ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

আমি তখন নিতান্তই বালক। আমাদের গ্রামে সকালে খবর ছড়িয়ে পড়ল পাশের গ্রামে একটি চোর ধরা পড়েছে। চোরটিকে পাকড়াও করেছে একজন মহিলা। তাহিয়ার পুরের মহিরের বেটি প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যায় বাড়ি থেকে একটু দূরে ইরি ধানের ক্ষেতে নিয়মিত মাটির কুয়ো থেকে পানি সেচ দিতো। সেই সময় ইঞ্জিন চালিত অগভীর বা গভীর নলকুপের তেমন প্রচলন ছিল না। তাই শুকনো মওসুমে মাটির কূয়ো থেকে পানি তুলে ইরি ধান চাষ করা হত। এই দৃশ্য রংপুর অঞ্চলে তখন ছিল খুবই সাধারণ। নারী-পুরুষ মিলে সকাল বিকাল ধান ক্ষেতে পানি সেচ দিতে হত। এই কাজে হতে হত বেশ শক্ত সামর্থ্য।

আমাদের গ্রামের পার্শ্ববর্তী তাহিয়ারপুর গ্রামের মহিরের বেটি খুবই শক্ত-সামর্থ্য মহিলা ছিল। মহিলার ছিল প্রথম যৌবন। কিন্তু স্বামীর সাথে বনিবনা না হওয়ায় বাপের বাড়িতে থাকেন। রাতে যখন ক্ষেতে পানি সেচ দেন, তখন তার শরীরে থাকে মূল্যবান সোনার গহনা। কানে ঝুমকা, হাতে চুরি, গলায় মালা। এতসব গহনার বাহার এলাকার ছিঁচকে চোরদের জন্য একটি ভাল ধরনের দাও মারার প্রলোভন বৈকি।

এক সন্ধ্যায় ক্ষেতে পানি সেচ দেয়ার সময় এক চোর তাকে ঝাপটে ধরে তার শরীর থেকে গহনা কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু মহিরের বেটি পাল্টা চোরকেই ঝাপটে ধরে চোর! চোর!! বাঁচাও! বাঁচাও!! বলে চিৎকার দেয়। আশেপাশের ক্ষেতে পানি সেচ দেয়া পুরুষ মহিলাগণ দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে চোরকে পাকড়াও করে। চলে আচ্ছা তারে উত্তম-মধ্যম। চোরের পিটন চলে রাতে, শেষ রাতে, চলে ভোরেও। পালায় পালায় চোরের পিঠে এলাকার মানুষের ঝাল ঝাড়ার উৎসব। সবাই একটি তথ্য চোরের কাছ থেকে জানতে চায়, তার সাথে এলাকার কে কে জড়িত ছিল।

কেননা চোরের বাড়ি ছিলো ঘটনাস্থল থেকে অনেক দূরে। সে কিভাবে জানলো যে তার চুরির লক্ষ্য বস্তু অন্য এক গ্রামে। কিভাবে সে তার ভিকটিমের প্রাত্যাহিক কাজকর্ম ও অভ্যাস সর্ম্পকে জানল? সাধারণ মানুষও বড় ধরনের ডিটেকটিভ। তারাও তদনেত্মর সব কয়টি অনুসঙ্গের পারষ্পরিক যোগসুত্র খোঁজে। কিন্তু এত মারপিটের পরেও এক মহিলার হাতে পরাস্ত চোর কোনক্রমেই স্বীকার করতে চাইল না তার স্থানীয় অংশীদার বা সহযোগী কে বা কারা।

আমি অতি প্রত্যুষে তাহিয়ার পুরে চোর দেখতে গেলাম। চোরকে মারপিট করার দৃশ্য দেখে যুগপত আনন্দিত ও বেদনাহত হলাম। এত মারের পরেও বেচারার হুশ থাকে কেমনে! সবাই একই প্রশ্ন করে, বল তোর সাথে গ্রামের কে কে ছিল? চোর বলে, আর কেউ না। আমি একাই ছিলাম। মারের মাত্রায় যত কম বেশি হোক, চোরের একই কথা, আর কেউ না, আমি একাই ছিলাম।

