ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, স্বাস্থ্য

 

ছাত্রজীবনে ‘আমার জীবনের লক্ষ্য’ শিরোনামের কোন রচনা পড়েননি বা লেখেননি এমন শিক্ষিত মানুষ পাওয়া ভার। সম্ভবত এই রচনা লেখার পালা শুরু হয় ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে। এর পর গোটা মাধ্যমিক, এমনকি উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতেও জীবনের লক্ষ্য নিয়ে রচনা/নিবন্ধ লিখতে হয়। কিন্তু কি থাকে ছাত্র-ছাত্রীদের জীবনের লক্ষ্য? আমার অভিজ্ঞতায় তিনিটি বিষয়ের উপর জীবনের লক্ষ্য নিবন্ধ থাকে ছাত্র-ছাত্রীদের । এগুলো হল, ডাক্তার হওয়া, প্রকৌশলী হওয়া এবং সামান্য ক্ষেত্রে শিক্ষক হওয়া। অবশ্য রচনার বাইরেও ইদানীং কিছু কিছু পরিবারের বাচ্চাদের পাইলট হওয়ার স্বপ্ন দেখতে দেখি। অন্যদিকে যারা সরকারি চাকরি করতে চায়, তাদের মধ্যে সেনাবাহিনী কিংবা ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার স্বপ্ন দেখা যায়। অবশ্য পরবর্তী জীবনে যেখানে খোদ জীবনেরই ঠিক-ঠিকানা থাকে না, সেখানে জীবনের লক্ষ্য কিভাবে ঠিক থাকবে? ডাক্তার হতে চাওয়া ছেলেটি হয়ে যায় গাড়ির ড্রাইভার কিংবা সেনাবাহিনীতে প্রবেশের চেষ্টায় ব্যর্থ ছেলেটি যোগ দেয় স্থানীয় সন্ত্রাসীদের দলে।

যারা ডাক্তার হয়েছেন, তাদের জীবনের লক্ষ্য মোটামুটি স্থির ছিল। তারা ছুঁইতে পেরেছেন তাদের আদর্শকে; অর্জন করেছেন জীবনের লক্ষ্যকে। কারণ উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে কোচিং ফোচিং আর একাগ্রচিত্ততায় ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেয়া না হলে, যারা কোনদিন ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখেননি, তাদের হটাৎ করে ডাক্তার হতে পারতেন না। বরং যারা কোন দিন ম্যাজিস্ট্রেট হওয়া স্বপ্ন দেখেননি তারা বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে হটাৎ করে ম্যাজিস্ট্রেট হতে পারেন, কিন্তু প্রবল প্রতিযোগীতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়ে কঠোর পরিশ্রম করে ৫টি বছর ব্রহ্মচারিত্ব না করলে ডাক্তার হওয়া অসম্ভব।

কিন্তু কি দেখি এই জীবনের লক্ষে সফল মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে? যারা ছোটকালের জীবনের লক্ষ্য রচনা তৈরি করার সময় লিখত, আমি ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করব, অসুস্থ্য মানুষকে রোগমুক্ত করে তাদের স্বিস্ত দিব, দেশের অগ্রগতিতে অবদান রাখব, সেই সব জিনিয়াস মানুষগুলো একবার ডাক্তার হয়ে গেলে তাদের জীবনের লক্ষ্য ঠিক রেখে উদ্দেশ্যগুলোকে সম্পূর্ণরূপে ভুলে যান। প্রতিষ্ঠিত ডাক্তারগণ তাদের সরকারি পেশার সরকারি হাসপাতালগুলোকে সাইনবোর্ড আকারে ব্যবহার করলেও সরকারি হাসপাতালে সময়ক্ষেপণ করাকে জীবনের মূল্যবান সময়ের অপচয় বলে মনে করেন। তারা মানুষের সেবা যে করেন না তা নয়। তারা মানুষেরই সেবা করেন, তবে তা বেসরকারি ক্লিনিকে, উচ্চমূল্যের বিনিময়ে। সরকারি হাসপাতালে তারা রোগিদের সাথে পরিচিত হন মাত্র। কিন্তু রোগির চিকিৎসা করেন তার ব্যক্তিগত চেমবারে কিংবা বেসরকারি ক্লিনিকে। তাই সরকারি হাসপাতালে সেবার মান বেসরকারি হাসপাতালের সেকার মানের সাথে বিপরীত অনুপাতে কমছে ।

