালতে পুলিশই উপস্থাপন করেছিল। পুলিশের উপস্থাপন করা সাক্ষীরা আদালতে মিথ্যা সাক্ষ্য দিল, পুলিশ কি করল? কেউ যাতে আদালতে মিথ্যা সাক্ষ্য না দেয়, সেটা দেখার দায়িত্ব কি পুলিশের নয়?

বড়ই কষ্টের বিষয় বটে। পুলিশকে দোষ দেবার মানসিকতা পোষণ করলে এ ধরনের সহস্র যুক্তির অবতারণা করা যায়। আর বেচারা পুলিশ! সব অভিযোগ ও দোষারোপ তারা বিনা প্রতিবাদে মেনেও নেয়। পুলিশ হল কলুর বলদ আর চিনির বলদ। এরা বিনা প্রতিবাদে ঘানিও টানে, আবার কোন প্রকার বাছ বিচার না করে চিনির গাড়িও টানে। এরা কর্মের মালিক, কিন্তু ভোগের মালিক নয়। পুলিশ কোন ভাল কাজ করলে সেটা তার দায়িত্বের অংশ হয়। মন্দ কাজ করলে দায়িত্বের অতিরিক্ত হয়। আর ভাল-মন্দ যখন কোনটাই ঘটেনা তখন পুলিশ নিষ্কর্মা বলে কলঙ্ক ছড়ানো হয়।

পুলিশ যেন মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের ঘরের বউ। ঘরের বউরা উদয়াস্ত পরিশ্রম করে সংসার চালান। অনেকে শুধু ঘরই না, বাইরও সামলান। রান্নাবান্না থেকে শুরম্ন করে বাচ্চাদের পড়া-শোনাও তৈরি করে দেন। কিন্তু স্বামীরা মনে করেন, বউরা কিছুই করেন না। বাইরের জগতে পরিচয় করিয়ে দেয়ার সময় নির্দিধায় বলে বসেন, আমার বউ কিছুই করে না। তেমনি পুলিশ সমাজের সকল জঞ্জাল পরিষ্কারের দায়িত্ব পালন করেও সব মহল থেকে দায়িত্বে অবহেলা, ব্যর্থতা আর রক্তচুক্ষুর তাচ্ছিল্যই পেয়ে থাকে। পুলিশ নাকি কিছুই করে না।

বাংলাদেশ পুলিশের প্রাত্যহিক কর্মের প্রধানতম হল, অপরাধের তদন্ত করা। অপরাধের তদন্ত বলতে এখানে আমি ফৌজদারি মামলাকেই বুঝাচ্ছি। দেওয়ানী মামলার ক্ষেত্রে পুলিশকে কোন দায়িত্ব আইনে অর্পণ করা হয়নি। ফৌজদারি মামলাগুলোর মধ্যে আবার অধর্তব্য অপরাধগুলোর তদন্ত আদালতের অনুমতি বা হুকুম ছাড়া পুলিশ করতে পারে না।

আইন অনুসারে কোন মামলার তদন্ত শেষে আদালতে যে প্রতিবেদন পুলিশ পাঠাবে, আদালত তাই গ্রহণ করবেন এমন কোন কথা নেই। পুলিশ প্রতিবেদন, তা হতে পারে চূড়ান্ত প্রতিবেদন, হাতে পারে অভিযোগপত্র, আদালত গ্রহণ করতে বাধ্য নয়। কোন হত্যা মামলার তদন্ত শেষে পুলিশ যদি হাজার পাতার প্রতিবেদন আদালতে উপস্থাপন করে, আদালতের ক্ষমতা আছে, সেই প্রতিবেদনকে নাকচ করে দেয়ার। আদালত ফাইনাল প্রতিবেদন গ্রহণেও বাধ্য নয়, অভিযোগপত্র গ্রহণেও বাধ্য নয়।