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে একটা রব উঠল। ঐ যে ইস্কেন্দারের বাপ আসছেন। ইস্কেন্দারের বাপ কে? ইস্কেন্দারের বাপ হলেন, একজন অবসরপ্রাপ্ত দুষ্কৃতিকারী ইয়াকুব ডাকাত। তিনি নাকি মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার আগেই দেশ স্বাধীন হয়ে গিয়েছিল। ইয়াকুব ও তার দল হাতে অস্ত্র পেলেও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। ভারত থেকে ফিরে ইয়াকুব সর্বহারা দলে যোগ দেন। অবৈধ অস্ত্র নিয়ে একটি দুর্ধর্ষ দল তৈরি করেন তিনি। ১৯৭২-৭৫ সালের দিকে দেশের বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতিতে তিনি ও তার দল আমাদের গ্রাম ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় রীতিমত ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন। তাদের দলের লোকদের প্রতিহত করায় ১৩ নম্বর ইউনিয়নের জনপ্রিয় আউয়াল চেয়ারম্যানকে খুন করে আমাদের গ্রামের আখিরা নদিতে লাশ গুম করেন। তার দলের লোকদের ছোড়া গুলিতে আমাদের গ্রামের ভোটার ব্যাটা দুলা মিয়া বিনা চিকিৎসায় মারা যান। ইয়াকুবের কথা শুনলে সবার জানের পানি যেন নিমিশেই শুকিয়ে যায়।

শেষ বয়সে ইয়াকুব অবশ্য আমাদের ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। একবার নয়, দুই দুইবার। দ্বিতীয়বার জেলখানা থেকে নির্বাচন করেছিলেন। সেই সময় ইয়াকুব ছিলেন একটি খুনের মামলার বিচারাধীন আসামী। দিন-দুপুরে শুকুরের হাট থেকে একজন মানুষকে ধরে নিয়ে হাটের অদূরে এক আখ ড়্গেতে তাকে হত্যা করা হয়। সেই মামলায় ইয়াকুবের আবার সাজা হয়েছিল। এই হল সেই ইস্কেন্দারের বাপ ইয়াকুব। তিনি আসছেন। আসছেন, ধৃত চোরের স্বীকারোক্তি নিতে। এবার জানা যাবে তার সাথে এলাকার কে কে জড়িত ছিল। সবাই বলল, ইয়াকুব এবার চোরকে ভাল ধরনের ছেঁচা দিবে। এত মারের পরও স্বীকার করিস না ব্যাটা। এবার ইয়াকুব ডাকাতের মারের ঠেলা বুঝবি।

যা হোক ইয়াকুব ডাকাতের আগমন বার্তায় চোরের শরীরের রক্ত হিম হয়ে আসার মতো অবস্থা! সে জোরে জোরে ঢোক গিলতে থাকল। এক সময় ঝড়ের বেগে ইয়াকুব ডাকাত এলেন। আমি নিজেও সেই দিন জীবনে প্রথমবারের মতো খ্যাতি-কুখ্যাতির ইয়াকুব ডাকাতকে দেখলাম। অতি হ্যাংলা-পাতলা মাঝারি উচ্চতার মানুষ। একটু তোতলা স্বভাবের তবে তার নৃশংসতা ও আন্ডার ওয়াল্ডের নেতৃত্বদানের ক্ষমতা অপরিসীম।

ইয়াকুব ডাকাত এসে তার গায়ের চাদর খানা খুলে একজনকে দিলেন। তারপর একটি বাঁশের লাঠি হাতে নিয়ে চোরের মাথার চুলের ঝুঁটি ধরলেন এক হাতে, অন্যহাতে ক্ষিপ্র গতিতে তুললেন লাঠি বাঁশের লাঠি। চোর চিৎকার দিয়ে বলছেন, নানা, আমাকে মারিস না। আমি সব বলছি। সব বলছি। আমাকে মাফ করে দে। আমার সাথে ছিল এই গ্রামের আকালু। আকালুর শ্বশুর বাড়ি আমার গ্রামে। সেই আমাকে বলেছিল সব। তারই পরামর্শ ও পথ দেখানোর ফলেই আমি এই গহনা ছিনতাই করতে চেয়েছিলাম।

আমরা সবাই অবাক। গত কাল সন্ধ্যা থেকে আজ সকাল ১০টা পর্যন্ত গ্রামের প্রায় সকল রাগি-মেজাজী মানুষগুলো চোরের কাছ থেকে এত নির্যাতন করেও যে তথ্য উদ্ধার করতে পারেনি। ইয়াকুব ডাকাতের একটি মাত্র বাড়িতেই সে কিনা সবকিছু গড় গড় করে বলে দিল! এটা কি করে সম্ভব হল? কি যাদু জানে ইয়াকুব ডাকাত?

