ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

সম্প্রতি মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রীর একটি ঘোষণা পত্রিকায় ফলাও করে প্রকাশিত হয়েছে৷ আগামী মে/২০১৪ মাস থেকে রাস্তায় নাকি ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলবে না দৈনিক যুগান্তর, ৫ মার্চ, ২০১৪) ৷ মাননীয় মন্ত্রীর ঘোষণাটি স্বস্তিদায়ক ও উদ্যোগটি প্রশংসনীয়৷ সারা দেশের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও রাসত্মাঘাটের বিশৃঙ্খলা নিয়ে পত্রিকায় প্রতিদিন যে সব খবর প্রকাশিত হয়, তাদের সবগুলোই থাকে আতঙ্কের৷ মারা-মারি-কাটা-কাটি আর সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের যে সকল বর্ণনা এসব খবরে থাকে তাতে দেশের মানুষ সব সময় মৃতু্যর ভয়ে ভীতু থাকে৷ আটপৌরে জীবনে ঘটনা নয়, দুর্ঘটনাই আমাদের অবচেতন মনের বহুল কাম্যবস্তু৷ সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত কয়েক জন আদম সন্তানের মৃত্যুর খবর না থাকলে আমাদের দৈনিক পত্রিকাগুলো যেন প্রেসের চাকা সহ্যই করতে পারে না৷ আমরাও দৈনিক পত্রিকা পড়ে মজাই পাই না৷ ‘গুড় নিউজ ইজ নো নিউজ’ চাঞ্চল্যকার সাংবাদিকতার এই আপ্ত বাক্যে আমরা পাঠকরাও নিবিষ্ট হয়ে গেছি৷ আমরা ভাল খবর নয়, খারাপ খবর পড়তে চাই৷ ঘটনা নয়, দুর্ঘটনার খবর শুনতে চাই৷

প্রতিদিন এই যে হাজার লোক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হচ্ছে, আহত হচ্ছে, পঙ্গু হচ্ছে তারও চেয়ে অনেক বেশি তা নিয়ে কারো তেমন মাথা ব্যথা দেখি না৷ সবাই সড়ক দুর্ঘটনাকে প্রত্যহিক ঘটনাই মনে করেন, আর রাস্তার বিশৃঙ্খলাকে মনে করেন বাংলাদেশের অপরিবর্তনীয় সাধারণ নিয়তি৷ তবে এই নিয়তি নির্মাণ ও বিনির্মাণের দায়-দায়িত্বও যে কারো, আছে সেটা দেশের মানুষ জানেই না৷

২০১০ সালে তৎকালীন মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন সংসদে তথ্য দিয়েছিলেন যে ঢাকার রাস্তায় ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যা ৮০ হাজার (দি ডেইলি স্টার ৪ মার্চ, ২০১০)৷ দুই বছরের মাথায় যোগাযোগ মন্ত্রী জনাব ওবায়দুল কাদেরের সংসদে তথ্য মতে এই ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৬ হাজার ( দৈনিক সংগ্রাম ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১২)৷ এই মুহূর্তে ২০১৪ সালে নিশ্চয়ই এই সংখ্যা বেড়েছে৷ কোন মোটর যানের ফিটনেস আর তার ফিটনেনের সনদে মিল থাকার দরকার নেই এ দেশে ৫০০/- (পাঁচশত) টাকা দিয়ে যেমন একটা আপাতত দর্শনে নির্ভুল ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া যায়, তেমনি কয়েক হাজার টাকা দিলে নকল নয়, আসল একটি ফিটনেস সার্টিফিকেট পাওয়া যায়৷ গাড়ির ইঞ্জিন চলুক বা নাই চলুক, গাড়ির বডিতে লোহা লক্কড়ের সাথে খাল-বাকল থাকুক বা না থাকুক, এ দেশে গাড়ি থাকলে তার জন্য ফিটনেস সনদ পাওয়া যায়৷ রাস্তায় চলমান অসত্মি-চর্মসার মোটরযানটিকেও সার্টিফিকেটের মাধ্যমে শতভাগ উপযোগী বানানো যায়৷ বিশ্বাস করম্নন আর নাই করম্নন, বঙ্গদেশে প্রবেশ করা কোন মোটরযানের ইঞ্জিন কোন দিন অচল হয় না৷ এদেশে প্রবেশ করা টাটা, টয়েটা, বেডফোর্ট, হুন্দাই, মার্সিডিস ইঞ্জিনের জীবনকাল কিয়ামত পর্যন্ত বিসত্মৃত৷ সারা পৃথিবীতে বাঙালিরাই একমাত্র জাতি যারা যে কোন মোটরযানকে অমরত্ব দান করতে পারে৷