অনেকে মনে করেন, কোন পক্ষ আদালতে গিয়ে আবেদন না করলে আদালত পুলিশের প্রতিবেদন গ্রহণে বাধ্য। কিন্তু আদালত পুলিশ প্রতিবেদনকে পুঙ্খানুপুঙ্খুরূপে যাচাই বাচাই করে তা গ্রহণও করতে পারেন, বর্জনও করতে পারেন। আদালত অধিকতর তদন্তের জন্য প্রেরণ করতে পারেন, কিংবা পুলিশের প্রতিবেদনকে স্পর্শ না করেই তার নিজ বিবেচনায় বিচারের পরবর্তী কার্যক্রম শুরু করতে পারেন। এমনকি কোন মলার বিচারকর্মের শেষ মুহূর্তেও আদালত তার অধিকতর বা পূনঃদনেত্মর জন্য পুলিশের কাছে ফেরত পাঠাতে পারেন। এর অর্থ হচ্ছে, তদন্তের ব্যাপারে পুলিশ আইনী ক্ষমতা ভোগ করলেও তদন্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করা কিংবা না করা, অধিকতর তদন্ত করানো বা না করানোর ক্ষেত্রে আদালতের ক্ষমতা সীমাহীন।

কোন মামলা তদন্তের পর আদালতে প্রেরণের পর তার বিচারিক কর্মে সহযোগিতার একটি সুন্দর পদ্ধতি আমাদের আইনে ছিল/ এখনও আছে। একমাত্র সেশন কোর্ট ছাড়া নিম্ন আদালতের মামলাগুলো পরিচালনা তথা উকিলের কাজটি করত পুলিশই। কিন্তু বর্তমানে কোন মামলাই পরিচালনা পুলিশ করে না। প্রত্যেক আদালতের জন্য এক বা একাধিক সরকারি কৌশুলী রয়েছেন। এরাই মামলা পরিচালনা করেন। আদালতে পুলিশ এখন শুধু রেকর্ড পত্র রক্ষণাবেক্ষণ করেন, পরিসংখ্যান তৈরি করেন। এমতাস্থায়, কোন আসামী কি সাক্ষ্য দিলেন, কোন সাক্ষীর কথার সারবস্তু কি, তাকে কি কি বিষয়ে ক্রস-ইক্সামিনেশন করে কি কি বিষয়ে নতুন তথ্য উদ্ঘাটন করতে হবে, তার বাছ বিছার করার দায়িত্ব বা ক্ষমতা পুলিশের নেই। অধিকন্তু কোন ফৌজদারি মামলার সরকারি পক্ষ হচ্ছে বাদীর লোক। যে সরকারের পক্ষে সাক্ষ্য দিবেন তাকে জেরা করে তার সাক্ষের অসংগিত বের করার দায়িত্ব সরকারি পক্ষের নয়, আসামী পক্ষের। যদি আসামী পক্ষ কোন আইনজীবী দিতে না পারেন, কিংবা আসামী পক্ষ অনুপস্থিত থাকেন, তার পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ করার দায়িত্ব সরকারের। কারণ সরকার কোন অপরাধীকে ন্যায় পথেই সাজা দিতে চান।

আমাদের আলোচ্য শাহীন দম্পতির মামলাটির ক্ষেত্রে আসলে কি ঘটেছিল, তার সম্পূর্ণ তথ্য আমরা জানি না। আদালত যে সব সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন, তা হয় এজাহারে বর্ণিত ছিল, কিংবা অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তার প্রতিবেদনে ছিল। এর বাইরেও আদালত ইচ্ছে করলে যে কোন ব্যক্তির সাক্ষ্য গ্রহণ করতে পারেন। আদালতে তদন্তকারী পুলিশ অফিসারকে যেমন সাক্ষ্য দিতে হয়, তেমনি নিশ্চয়ই অনুসন্ধানকারী এসি(ল্যান্ড)ও দিয়েছেন। এখানে এসি(ল্যান্ড) এর অনুসন্ধান কিন্তু জুডিশিয়াল নয়। কারণ, কোন এসি(ল্যান্ড) নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্বের বাইরে গিয়েই ভূমি সংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করেন।