অন্যান্য যাবতীয় সেবার মত সরকার চিকিৎসা সেবাকেও মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে চায়। তাই প্রতিটি উপজেলা সদরে এবং অনেক ইউনিয়ন সদরে স্থাপন করা হয়েছে হাসপাতাল। এই সব হাসপাতালে ভবনসহ অনেক উন্নত যন্ত্রপাতিও রয়েছে। কিন্তু সরকার টাকার বিনিময়ে ঔষধ বা যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করতে পারলে ডাক্তারের ব্যবস্থা করতে পারে না। এই ডাক্তার তৈরি করা বড়ই কঠিন। কেননা মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করার পর, তাদের বিসিএস এর মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করিয়ে তার পর পোস্টিং দিতে হয়। ডাক্তারদের স্বল্পতা দূর করার জন্য সরকার এডহক ভিত্তিতে ডাক্তার নিয়োগ করেছে। তাদের প্রায় সবারই সেবা দেওয়ার কথা ইউনিয়ন চিকিৎসা কেন্দ্রে। কিন্তু এদের নগণ্য সংখ্যক এখন সেই ইউনিয়ন ক্লিনিকগুলোতে যান। তাদের প্রায় সবাই হয় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন, কিংবা তথাকথিত প্রেষণ নিয়ে জেলা সদর এমনকি রাজধানীতে প্রবেশ করেছেন। এই সব এডহক ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া ডাক্তারদের আবার বিশেষ পরিচয় রয়েছে। তারা তাই রাজনৈতিক ও তাদের পেশাজীবী ভিত্তিক সংগঠনের ছত্র-ছায়ায় জনগণের টাকায় বেতন নিয়েও জনগণকে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত করছেন।

বিষয়টি নিয়ে পত্রপত্রিকায় ব্যাপক আলোচনা হয়। এই সব ডাক্তারদের নিয়ন্ত্রকদের নির্দেশ দেয়া হয়, তাদের ইউনিয়ন সেবাকেন্দ্রে নিয়মিত উপস্থিত থাকতে বাধ্য করার জন্য। উপরওয়ালাদের নির্দেশ দেয়া হয় তারও উপরে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য। কিন্তু উপরওয়ালারা তাদের উপরে প্রতিবেদন দিয়ে প্রমাণ করেছে যে এদের সবাই নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত থাকেন। এটা ঠিক কাজীর গরুর মতো সিভিল সার্জনদের প্রতিবেদনে সবাই কর্মস্থলে থাকে। কিন্তু বাস্তবে নয়। অনেক ইউনিয়ন ক্লিনিকের আওতাধীন মানুষ জানেই না যে তাদের ক্লিনিকে একজন ডাক্তার পোস্টিং আছে। তারা আয়াদের নার্স আর নার্সদের ডাক্তার মনে করে প্রাচীন কালের দোয়-তদবির স্টাইলের চিকিৎসা সেবা নিয়ে মোটামুটি সন্তুষ্ট রয়েছেন।

ডাক্তারদের কর্মস্থলে অনুপস্থিতি নিয়ে পত্রিকায় হাজার হাজার প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও অবশ্য কাজের কাজ কোন কিছুই হয় না। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে এলে তিনি সংসদে কঠোর হুসিয়ারী উচ্চারণ করেন। যারা অনুপস্থিত থাকবে বা গ্রামে থাকতে চাইবে না, তাদের চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দিয়েছিলেন। কিন্তু যারা রাজনৈতক পেশাজীবী সংগঠনের মদদ পায়, তাদের জন্য অন্য কোন অভিভাবক লাগে না, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহীর হুসিয়ারিও কাজ দেয় না।

গত ০৪ এপ্রিল/২০১৪ এর দৈনিক সমকাল পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী তার আগের দিন অর্থাৎ ৩ এপ্রিল, ২০১৪ সাল বৃহস্পতিবার কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিল প্রায় ৪৮ শতাংশ ডাক্তার। অনুপস্থিত ডাক্তারদের কেউ কেউ প্রেষণে, কেউ বা ছুটিতে ছিলেন। তবে অধিকাংশ ডাক্তারই অনুপস্থিত ছিলেন বিনা ছুটিতে যাকে সরকারি চাকরিতে অনেকে বলেন ‘ভগবান লিভ’। এটা অবশ্য ছিল উপজেলা সদরের হিসেব। যদি পত্রিকার প্রতিবেদকগণ ইউনিয়নের সরকারি ক্লিনিকগুলোতে খবর নিতেন, তাহলে দেখতে পেতেন এসব সরকারি ক্লিনিকে নিয়োগ পাওয়া ডাক্তাররা কদাচিৎ কর্মস্থলে আসেন। মানে বেতন হালাল করার জন্য সই-টই করতে যান।