২০০৫ সালে সিংগাপুরে ১৫ দিনের জন্য ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার জন্য প্রশিক্ষণে গিয়েছিলাম৷ সিংগাপুরের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও রাস্তার শৃঙ্খলা রৰার যাদুকর্মগুলো তারা আমাদের দেখিয়েছিল এবং সেই সাথে তারা আমাদের যাদুমন্ত্রটুকু শিখেও দিয়েছিল৷ কিন্তু এই দেশে সেই যাদুমন্ত্র আসেল খাটে না৷ অধিকন্তু আমি নিজেও সেই মন্ত্র চালনার সুযোগ পাইনি৷ আমার জানা মতে, সিংগাপুরে চাইলেই যে কেউ খেয়াল-খুশি মত গাড়ি কিনতে পারে না৷ গাড়ি রাখান স্থান, গাড়ির প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা ইত্যাদি কর্তৃপৰের কাছে ব্যাখ্যা করতে হয়৷ সেই দেশে গাড়ির হেলপার চাইলেই গাড়ির ষ্টিয়ারিং ধরতে পারেনা৷ সেখানে ট্রাফিক আইন যেমন কঠিন, তেমনি ব্যয়বহুল ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করাও৷ লালবাতির নির্দেশ অমান্য করলে তারা সত্যি সত্যিই ড্রাইভারদের কপালে লালবাতি ধরিয়ে দেয়৷ কোথাও কোন পুলিশ নেই৷ আছে শুধু ক্যামেরা৷ লালবাতির সীমা অমান্য করার সাথে সাথেই ক্লিক ক্লিক করে ক্যামেরাগুলো স্বয়ংক্রীয়ভাবে আপনার গাড়ির ছবি তুলে নেয়৷ কয়দিন পর গাড়ির মালিক পেয়ে যাবেন কেইস শিস্নপ৷ দিতে হবে দণ্ড ৷ যদি জরিমানা না দেন, তো জেলে যাবেন৷

সিংগাপুরে রাস্তায় চলাচল করা গাড়িগুলো চক চক করে৷ শুধু বাইরেই নয়, ভিতরেও৷ একটা নির্দিষ্ট সময়ের পরে এখানে রাস্তায় চলাচল করা গাড়ি যত চক চকই করুক, চলার যোগ্যতা হারায়৷ তখন একে হয় বিদেশ রপ্তানী করতে হয়, নয়তো ভাগাড়ে পাঠাতে হয়৷ ফিটনেসের সময় অতিবাহিত হওয়ার পর সিংগাপুরের রাস্তায় কোন গাড়ি পাওয়া গেলে পুলিশ গাড়িটি শুধু জব্দই করবে না৷ ‘জব্দ’ করবে তার মালিককেও৷ অবলিলায় তারা গাড়িটি কাটাকাটি করে মালিকের কাছ থেকে সেই কাটাকাটি আর ভাংচুর করার মজুরীও আদায় করবে ৷ এর বাইরেও আছে আইন অমান্য করার জরিমানা৷ কিন্তু এই আমাদের দেশে বিষয়টি তার উল্টো৷ এখানে ফিটনেসবিহীন গাড়ীর মালিকরা অনেক বেশি ‘ফিট’৷ তারা শুধু পুলিশকে নয়, গোটা সমাজকেই বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শন করতে পারে৷ যানবাহন ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা কর্তা ব্যক্তিরা অবলিলায় ফিটনেসের মিথ্যা সার্টিফিকেট দেন৷