এমতাবস্থায়, অন্ততএই ক্ষেত্রে পুলিশের কোন দায়-দায়িত্বি ছল বলে আমার মনে হয় না। পুলিশ যখন ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারায় জবানবন্দী গ্রহণ করেন তখনও সাক্ষীকে জেরা বা তার কথায় অবিশ্বাস করার মতো কোন আচরণকর্ম করতে পারেন না। সাক্ষী যা বলবেন পুলিশকে সাক্ষীর ভাষাতেই তা লিপিবদ্ধ করতে হয়। সাক্ষীর এই জবানবন্দীতে কোন স্বাক্ষর দিতে হয় না। এটা আদালতের বিচারিক কাজের অংশও হবে না। শুধু বিচারকালীন সাক্ষীর সাক্ষের অংগতি নির্দেশ করার জন্যই আসামী পক্ষ এটা ব্যবহার করতে পারেন। মামলার ডকেটে সাক্ষীর জবানবন্দীর রেকর্ড পুলিশ তথা সরকারকে কোন সুবিধাই দেয় না বরং অসুবিধায় ফেলে।

শাহীন দম্পতির বিষয়টিকে আমরা বিচারের নামে অবিচার কিংবা কুবিচার বলতে পারি। তবে এখানে আদালতকে দোষ দেবার কোন অবকাশ নেই। দোষ যা কিছু সবটাই আমাদের বিচারিক পদ্ধতির ও বিচারের সাথে সংশিস্নষ্ট সরকারি-বেসরকারি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর অদক্ষতা ও নিষ্ক্রীয়তা। নিরাপরাধকে সাজা দেবার ঘটনা শুধু আমাদের দেশেই নয়, পৃথিবীর সব দেশেই আছে। ইন্নোসেন্ট প্রজেক্টের হিসেব মতে যুক্ত রাষ্ট্রের কারাগারগুলোতে ২.৩%-৫% মানুষ বিনাদোষেই সাজা খাটছেন। এদের মধ্যে একটা বড় সংখ্যা মৃত্যুদণ্ডের জন্য অপেক্ষা করছেন। এটাকে ওরা বলে বিচারের বিভীষিকা বা মিসক্যারেজ অব জাস্টিস। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এভাবে ভুল রায়ে বা অন্যায়ভাবে দোষী সাব্যস্ত নির্দোষ ব্যক্তিদের উদ্ধারের এগিয়ে এসেছে ইন্নোসেন্স প্রজেক্ট নামে যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক একটি বেসরকারি সংগঠন। এই সংগঠনের প্রচেষ্টায় ১৯৮৯ সাল থেকে ২০১১ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৩০৭ জন ব্যক্তিকে সাজার হাত থেকে আইনী প্রক্রিয়ায় উদ্ধার করা হয়েছে যাদের মধ্যে ১৭ জন ছিল মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামী।

আদালত আইন অনুসারেই ভুল রায় দিতে পারেন। তার রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপীল করতে হয়। কিন্তু আসামীর অপারগতা বা অনুপস্থিতিতে সরকার কোন সাজার বিরুদ্ধে আপীল করে না। তবে এখানে একটি বিষয় বিবেচনার দাবী রাখে। তাহল, অসমর্থ বা পলাতক আসামীদের ক্ষেত্রে সরকার কর্তৃত আপীলের ব্যবস্থা করা। বিচার চলাকালীন কোন আইনজীবী দিতে না পারলে সরকার যেমন নিজ দায়িত্বে ও খরচে আসামীর জন্য একজন আইনজীবী নিয়োগ করতে পারেন, তেমনি কোন মামলায় আসামীরা আপীল না করলে বা আপীল করার সামর্থ্য না রাখলে সরকারকে নিজ উদ্যোগেই তার আপীল করতে পারে। সব মামলার ক্ষেত্রে না হলেও অন্তত যাবজ্জীবন ও তার চেয়ে বেশি পরিমাণ সাজার ক্ষেত্রে এটা করা উচিৎ। আলোচ্য মামলাটির ক্ষেত্রে আপীল করা হলে হয়তো শাহীন দম্পতি আজ আলোচনার বস্তুতে পরিণত হত না; পুলিশকেও হিরো হওয়ার পরেও পুলিশ বিদ্বেষী নিন্দকদের হতে নাস্তানাবুদ হতে হতো না। ০৮/০৩/২০১৪
সূত্রঃ
1.http://www.innocenceproject.org/Content/How_many_innocent_people_are_there_in_prison.php
http://en.wikipedia.org/wiki/Innocence_Project
2.