প্রাথমিক পর্যায়ের চিকিৎসায় একজন ডাক্তারের কাজ অন্য একজন ডাক্তার দিয়ে চলে বলে যেখানে ১০ জন ডাক্তাদের পদ সেখানে কয়েকজন ডাক্তার অন্যান্য সহকর্মীদের সাথে সমঝোতা করে পালাক্রমে অনুপস্থিত থাকেন। এতে দিন চলে যায়, কিন্তু রোগীর সেবা হয় না। ডাক্তারদের নিজস্ব সম্পদ বাড়ে, কিন্তু রাষ্ট্রের সম্পদ কমে। রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ভেঙ্গে যায়। ফুলে ফেঁপে ওঠে বেসরকারী হাসপাতাল সেবা।

জীবনের লক্ষ্য স্থির করতে তাই অনেক ডাক্তারের সনত্মানও ডাক্তার হতে চান না। আমার এক ভাইয়ের দুই সন্তানের কেউই ডাক্তার হলেন না। কিন্তু ভাইয়ের বড় শখ ছিল তার ছেলেও ডাক্তার হবে। তাই ছেলে যখন ডাক্তার হলই না, তখন ছেলেকে ডাক্তার মেয়েকে দিয়ে বিয়ে দিয়ে পরিবারে একজন ডাক্তারের ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু ভাইয়ের ডাক্তারের প্রতি মোহ থাকলেও তার ছেলে-মেয়েরা ডাক্তারি পেশার প্রতিই বিতশ্রদ্ধ।

তবে জীবনের লক্ষ্যকে ডাক্তার হওয়ার পর সবাই যে কাঁচকলা প্রদর্শন করেন, তা কিন্তু নয়। আমার পরিচিত অনেক ডাক্তারই তাদের পেশাকে পবিত্র বলে মনে করেন। তারা সরকারি চাকরি করলেও সেই চাকরিকে কখনো ফাঁকি দেননি। আর অবসর জীবনে তার সকল সহায়-সম্পদ একত্রিত করে অজ পাড়াগাঁয়ে হাসপাতাল তৈরির চেষ্টাও কেউ কেউ করছেন। আমার সেই ডাক্তার ভাইকে দেখেছি তার প্রাইভেট প্রাকটিসের এক রোগি তার নির্ধারিত ফি এর অর্ধেক দিয়ে চলে যাচ্ছেন। ভাই কিছুই বলছেন না। অনেক ডাক্তারকে দেখেছি শিশু কালে তার মা সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মারা গেছেন বলে স্ত্রী লোকের চিকিৎসা দিয়ে কখনো ফি নিতেন না।

আমাদের সমাজ আজ মূল্যবোধহীনতার গভীরে নিমজ্জিত। অর্থ-বিত্ত আর ক্ষমতার মোহ আমাদের আষ্ঠে-পৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। বাল্যকালের জীবনের সাথে কৈশোর, কৈশোরের সাথে যৌবন, আর যৌবনের সাথে প্রৌঢ়ত্বের চলছে নিরন্তর যুদ্ধ। এই যুদ্ধে পূর্ববর্তী সত্তা পরবর্তী সত্তার কাছে মার খাচ্ছে, হেরে যাচ্ছে। আমাদের সুকুমার বৃত্তিগুলো পশুশক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করছে। তাই এক সময়ের সদিচ্ছা পরবর্তী জীবনে এসে নিজেকে সামাল দিতে পারছে না। বস্তুগত চিন্তায় ডুবে যাচ্ছে পুরো জাতি। সদিচ্ছার ভাব এখানে বিদূরিত হচ্ছে; ভাবনা কেড়ে নিচ্ছে ভাবের স্থান। মানুষ জীবনের লক্ষ্য তাৎক্ষণিকভাবে নির্ধারণ করে সমাজে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। আমাদের ডাক্তারগণ নিশ্চয়ই সমাজ থেকে পৃথক নন। তারা তো আর সমাজকে নির্মাণ করেন না, সমাজই তাদের নির্মাণ করেছে। অর্থই যেখানে সবকিছুরই অর্থ সেখানে ডাক্তারগণ যে রোগি ফেলে অর্থের পিছনে ছুটবেন, তা আর বিচিত্র কি? তবে এই ডাক্তাররূপী জিনিয়াস মানুষগুলো যাদের পিছনে দেশ এত বেশি বিনিয়োগ করেছে, তাদের কাছ থেকে অসুস্থ ছমিরন-ফসিরন, মধু-যদু-সিধু, রহিম-করিম-ছলিমগণ অনত্মত এতটুকু আশা করতে পারে, তারা অসুস্থ মানুষগুলোর পাশে এসে দাঁড়াবে। তাদের হাত ধরে নাড়িটুকু পরীক্ষা করে অন্তত বলবে, ভয় নেই, আপনি শিঘ্রই সুস্থ হবেন। (৪/৪/২০১৪)