ফিটনেসবিহীন বা মেয়াদউত্তীর্ণ গাড়ী রাস্তায় কেন চলে সে কৈফিয়ত দিতে বলা হয় পুলিশকে৷ বলা হয়, পুলিশ উত্কো চের বিনিময়ে এসব গাড়িকে রাস্তায় চলতে দেয়৷ জনগণের এই অভিযোগ মিথ্যা হবার কোন কারণ নেই৷ নির্দিষ্ট মাসোহারার ভিত্তিতেই এইসব গাড়ি সংশিস্নষ্ট সবার সাথে সমঝোতা করে৷ কিন্তু যে গাড়ি ফিট না হওয়ার পরেও একটি ফিটনেস সনদ পায়, পুলিশ তাদের আটক করে কিভাবে৷ পুলিশের কি বোঝা উচিত্‍ কোন গাড়ি ফিট, আর কোনটা ফিট নয়? এটা তো বিশেষজ্ঞের কাজ৷ এই বিশেষজ্ঞ হল বিআরটিএ৷ যে গাড়িকে বিআরটিএ ফিট বলেছে তাকে পুলিশ আনফিট বলবে কোন আইন বা বিধির বলে?

অধিকন্তু, সাধারণ মানুষ পুলিশের উভয় সংকটটি বোঝে না৷ ধরুন, একটি ফিটনেসবিহীন গাড়ি অতি ভোরে ধামরাই থেকে ঢাকার গুলিস্থানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল৷ বাসটি সাভারের আমিন বাজারে এসে পুলিশের হাতে ধরা পড়ল৷ পুলিশ কি তখন গাড়িটি আটক করে জব্দ করবে? হ্যাঁ, তা করতে পারে৷ কিন্তু আপনি নিজে যদি ঐ সময় ঐ গাড়ির যাত্রী হতেন, তাহলে পুলিশের গাড়ি জব্দ করা কি সমর্থন করতেন ? না, আপনি চাইবেন পুলিশ গাড়িটি ছেড়ে দিক৷ আপনার সময় বাঁচিয়ে আপনাকে সঠিক সময়ে গুলিস্তানে পৌঁছার সুযোগ করে দিক৷ আপনি চাইবেন, পুলিশ ঘুষ নিয়ে হলেও গাড়িটি ছেড়ে দিক৷ পুলিশের সিদ্ধান্ত নেবার মতো সময়টুকুও আপনি দিতে আপত্তি করবেন৷ পুলিশকে গালাগালি করবেন৷

পুলিশও নিশ্চয় জন-সেন্টিমেন্ট বুঝতে পারে৷ তাদেরও কানে যাত্রীদের গালাগাল যায়৷ তাই যাত্রীদের মনের আশাটিই পুলিশ পুরণ করে৷ গাড়িটি জব্দ না করেই মামলা দিয়ে বা মামলা না দিয়েই ছেড়ে দিবে৷ কেননা, একটি গাড়ী আটক করার পর পুলিশকে হাজার ধরনের ঝামেলা পোহাতে হয়৷ কোন গাড়ি জব্দ করা মানে হচেছ সেই গাড়ির পিছনে কয়েকজন লোকের বাড়তি শ্রম ও বাড়তি সময় দেয়া৷ কিন্তু সেই বাড়তি শ্রম ও সময় দেয়ার মতো শ্রমশক্তি বা সময় রাস্তায় ট্রাফিক সামলানো পুলিশগুলোর কই? তাই তারা যদি কোন ক্রমে বাড়তি ঝামেলা এড়াতে পারেন তো মন্দ কি?