তখন অন্যদের মতো আমিও বিষয়টি বুঝতে পারিনি। তবে এতটুকু বুঝতাম ইয়াকুবের নৃশংসতা সর্ম্পকে আমরা যেমন জানতাম, চোরও তেমনি জানত। বরং আমাদের চেয়ে চোরই অনেক বেশি জানত। ইয়াকুব ডাকাত ছিল, প্রকাশ্যে মানুষ খুন করত, তার হাতে অস্ত্র থাকত। তিনি একটি নিষিদ্ধ সশস্ত্র গ্রম্নপের নেতৃত্ব দিতেন। এই সব কিছু মিলে ইয়াকুব ডাকাতের কুখ্যাতির একটি পরিষ্কার চিত্র চোরের মনে ছিল। তাই সে আগেই আত্মসমর্পণ করেছে।

এটাই হল Paradox of faces অর্থ্যাৎ খ্যাতি-কুখ্যাতির কূটাভাস। কোন মানুষ তার কর্মের মাধ্যমে ইতোমধ্যেই যদি নিষ্ঠুরতার কুখ্যাতি অর্জন করতে পারেন, তবে অন্যদের বসে আনতে বা অন্যদের কাছ থেকে তথ্য আদায় কালে তাকে অপেক্ষাকৃত কম বল প্রয়োগ করতে হয় বা কম নৃশংস আচরণ প্রদর্শন করতে হয়। The nastier your reputation, the less nasty you really have to be.

পুলিশ গবেষক উইলিয়াম কে মুইয়র জুনিয়র তার Police: the Street Corner Politicians বইতে অন্যের উপর জবরদসিত্মমূলক ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে ক্ষমতা প্রয়োগকারীর জন্য চারটি কূটাভাস ( Paradox) এর কথা বর্ণনা করেছেন। এগুলো হলঃ-
(1) সত্বের কূটাভাস (Paradox of Dispossession)
(2) স্বকীয়তার কূটাভাস (Paradox of Detachment)
(3) কুখ্যাতির কূটাভাস (Paradox of faces) ও
(4) যৌক্তিকতার কূটাভাস (Paradox of Irrationality)

উপরের ঘটনায় ইয়াকুব ডাকাত তার কুখ্যাতির কূটাভাস কাজে লাগিয়েছেন। ইয়াকুব ডাকাতের নৃশংসতার কুখ্যাতি চোরকে এতটাই ভীতু করে তুলেছিল যে, তাকে মার দেয়ার আগেই সবকিছু স্বীকার করেছিল। কারণ সে বুঝতে পেরেছিল, সব তথ্য প্রকাশ না করলে তার পরিণতি কিরূপ ভয়াবহ হতে পারে।

আমাদের আন্ডার ওয়ার্ল্ড জগতের অবস্থাও একই। নৃশংস সন্ত্রাসী বা মাস্তান দলের নাম শুনলেই মানুষ ভয় পায়। তারা ইতোমধ্যেই মানুষ খুন, বল প্রয়োগ ইত্যাদির মাধ্যমে সমাজে যথেষ্ঠ কুখ্যাতি অর্জন করেন তা তাদের জন্য একটি বড় ধরনের পুঁজির মতো কাজ করে। এই পুঁজির জোরেই সন্ত্রাসী-মাস্তানগণ এমন এক সময়ে এসে পৌঁছান, যখন কোন প্রকার নৃশংসতা ছাড়াই মানুষের কাছ থেকে ফায়দা লুটতে পারে।

এবার আসা যাক পুলিশিং জগতে। জবরদস্তিমূলক বল প্রয়োগ পুলিশি কাজের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে পুলিশকে জনগণের উপর বল প্রয়োগ করতে হয়। যে জবরদস্তি পুলিশ করতে পারে, সাধারণ মানুষের জন্য অন্যের প্রতি তা করা রীতিমত অন্যায় ও বেআইনী। তবে পুলিশের জবরদস্তিমূলক আচরণের একটি গ্রহণযোগ্য মাত্র রয়েছে। এই মাত্রা আইন দ্বারা সীমাবদ্ধ।

The police coerce others legally in ways that are criminal for civilians. In fact, so omnipresent is this license that most people associate the police, as if, those powers were the critical elements of police work

পুলিশের যে ইউনিট ইতোমধ্যেই এই জবরদস্তিমূলক ক্ষমতা প্রয়োগ নির্দেশিত মাত্রা অতিক্রম করা কিংবা দড়্গতার খ্যাতি বা কুখ্যাতি অর্জন করেছে, জনতা নিয়ন্ত্রণ কিংবা অভিযুক্তদের কাছ থেকে তথ্য উদ্ধারে তারা ততো বেশি সাফল্য অর্জন করতে পারে।