বলা বাহুল্য, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার গোটা দায়িত্ব পুলিশের একার নয়৷ আর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পুলিশের মূল দায়িত্ব (Core Responsibility) এর অংশও নয়৷ কিন্তু তারপরও সহযোগী দায়িত্ব হিসেবে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পুলিশের কাঁধেই পড়ে৷ এটা পুলিশকে দিয়ে করানো যেমন সহজ, তেমন সরকারের জন্য লাভজনকও বটে৷ কেননা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা গোটা দায়িত্ব থেকে পুলিশকে অব্যহতি দিলে সরকারকে পুলিশ নয়, অথচ পুলিশের মতো পারঙ্গম একটি সমান্তরাল সংগঠন তৈরি করতে হবে৷ কিন্তু এটা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বিশ্বের কোন রাষ্ট্রের জন্যই ব্যয়-সাশ্রয়ী নয়৷ নিউজিল্যান্ডে ১৯৩৬ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত এবং পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় ১৯৭৫ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পুলিশ থেকে পৃথক করা হয়েছিল৷ নিউজিল্যান্ডে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা দেয়া হয়েছিল যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীন আর পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় তা দেয়া হয়েছিল সড়ক পরিবহন কর্তৃপৰের অধীন৷ কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি৷ বরং সরকারের প্রতি বছর অনেক বেশি টাকা গচ্ছা গেছে৷ তাই ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ভার পূনরায় পুলিশের কাছে ফেরতে দেয়া হয়েছে৷ অন্যদিকে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পুলিশ থেকে পৃথক করার প্রচেষ্টাকালে যুক্তরাষ্ট্র দেখেছে তাদের দেশের ২০% জনগণ সব সময় রাস্তায় থাকে৷ তাই ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার জন্য অন্য সংগঠন তৈরি করলে দেশের ২০% জন সংখ্যার ফৌজদারি সমস্যার ব্যবস্থারপনার জন্য সেই পুলিশকেই লাগে৷ তাই তারা পুলিশ থেকে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আলাদা করতে পারেনি৷ কিন্তু তাই বলে এই দায়িত্ব শতভাগ তারা পুলিশের উপর ছেড়েও দেয়নি৷

ট্রাফিক ও জনপথ ব্যবস্থাপনার সাথে বহু প্রতিষ্ঠান সংগত কারণেই জড়িত হয়ে পড়ে৷ কোন প্রতিষ্ঠানকেই খাটো করে দেখার উপায় নেই৷ কোন প্রতিষ্ঠানকেই দায়মুক্তি দেবার কারণ নেই৷ তাই পূরকৌশল, পূর্ত, যন্ত্রকৌশল, নিবন্ধন ইত্যাদি সব ধরনের প্রতিষ্ঠান গুলোকে শতিক্তশালী করছে৷ কিন্তু বাংলাদেশে সড়ক ব্যবস্থাপনর সাথে জড়িত কোন প্রতিষ্ঠানই কাঙ্খিত মাত্রায় সক্ষম নয়৷ তাই সরকারের যে কোন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সঠিক ভাবে হয় না৷

এমতাবস্থায়, রাস্তার সঠিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও জনপথগুলোকে সুশৃঙ্খল করতে হলে দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে সড়ক ব্যবস্থাপনার সাথে সংশিস্নষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানকে সক্ষম করে তুলতে হবে ৷ এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যেমন রয়েছে পুলিশ বিভাগ, তেমনি রয়েছে সড়ক ও জনপথ; রয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং রয়েছে সড়ক পরিবহন সংস্থা ও কর্তৃপক্ষ৷ আধুনিক রাষ্ট্রের প্রত্যেকটি বিভাগ/প্রতিষ্ঠানের পরষ্পরের সাথে এমনভাবে সম্পর্কিত যেন তারা একটি মানব শরীরের বিভিন্ন অংগ ৷ সমস্ত শরীরের সুস্থ্যতার জন্য প্রত্যেক অংগের সুস্থতা যেমন জরুরী, তেমনি ট্রাফিক বা সড়ক ব্যবস্থাপনার জন্য এই সব প্রতিষ্ঠানের সুস্থতাও জরুরী৷ ফিটনেসবিহীন গাড়িরোধ করা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সামান্য অংশমাত্র৷ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সুস্থতার জন্য সরকারের এতদসংশিস্নষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকেই সর্বাংশে সুস্থ বা ‘ফিট’ করতে হবে৷ ( ০৭/০৪/২০১৪)